প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
চট্টগ্রাম নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তা, নৈতিক শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, শুধু উচ্ছেদ বা আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
চট্টগ্রাম জেলার আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিশেষ মতবিনিময় সভায় বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
মেয়র বলেন, নগরীতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে অনেক সময় এমন মানুষের মুখোমুখি হতে হয়, যারা জীবিকার তাগিদে ফুটপাত বা সড়কের পাশে ব্যবসা করছেন। তাদের উচ্ছেদ করা সম্ভব হলেও পুনর্বাসন বা বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না থাকলে একই সমস্যা আবারও তৈরি হয়। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম এখন একটি কসমোপলিটন নগরী। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ জীবিকার সন্ধানে এখানে আসছেন। তাই নগর ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি বলেন, একটি পরিকল্পিত নগর গড়ে তুলতে হলে শুধু সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। নগরীর বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পর সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে সেই স্থানগুলো স্থায়ীভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় রাখতে হবে। অন্যথায় কিছুদিন পর আবারও দখল ও বিশৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিভিন্ন কারণ তুলে ধরে মেয়র বলেন, মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধের পেছনে নৈতিক অবক্ষয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘ সময় ধরে তরুণ ও কিশোরদের যথাযথভাবে নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া হয়নি। এ সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের মাধ্যমে এর প্রতিকার করতে হবে।
মেয়র বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বচ্ছতা, সততা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। শুধু ওপরের স্তরে পরিবর্তন আনলে হবে না; মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমেও একই ধরনের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম নগরীর আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নে কাজ চলছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে উন্নত ট্রাফিক সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নগরীর বিভিন্ন স্থানে ক্যামেরা-ভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা স্থাপনের কাজও এগিয়ে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবা প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, নগরীর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ডেঙ্গু মোকাবিলায় কোন এলাকায় কত রোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং কোথায় সংক্রমণের হার বেশি—এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করে হটস্পট চিহ্নিত করা হচ্ছে। তথ্যভিত্তিকভাবে এলাকাগুলোকে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোনে ভাগ করে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, শুধু জ্বরের চিকিৎসা করলেই হবে না; জ্বরের প্রকৃত কারণ নির্ণয় করতে হবে। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগের সঠিক কারণ নির্ণয়ের মাধ্যমে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নগর ও জেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
নগরীর স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে মেয়র বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের জন্য জায়গা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গড়ে উঠলে নগরবাসীর চিকিৎসাসেবায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে নৈতিকতা, পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে মেয়র বলেন, একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও স্বাস্থ্যকর নগর গড়ে তুলতে হলে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই এসব বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্কুল হেলথ প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পরিচ্ছন্নতা, হাত ধোয়া, ময়লা-আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা এবং শিক্ষক ও বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মতো সামাজিক মূল্যবোধ শেখানো হচ্ছে।
ফুটপাত দখলমুক্ত ও যানজট নিরসনে সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যাদের জাতীয় পরিচয়পত্রসহ প্রয়োজনীয় তথ্য রয়েছে, তাদের তালিকাভুক্ত করে বিভিন্ন এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নাইট মার্কেট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে আগ্রাবাদ ও চকবাজারে এ ধরনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে নগরীর অন্যান্য এলাকাতেও এ উদ্যোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ফুটপাত ব্যবস্থাপনা ও যানজট নিরসনে রাজনৈতিক দল, পুলিশ প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতু এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কর্ণফুলী সেতু এলাকায় যানজট নিরসনে স্বেচ্ছাসেবকদের কার্যক্রম পুনরায় চালুর বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন মেয়র। তিনি বলেন, অতীতে স্বেচ্ছাসেবীরা সেখানে দায়িত্ব পালনকালে যানজট নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছেন। প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে এ ধরনের কার্যক্রম পুনরায় চালু করা গেলে যানজট ব্যবস্থাপনায় সুফল পাওয়া যেতে পারে।
কর্ণফুলী সেতুর টোল আদায় নিয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি বিষয়টি পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়ে মেয়র বলেন, টোল আদায়ের কারণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়ে যানজট বাড়ছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নগরীর কুলগাঁও এলাকায় বৃহৎ বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগের কথা জানিয়ে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও সুশৃঙ্খল ও কার্যকর করতে কুলগাঁও এলাকায় একটি বড় বাস টার্মিনাল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি উদ্বোধন করা হবে বলে তিনি জানান।
মেয়র বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সিটি কর্পোরেশন, রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ নাগরিক—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগেই একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল চট্টগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব।


