প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
চার বছর পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকার পর আবারও পুরোদমে শুরু হয়েছে যুদ্ধ; এতে একদিকে রয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী, অন্যদিকে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও তাদের মূল পৃষ্ঠপোষক সৌদি আরব।
গত ৪ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুতিদের বিরুদ্ধে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। হুথিদের পুরোপুরি ‘নির্মূল’ করাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য বলে জানায় তারা।
তবে লক্ষ্য হিসেবে এটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী।
একসময় স্যান্ডেল পায়ে পিকআপ ভ্যানে চড়ে যুদ্ধ করা একদল বিশৃঙ্খল যোদ্ধা আখ্যা দিয়ে হুথিদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হতো। তারাই এখন নিজেদের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ সক্ষমতা ও শক্তির জানান দিচ্ছে। ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর বর্তমানে তারা এমন সব ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, যেখানে ইয়েমেনের মোট জনসংখ্যার সিংহভাগ মানুষের বসবাস।
অতীতে হুথিদের উৎখাত করতে সৌদি আরব দীর্ঘদিন সামরিক অভিযান চালিয়েছিল। তবে সেই অভিযান ব্যর্থ হয়। লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ ও ইসরায়েলে হুথিদের হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েল যৌথভাবে বিমান হামলা চালায়। হুথিরা সেই হামলাও সফলভাবে প্রতিহত করে।
দীর্ঘদিন ধরে ইরানের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা পেয়ে আসছে হুথিরা। তবে তারা অস্ত্র সংগ্রহের বিকল্প পথও খুঁজে নিয়েছে। পাশাপাশি নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে গোষ্ঠীটি। এর বড় প্রমাণ অক্টোবরে সৌদি আরবের একটি বিমানবন্দরে তাদের চালানো বিমান হামলা। ওই হামলায় এক ডজনের বেশি মানুষ নিহত হন। আহত হন শত শত মানুষ।
কারা এই হুথি?
‘আনসারুল্লাহ’ নামে পরিচিত হুথিরা ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী। ‘আনসারুল্লাহ’ শব্দের অর্থ ‘আল্লাহর সাহায্যকারী’। গোষ্ঠীটির উত্থান ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সাদা প্রদেশে। তারা শিয়া ইসলামের জাইদি শাখার অনুসারী। ইয়েমেনের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই শাখার অনুসারী।
উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন এক হওয়ার পর ১৯৯০-এর দশকে হুথি আন্দোলনের সূচনা হয়। পরে তারা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে একাধিকবার বিদ্রোহ করে।
২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নেয়। এর পরই দেশটিতে গৃহযুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করে। সেই সংঘাতের প্রভাব এখনো পুরো দেশে রয়ে গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে ইরানের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা পেয়ে আসছে হুথিরা। তবে তারা অস্ত্র সংগ্রহের বিকল্প পথও খুঁজে নিয়েছে। ছবি: রয়টার্স
হুথিরা যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর পাশাপাশি ইসরায়েলেরও কট্টর বিরোধী। যুক্তরাষ্ট্র তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
হুথিরা ইরানের নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ (অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স) নামে পরিচিত জোটের অংশ। এই জোটে লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনের গাজার হামাসও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ হিজবুল্লাহ ও হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
ইরান হুথিসহ এই জোটের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সামরিক সহায়তা দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সহায়তার মধ্যে অস্ত্র, সামরিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুথি ও ইরান কতটা ঘনিষ্ঠ?
হুথিরা ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সমন্বয় বজায় রাখে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের কৌশলগত লক্ষ্যও এক। তবে হুথিরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেয়।
ইরান হুথিদের অস্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তবে অস্ত্র সংগ্রহের জন্য তারা শুধু ইরানের ওপর নির্ভর করে না।
ইয়েমেনের ভেতরে বিভিন্ন উপজাতির চোরাচালান নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেও তারা অস্ত্র সংগ্রহ করে। পাশাপাশি চীনসহ দূরের বিভিন্ন দেশ থেকে বাণিজ্যিকভাবে সহজলভ্য সরঞ্জাম ও কাঁচামাল কিনছে তারা। এসব উপকরণ অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা যায়।
হুথিরা এখন নিজেরাই অস্ত্র তৈরি ও সংযোজনের চেষ্টা বাড়িয়েছে। ফলে ইরানে তৈরি সম্পূর্ণ অস্ত্রের ওপর তাদের নির্ভরতা কমছে। এতে প্রতিপক্ষের জন্য হুথিদের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা আগের চেয়ে কঠিন হয়ে পড়েছে।
কেন ইয়েমেন আবারও যুদ্ধ শুরু হলো?
