প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, বাড্ডা ও নতুন বাজারে গতকাল সরজমিনে ঘুরে এবং ব্যবসায়ী-খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে চালের দাম বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। মান ও বাজারভেদে প্রতি কেজি মোটা চাল গতকাল ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে, যা বিক্রেতাদের তথ্যমতে, গত মাসে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির আগে ছিল ৪৮ থেকে সর্বোচ্চ ৫৩ টাকা। এছাড়া মাঝারি মানের চাল ৫৮ থেকে ৬৫, সরু চাল (মিনিকেট) ৭০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
কারওয়ান বাজারের একটি পাইকারি দোকানের ম্যানেজার শফিকুল ইসলাম গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মিলপর্যায়ে দাম কিছুটা বেড়েছে। কোথাও কোথাও বস্তাপ্রতি ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এরপর ট্রাক ভাড়াও বেড়েছে। এসবের প্রভাবই ঢাকার বাজারে পড়েছে।’
আরো কয়েকজন পাইকারি বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত মাসে ডিজেলের দাম বাড়ার পর দিনাজপুর থেকে চাল আনতে প্রতি ট্রাকে প্রায় তিন হাজার এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আনতে ২ হাজার টাকা ভাড়া বেড়েছে। এর সঙ্গে অন্যান্য খরচও বেড়েছে। সে জন্য কেজিতে ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা দাম বাড়াতে হচ্ছে।
নতুন বাজার এলাকায় কথা হয় ক্রেতা নওশাদ আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আটাশ চাল সেপ্টেম্বরের শুরুতে ৬০ টাকায় কিনেছি। সে মাসের শেষের দিকে কিনেছি ৬২ টাকায়। আজ (গতকাল) কিনলাম ৬৪ টাকায়। দোকানিরা বলছেন ট্রাকভাড়া বেড়েছে। ধানের দাম ও মোকামে চালের দাম বেড়েছে। তাই এখন খুচরায় বেড়েছে।’
দেশের অন্যতম বড় চাল উৎপাদন কেন্দ্র কুষ্টিয়ার খাজানগর। সেখানে খোঁজ নিয়ে চালের দাম বাড়ার তথ্য মিলেছে। গত ২০ দিনে খাজানগরের মোকাম এবং জেলার খুচরা বাজারে বিভিন্ন মানের চালের দামে ওঠানামা হয়েছে। জেলা প্রশাসন এক দফা দাম কমানোর সিদ্ধান্ত দিলেও পরবর্তী সময়ে আবার দাম বেড়েছে।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ১৭ সেপ্টেম্বর খাজানগর মোকামে বিভিন্ন ধরনের চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা এবং খুচরা বাজারে ৪ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বাড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন ও খাজানগরের মিল মালিকদের বৈঠক হয়। সেখানে সব ধরনের চালের মিলগেট মূল্য কেজিপ্রতি ১ টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি পরবর্তী দুই সপ্তাহ দাম না বাড়ানোর বিষয়ে মিল মালিকদের কাছ থেকে আশ্বাসও নেয়া হয়। তবে সে সময়ের মধ্যেই মিলগেট ও খুচরা পর্যায়ে চালের দাম বেড়েছে।
খাজানগরের মিলগেটের তথ্যানুযায়ী, মাত্র চারদিনের ব্যবধানে মিনিকেট চালের দাম কেজিতে ৬৮ টাকা থেকে বেড়ে প্রথমে ৭০ টাকা এবং পরে ৭২ টাকায় ওঠে। একই সময়ে কুষ্টিয়ার পৌর বাজারে খুচরা পর্যায়ে মিনিকেটের দাম প্রায় ৭৪ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে। সবশেষ গতকাল কুষ্টিয়ার খুচরা বাজারে বিভিন্ন ধরনের চালের দাম কেজিতে আরো ১ থেকে ২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। চালের বড় উৎপাদন কেন্দ্রে এমন মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে রাজধানীর বাজারে।
পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চালের ক্রয়মূল্য ও বাজারজাত ব্যয় বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এর প্রভাব পড়ছে খুচরা বিক্রয়মূল্যে। এছাড়া তারা ধানের মূল্যবৃদ্ধির কথাও বলছেন।
গত মাসের মাঝামাঝি থেকে চলতি সপ্তাহ পর্যন্ত কুষ্টিয়ার চালের বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রশাসনিক উদ্যোগে চালের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত হলেও সে স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। জেলায় মিলগেট, পাইকারি ও খুচরা—প্রতিটি স্তরেই দাম বেড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুষ্টিয়ার এক অটো রাইস মিল মালিক বলেন, ‘ধানের দাম, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়—সবকিছুই বেড়েছে। ধান, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ, প্যাকেজিং ও পরিবহনসহ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে আগের দরে চাল সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে মিলগেটে দাম সমন্বয় করতে হচ্ছে।’
