প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা বেশ প্রচলিত আছে— জমির দলিলে একবার ভুল হলে তা আর কোনোভাবেই সংশোধন করা যায় না। তবে বাস্তবে এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, জমির দলিল তৈরি বা রেজিস্ট্রি করার পর যদি তাতে দাগ, খতিয়ান, মৌজা, চৌহদ্দি বা নামের বানানে কোনো ভুল ধরা পড়ে, তবে সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা খুব সহজেই সংশোধন করা সম্ভব।
মূলত ভুলের ধরণ কেমন, তার ওপর নির্ভর করে সংশোধনের পদ্ধতি নির্ধারিত হয়ে থাকে।
দলিলের দাগ, খতিয়ান বা নামের মতো বড় ধরনের কোনো ভুল ধরা পড়লে ভুল সংশোধনের জন্য তিন বছরের মধ্যে নির্দিষ্ট দেওয়ানি আদালতে দলিল সংশোধনের মামলা করতে হয়। নির্দিষ্ট এই তিন বছরের সময়সীমা পার হয়ে গেলে তামাদির কারণে সাধারণত আর সংশোধনের মামলা করা যায় না, তবে তখন বিকল্প হিসেবে ঘোষণামূলক মামলা করার আইনি সুযোগ থাকে।
এক্ষেত্রে নতুন করে কোনো দলিল করার প্রয়োজন হয় না, কারণ আদালতের দেওয়া রায়ই মূল সংশোধনী দলিল হিসেবে গণ্য হয়। আদালতের রায়ের একটি সার্টিফাইড কপি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে পাঠানো হলে তারা সেই রায়ের আলোকে মূল রেজিস্টার বা ভলিউম বই সংশোধন করে নেন।
অন্যদিকে, দলিলে যদি বড় কোনো পরিবর্তন বা মালিকানার স্বত্ব বদলানোর প্রয়োজন না পড়ে—যেমন ছোটখাটো বানান ভুল বা টাইপিংয়ের সামান্য ত্রুটি—তবে তার জন্য আদালতে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন হয় না। এ ধরনের ছোটখাটো ভুল সংশোধনের জন্য সরাসরি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারের বরাবর আবেদন করলেই তিনি তা সংশোধন করে দিতে পারেন।
তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের আইনি ঝামেলা এড়ানোর জন্য দলিল তৈরির শুরুতেই কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা বুদ্ধিমানের কাজ। সবসময় সরকারি নির্ধারিত নমুনা বা ফরম্যাট অনুসরণ করে দলিল তৈরি করা উচিত এবং রেজিস্ট্রি করার আগে একাধিকবার ভালোভাবে প্রুফ রিডিং বা যাচাই করে নেওয়া জরুরি। আপনার জমির দলিল লেখক তালিকাভুক্ত কিনা তা যাচাই করে নিবেন।
এ ছাড়া যেকোনো ভুল এড়াতে সবসময় দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং তালিকাভুক্ত দলিল লেখক দিয়ে দলিল তৈরি করানো উচিত।
জমির মালিকানা নিশ্চিত করতে রেজিস্ট্রির আইনি প্রক্রিয়া
জমির মালিকানা নিশ্চিত করতে রেজিস্ট্রির আইনি প্রক্রিয়া
দলিল লেখার সময় ক্রেতাকে যেসব বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে
১. দলিল সম্পাদনকারী তথা জমি দাতা (বিক্রেতা) আইনের দৃষ্টিতে সাবালক ও সুস্থ মস্তিষ্কে সম্পন্ন কিনা তা যাচাই করে নিতে হবে৷
২. পুরাতন দলিল এবং নতুন দলিলের বিভিন্ন জায়গা যেমন (ক) শিরোনাম (খ) সাফ কবলা (গ) বায়নাপত্র ইত্যাদি খেয়াল করতে হবে৷