২০২২ সাল নাগাদ ইয়েমেন যুদ্ধ বন্ধে দুই পক্ষের কাছে যথার্থ কারণ ছিল। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে আবার ক্ষমতায় বসানোর লক্ষ্যে সৌদি আরব এই যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করেছিল।
তবে হুথিরা নিজেদের অবস্থানে অনড় ছিল। তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে সৌদি আরবে পাল্টা হামলা চালিয়ে আসছিল।
যুদ্ধবিরতি হুথিদের কিছু সুবিধা আদায়ের সুযোগ করে দেয়। এর মধ্যে জ্বালানি আমদানি বাড়ানো এবং সানার বিমানবন্দর থেকে সীমিতসংখ্যক বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালুর অনুমতি পাওয়ার মতো সুবিধা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। এর ফলে সীমান্ত পেরিয়ে দুই পক্ষের হামলা অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়।
উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন এক হওয়ার পর ১৯৯০-এর দশকে হুথি আন্দোলনের সূচনা হয়। ছবি: রয়টার্স
ছয় মাস পর আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হয়। তবে এরপরও প্রায় চার বছর ধরে পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত ছিল। যদিও এই শান্ত পরিস্থিতি নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা ছিল না এবং যেকোনো সময় আবারও সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
এরপর চলতি বছরের ১৩ জুলাই সৌদি যুদ্ধবিমান সানার বিমানবন্দরে হামলা চালায়। হুথি প্রতিনিধিদের বহনকারী একটি ইরানি বিমানকে অবতরণ করতে বাধা দেওয়াই ছিল এই হামলার উদ্দেশ্য।
প্রতিনিধিদলটি ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির জানাজা থেকে ফিরছিল। ইরান যুদ্ধের শুরুতে তিনি নিহত হন।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমান ব্যবহার করে হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অস্ত্র ও সামরিক বিশেষজ্ঞ পাঠায়। সৌদি আরবের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বিমান কার্যত অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা পরিবহনের ‘আকাশপথের সেতু’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সংঘাত কীভাবে আরও তীব্র হলো?
সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে আভা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে পাল্টা জবাব দেয় হুথিরা।
২০ জুলাই সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ‘নৌ অবরোধ’ ঘোষণার কথা জানায় হুথিরা। তারা জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করে বলে, সৌদি আরবের বন্দর ব্যবহার করলে তাদের জাহাজ হামলার শিকার হতে পারে।
এরপর সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর, সামরিক অবস্থান ও তেল অবকাঠামোয় হামলা চালায় হুথিরা। এর জবাবে সৌদি আরবও বিমান হামলা চালায়। ইয়েমেনের ভেতরেও সৌদি সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে হামলা জোরদার করে হুথিরা।
সেপ্টেম্বরে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূখণ্ড দখলের সাফল্য পায় হুথিরা। তারা দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করে। প্রণালিটি তেল রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।
৮ অক্টোবর সৌদি আরবের রিয়াদে কিং খালিদ বিমানবন্দরে হুথিরা হামলা চালানোর দাবি করার পর বিমানবন্দরটি থেকে ধোঁয়া ও আগুনের শিখা উঠতে দেখা যায়। ছবি: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে নেওয়া ভিডিওর স্ক্রিনশট/রয়টার্স
হুথিদের দখলে নেওয়া এসব এলাকা পুনরুদ্ধার করা সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল।
তবে প্রতিবেশী সৌদি আরবের জন্য হুথিদের হুমকি ক্রমেই বাড়তে থাকে। অক্টোবরে সৌদি রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধারাবাহিক বিমান হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত হন। আহত হন শত শত মানুষ।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরবে এটাই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
এই লড়াইয়ে কী কী বিষয় ঝুঁকির মুখে?
সৌদি আরবের জন্য হুথিদের পরাজিত করার অর্থ হবে দীর্ঘদিনের এক শত্রুকে নির্মূল করা। হুথিদের হামলায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ডেটা সেন্টার থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকল্পে কয়েক শ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চান তিনি।
হুথিরা পরাজিত হলে জাহাজ চলাচলের ওপর বড় একটি হুমকি দূর হবে। তাদের হামলায় কয়েক বছর ধরে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
২০২৩ সালে লোহিত সাগরে জাহাজে প্রথম হামলা শুরু করার পর হুথিরা জানিয়েছিল, ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রতিশোধ হিসেবে তারা এসব হামলা চালাচ্ছে।
প্রথম দিকে গোষ্ঠীটি বলেছিল, তারা শুধু ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তবে ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই, এমন জাহাজেও হামলা চালানো হয়।
সুয়েজ খাল, লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব প্রণালি হয়ে যাওয়া নৌপথটি ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক পথ।
লোহিত সাগর এড়াতে এখন অনেক প্রতিষ্ঠান জাহাজ পাঠাচ্ছে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরিয়ে। এতে কয়েক হাজার মাইল বেশি পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। ফলে যাত্রার সময়ও দুই সপ্তাহ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট কী ধরনের সহায়তা পাচ্ছে?
হুথিদের মোকাবিলায় আরও সামরিক সহায়তা চেয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে আবেদন জানিয়েছে সৌদি সরকার।
সৌদি যুদ্ধবিমানকে আকাশে থাকা অবস্থায় জ্বালানি সরবরাহে সহায়তা করতে একটি উড়োজাহাজ দিচ্ছে যুক্তরাজ্য। অন্যদিকে, লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র ইয়ানবু সুরক্ষায় সেনা ও রাডার ব্যবস্থা পাঠানোর কথা জানিয়েছে ফ্রান্স।
যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়ার কথা জানায়নি। তবে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে দেশটি।


