প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বর্তমান পুলিশপ্রধান মো. আলী হোসেন ফকিরের বিতর্কিত মন্তব্যের পর পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) পদে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। শীর্ষ এই পদের জন্য তারই ব্যাচের (১৫তম বিসিএস) তিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নাম বিবেচনায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) এই তিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্য সংবলিত নথি (ফাইল) তলব করেছে।
এই কর্মকর্তারা হলেন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ, অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মহাপরিচালক (ডিজি) অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবিব পলাশ।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই তিন কর্মকর্তাই পদোন্নতি এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। সূত্র টিবিএস।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্র জানিয়েছে, জাপান সফর শেষে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফেরার পর পুলিশ নেতৃত্বে সম্ভাব্য পরিবর্তনসহ আইজিপি পদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে এই নিয়োগ সম্পূর্ণ নির্ভর করছে সরকারপ্রধানের সিদ্ধান্তের ওপর এবং অন্য কোনো প্রার্থীর নামও সামনে আসতে পারে বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।
সূত্রগুলো আরও জানায়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের নাম নিয়েও আলোচনা রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নির্ভর করবে গোয়েন্দা প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অতীত কার্যক্রম এবং এই পদের দায়িত্ব পালনে তাদের সক্ষমতার ওপর।
বর্তমান আইজিপির বক্তব্য ঘিরে গতকাল রাজনৈতিক ও সরকারি পর্যায়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী এই মন্তব্যকে সরকারের জন্য ‘বিব্রতকর’ বলে অভিহিত করেন। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানান, দেশে ফেরার পর প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি বিবেচনা করবেন। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য ‘ঠিক হয়নি’ এবং এ বিষয়ে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরই আইজিপি পদে সম্ভাব্য পরিবর্তনের আলোচনা আরও গতি পায়।
এপিবিএন-এর প্রধান হাসিব আজিজ
বর্তমানে অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদায় এপিবিএন-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হাসিব আজিজ। ১৫তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের এই কর্মকর্তা ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০২৬ সালের মার্চে তাকে এপিবিএন প্রধান করা হয়।
সিএমপি প্রধান হওয়ার আগে তিনি সিআইডির অধীন ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলের কমান্ড্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কর্মজীবনে তিনি ইন্টারপোল ডেস্কের প্রধান, টাঙ্গাইল পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের কমান্ড্যান্ট এবং এপিবিএন সদর দপ্তরের বিভিন্ন পদেও কাজ করেছেন।
১৯৭১ সালে শরীয়তপুরে জন্মগ্রহণকারী হাসিব আজিজ সাবেক আইজিপি এম আজিজুল হকের সন্তান; যিনি ২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাও ছিলেন।
সিআইডডি প্রধান মোশাররফ হোসেন
অতিরিক্ত আইজিপি মোশাররফ হোসেন ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে সিআইডি প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৫তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের এই কর্মকর্তা ১৯৯৫ সালে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। তিনি কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং যুক্তরাজ্যে আইনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
সিআইডি প্রধান হওয়ার আগে তিনি প্রেষণে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে পদে দায়িত্ব পালনকালেই তিনি অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পান।
মাঠ পর্যায়ে তিনি পিরোজপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) ছিলেন। এছাড়া সিআইডি সদর দপ্তর এবং এর চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা ইউনিটেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, ডিএমপি, সিএমপি, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং পুলিশ সদর দপ্তরেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
এসআরবি প্রধান হাবিব পলাশ
অতিরিক্ত আইজিপি আহসান হাবিব পলাশ নবগঠিত এসআরবি-এর প্রথম মহাপরিচালক (ডিজি)। এর আগে তিনি র্যাবের সর্বশেষ ডিজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৫তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা পলাশ ১৯৯৫ সালে এএসপি হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়া থেকে পেশাগত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি।
২০২৬ সালের মার্চে তিনি অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পেয়ে র্যাবের ডিজি হিসেবে নিয়োগ পান এবং ২৮ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বরে তিনি এসআরবি-এর প্রথম প্রধান হন। র্যাবের দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) ছিলেন। তাঁর আগের কর্মস্থলের মধ্যে রয়েছে ডিএমপি, সিএমপি, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ, এপিবিএন, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং বিভিন্ন জেলার মাঠ পর্যায়ের পদ।
কী বলেছিলেন আইজিপি ফকির?
গত সোমবার পুরান ঢাকার চকবাজারে এক অনুষ্ঠানে আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেন, সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে পুলিশ ক্রসফায়ারে যেতে দ্বিধাবোধ করবে না। একই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে তাদের ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দেওয়া হয়, আর নিষ্ক্রিয় থাকলে ‘দুর্বল’ বলা হয়। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশকে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ দেওয়ার ওপরও জোর দেন তিনি।
তার এই ক্রসফায়ার সংক্রান্ত বক্তব্য রাজনৈতিক মহল, মানবাধিকার সংস্থা এবং বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।
পরবর্তীতে সেদিন রাতেই এক ব্যাখ্যায় পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, আইজিপি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারবহির্ভূত শাস্তি বোঝাতে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেননি; বরং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ বোঝাতে তিনি রূপক অর্থে শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।