দেশ এগ্রো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল খালেক বলেন, ‘মিল থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত চাল পৌঁছাতে কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পাইকারি ও খুচরা বাজারে পড়ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘শুধু পরিবহন ব্যয়কে চালের দাম বাড়ার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। ধানের বাজারদর, উৎপাদন খরচ এবং বাজারে সরবরাহের পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। বাজার স্থিতিশীল রাখতে মিলারদের পাশাপাশি পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের বিক্রি মূল্যের তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।’
অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজার মনিটরিংয়ে দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছেন বলে মনে করেন কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘জ্বালানির দাম বেড়েছে। এতে পরিবহন খরচও কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু এটিকে পুঁজি করে ব্যবসায়ীরা পণ্যের অতিরিক্ত দাম বাড়াতে পারে না। আমাদের দেশে বাজার মনিটরিং দুর্বল। ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।’
নওগাঁর মোকামে গত দেড় মাসে চালের দাম বাড়েনি বলে জানা গেছে। তবে সেখানে গত কয়েকদিনে বেড়েছে চাহিদা। স্থানীয় পাইকারি বিক্রেতারা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন চালের চাহিদা কম ছিল। এতে জেলার মোকাম ও মিলগেট পর্যায়ে বিক্রিতে অনেকটা স্থবিরতা ছিল। তবে সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চালের চাহিদা বেড়েছে। এতে তাদের মোকামগুলোয় ব্যস্ততা ফিরেছে।
গতকাল নওগাঁ শহরের পার-নওগাঁ মহল্লার আড়তদারপট্টি ঘুরে দেখা যায়, চালের আড়ত ও মিলগেটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের আনাগোনা বেড়েছে। দেড় মাস ধরে স্থিতিশীল থাকার পর বর্তমানে পাইকারিতে প্রতি কেজি স্বর্ণা-৫ চাল ৪৬ থেকে ৪৭ টাকা, জিরাশাইল ৫৬ থেকে ৬০ টাকা এবং কাটারীভোগ ৬৮ থেকে ৭২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ‘এক মাসের বেশি সময় ধরে মোকাম ও মিলগেট প্রায় ক্রেতাশূন্য ছিল। চালের বাজারে বড় ধরনের ধস নামতে পারে এমন একটা আতঙ্কও ছিল ব্যবসায়ীদের মধ্যে। সরকারি গুদামে এবার চালের মজুদ অনেক বেশি। এর প্রভাবেই বাজার স্থিতিশীল রয়েছে।’
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবির) দেয়া তথ্যমতে, গত ২৪ সেপ্টেম্বর মাঝারি (পাইজাম ও আটাশ) চালের দাম কেজিতে ৩ টাকা বেড়ে সর্বনিম্ন ৫৮ টাকায় বিক্রি হয়। যেটি এর আগে সর্বনিম্ন ৫৫ টাকা ছিল। এরপর মাঝারি চালের দাম আর না বাড়ার তথ্য রয়েছে সংস্থাটির। অন্যদিকে টিসিবির হিসাবে, ৬ অক্টোবর থেকে নাজিরশাইল ও মিনিকেটের ন্যূনতম দাম ৭২ থেকে কমে ৭০ টাকা এবং সর্বোচ্চ দাম ৮৫ টাকা অপরিবর্তিত রয়েছে। সংস্থাটির তথ্যে, ৬ অক্টোবরের আগে নাজিরশাইল ও মিনিকেটের দাম ছিল ৭২ থেকে ৮৫ টাকা। আর মোটা চাল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, টিসিবির বাজারদরে পণ্যভিত্তিক সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ দামের মধ্যে ১০-১৫ টাকার পার্থক্য থাকে। ফলে বাজারে দাম ২-৪ টাকা ওঠানামা করলে অনেক সময় সেটির প্রভাব তাদের তালিকায় পাওয়া যায় না।
গত বছরের এ সময়ের তুলনায় চালের দাম বর্তমানে কিছুটা কম রয়েছে। টিসিবির হিসাবে, গত বছরের তুলনায় এ বছর চালের দাম গড়ে ৫ শতাংশ কম।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে সেপ্টেম্বরে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আগস্টে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। এ সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও সামান্য বেড়েছে।
খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন চালের দাম বাড়ার কোনো কারণই নেই। আমি মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিচ্ছি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি জানাচ্ছি। এ বিষয়ে সরকার কঠোর। চালের দাম বাড়ানোর সুযোগ ও কোনো কারণ নেই।’
প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী আরো বলেন, ‘সরকারকে মিল মালিকরা চাল দিতে চায়। সরকার এখন চাল সংগ্রহ করবে না। কয়দিন পর আবার আমরা সংগ্রহ করব। তখন তাদের থেকে চাল নেয়া হবে।’


