Wednesday, July 1, 2026
spot_img
Homeসংবাদতুরস্ক-সিরিয়া মৃত্যুকূপ

তুরস্ক-সিরিয়া মৃত্যুকূপ

প্রাইম ভিশন ডেস্ক »

তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চল ও সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল- গতকাল সোমবার স্থানীয় সময় ভোর ৪.১৭ মিনিট, বেশির ভাগ মানুষ তখনো ঘুমে… ঠিক এমন সময় মারাত্মক দুলোনিতে কেঁপে ওঠে সবকিছু। প্রায় মিনিটখানেকের প্রচ- শক্তিশালী কম্পনে ল-ভ- হয়ে যায় সবকিছু। বড় বড় ভবন ঠুনকো কাচের মতো ভেঙে পড়ে, মিশে যায় মাটির সঙ্গে। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দুই দেশে নিহতের সংখ্যা ২৩০০ জন ছাড়িয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেকে আটকেপড়ায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, প্রাণহানির সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শুধু তুরস্কেই ১৪৯৮ জনের বেশি এবং সিরিয়াতে ৮১০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছেন। তুরস্কে আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫ হাজার ৩৮৫ জন; অন্যদিকে সিরিয়ায় এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০০ জনে। খবর বিবিসি, আল জাজিরা, সিএনএন ও তাসনিম নিউজ।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানিয়েছে, শক্তিশালী ভূমিকম্পনটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৮। আর এর কেন্দ্রস্থল ছিল তুরস্কের অন্যতম প্রধান শহর ও প্রাদেশিক রাজধানী গাজিয়ানতেপ থেকে ৩৩ কিমি দূরে এবং ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৮ কিমি গভীরে। প্রথম কম্পনের মাত্র ১০ মিনিট পর আরও একটি পরাঘাত অনুভূত হয়, যার মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৭। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টার পর একই এলাকায় আবারও শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়, যার মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫। এসব কম্পনের মাত্রা এতই শক্তিশালী ছিল যে- সুদূর লেবানন, সাইপ্রাস, ইসরায়েল থেকেও তা অনুভূত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ভূমিকম্পে তুরস্কে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিধ্বস্ত এলাকায় চারদিকে ধ্বংসস্তূপ। সারি সারি মরদেহ আর আহত মানুষের আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধার তৎপরতা শুরু হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের কারণে ১০টি শহরের স্কুল সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রাদেশিক বিমানবন্দরের কার্যক্রমও সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। তুরস্কের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ হতাহত এবং ক্ষয়ক্ষতির হালনাগাদ তথ্য পরিবেশন করেছে। অন্যদিকে সিরিয়ার বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় উদ্ধারকারী গোষ্ঠী হোয়াইট

হেলম্যাট ক্ষয়ক্ষতির তথ্য নিশ্চিত করেছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান টেলিভিশন ভাষণে ‘বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের’ কথা জানিয়ে বলেছেন, দেশজুড়ে প্রায় ২৮১৮টি ভবন ধ্বংস হয়েছে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিগগিরই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠব। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তুরস্ককে অভয় দিয়ে জানিয়েছেন ‘পাশে আছি’। অন্যদিকে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের আলেপ্পো, হামা, লাতাকিয়া, তারতোসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সিরিয়ার এই অঞ্চলটি বিদ্রোহীরা নিয়ন্ত্রণ করছে। এসব এলাকায় সক্রিয় উদ্ধারকারী সংগঠন ‘হোয়াইট হেলমেট’ জরুরি সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। তবে দেশটির সরকার নিয়ন্ত্রিত কিছু এলাকাতেও ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

তুরস্কের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় বিশ^ সম্প্রদায়ের প্রতি জরুরি ভিত্তিতে মানবিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ ৪৫টি দেশ তুরস্কে জরুরি সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছে। তুরস্কের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে যেসব দেশ উদ্ধারকারী দল ও সহায়তা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- চীন, ভারত, জার্মানি, গ্রিস, ইরান, ইসরায়েল, পোল্যান্ড, কাতার, স্পেন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, এমনকী যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনও জানিয়েছে তারা সহায়তা পাঠানোর জন্য প্রস্তুত। পাশাপাশি বিশ^ নেতৃত্ব তুরস্কের এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।

এদিকে ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত এলাকায় বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। তুরস্কের আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, প্রথম কম্পনের উপকেন্দ্র এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ওই এলাকার তাপমাত্রা মাত্র ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে পড়েছে। বিধ্বস্ত এলাকায় প্রায় ৩ থেকে ৫ সেমি তুষার জমে রয়েছে। এমন বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যে উদ্ধারকর্মীরা প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করতে পারছেন না। এ ছাড়া তুরস্কের পাবর্ত্য এলাকাগুলোয় উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

এদিকে বিবিসির বিজ্ঞানবিষয়ক প্রতিবেদক পল্লব ঘোষ জানিয়েছেন, ভূমিকম্পটি তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে উত্তর-পশ্চিমে ভূগর্ভের অবস্থিত পূর্ব আনাতোলিয়ান ফাটলের আশপাশে ঘটেছে। ভূকম্পনবিদরা দীর্ঘদিন থেকে এই ফাটলকে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন। কিন্তু বিগত একশ বছরের মধ্যে ওই এলাকায় দায়িত্বশীল কোনো তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়নি। এই ফাটলে ১৮৮২ সালের ১৩ আগস্ট ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল, যা গতকালের চেয়ে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কম ছিল। এমনকী ১৯ শতকে ওই এলাকায় ভূমিকম্পে সিরিয়ার আলেপ্পোয় ৭ হাজার লোক মারা গিয়েছিলেন। শক্তিশালী ওই ভূমিকম্পের এক বছর পরও আফটার শক বা পরাঘাত অনুভূত হতো।

গতকাল তুরস্কের ভূমিকম্পের প্রত্যক্ষদর্র্শীরা সবাই ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন। ভূমিকম্পে অক্ষত ওজগুল বলেন, চোখের সামনে ভবনের জানালাগুলো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। ওজগুল তার ভাইয়ের সঙ্গে ঘুমাচ্ছিলেন। তার কথায়, আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে বলছিলাম, তুমি কি কাঁপছো।

তুরস্কের আদানা শহরের আরেক বাসিন্দা নিলুফার আসলান জানিয়েছেন, তারা পাঁচতলার একটি বাড়িতে থাকেন। ভূমিকম্পের সময় তিনি ধরেই নিয়েছিলেন, আর বাঁচবেন না। এই ভেবে পরিবারের সবাইকে ডেকে বলেন- আসো, অন্তত সবাই একসঙ্গে মরি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়