৩. ক্রেতা যে জমিটি কিনতে যাচ্ছেন সেই প্রস্তাবিত জমিটির পরিমাণ বিক্রয় মূল্য (বায়না দলিল হলে বায়নায় পরিশোধিত টাকা এবং বাকী টাকা) পক্ষ পরিচয় তথ্য (১) দলিল গ্রহীতা (২) দলিল দাতা অথবা (ক) প্রথম পক্ষ (খ) দ্বিতীয় পক্ষ উভয় পক্ষের পূর্ণ নাম, ঠিকানা, পেশা, ধর্ম ইত্যাদি।
স্বত্ত্বের বর্ণনা: জমি দাতার মালিকানার ভিত্তি, দলিল মূলে হলে পূর্বের দলিলের নম্বর ও তারিখ পর্চা/খতিয়ান ইত্যাদি ৷
৪. জমির বিক্রেতা যদি জমিটি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে থাকে তাহলে মূল মালিকের সঙ্গে বিক্রেতা যোগ সূত্র/সম্পর্ক সঠিক আছে কিনা তা জেনে নিতে হবে ।
৫. দলিলে প্রস্তাবিত জমির তফশিল যেমন জেলার নাম, উপজেলার নাম, রেজিস্ট্রি অফিসের নাম, মৌজার নাম, দাগ নং খতিয়ান নম্বর জমিটি কোন শ্রেণীর যেমন ভিটা, নাকি দলা, নাকি ডাঙ্গা নাকি জলাভূমিতে তা দেখতে হবে ।
৬. ক্রেতা যে জমিটি ক্রয় করতে চাচ্ছে সেই জমিটির চৌহদ্দি ঠিক আছে কিনা অর্থাৎ উত্তর, দক্ষিণ পূর্ব, পশ্চিম পাশের জমির বর্ণনাসহ মালিকের নাম উল্লেখ করতে হবে।
৭. জমি বিক্রেতা বা দলিল দাতা দলিলের ১ম পৃষ্ঠার উপরের ডান পাশের নীচ থেকে উপরের দিকে তার নিজ নাম স্বাক্ষর করবেন অথবা নিরক্ষর হলে নিজ নামের উপরে টিপ সহি প্রদান করেছেন কিনা তা দেখতে হবে। এ ছাড়াও জমি বিক্রেতা বা দাতা দলিলের শেষ পৃষ্ঠার নীচে স্বাক্ষর বা টিপ সহি করবেন। তবে দলিলের প্রতি পৃষ্ঠায় দাতার স্বাক্ষর বা টিপ সহি দিলে ভালো হয়।
৮. জমির বিক্রেতা দলিলের শেষ পৃষ্ঠার নীচে যে জায়গায় তার নিজ নাম স্বাক্ষর বা টিপ সহি করেছেন ঠিক তার নীচে উক্ত দলিলটির লেখক তার নাম স্বাক্ষর করবেন; এরপর কমপক্ষে ২ জন সাক্ষী এবং অপর একজন জমির বিক্রেতাকে শনাক্ত করে শনাক্তকারী হিসাবে স্বাক্ষর করবেন।
৯. দলিলে যতদূর সম্ভব কাটাকাটি, ঘষামাঝা, অষ্পষ্টতা এড়াতে হবে তবুও যদি কোনরূপ ভুল ক্রটি ঘষামাঝা কাটাকাটি হয়েও যায় তাহলে সেক্ষেত্রে উক্ত কাটাকাটি বা ঘষামাঝা যুক্ত লাইন ও শব্দের ক্রম উল্লেখ করে দলিলের শেষাংশে কৈফিয়ত লিখে দলিল লেখককে তার নীচে স্বাক্ষর করতে হবে।
১০. জমির তফশিল লেখার সময় প্রত্যেক দাগে মোট জমির পরিমাণ কত এবং আদ্যকার বিক্রয় দলিলে উক্ত দাগের মধ্য হতে কত একর বা শতাংশ জমি দেওয়া হচ্ছে তা প্রতি ক্ষেত্রে লিখে নিতে হবে। তবে উল্লেখ্য যে, কোন অবস্থাতেই কয়েকটি দাগের জমি একত্রে যোগ করে একর/শতাংশ লেখা উচিত হবে না।
১১. জমির ক্রেতাকে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে তা হলো বিভিন্ন জরিপের দাগ নম্বর ও খতিয়ান নম্বর, যাতে দলিল লেখকের মাধ্যমে সঠিকভাবে লিখানো হয়। এজন্য জমির ক্রেতাকে জমি ক্রয় করার পূর্বেই তহসিল অফিস হতে জমির সঠিক দাগ নম্বর ও খতিয়ান নম্বর জেনে নিতে হবে।


