প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
বিলাসবহুল অতিথিশালা। টানেল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সংস্থা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ এটি ইজারা দেয়ার জন্য গত জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে। প্রস্তাব জমা পড়ে দুটি, তাও স্থানীয় প্রতিষ্ঠান থেকে। আবার প্রতিষ্ঠান দুটি যে দর প্রস্তাব করেছে, তা সেতু কর্তৃপক্ষের প্রাক্কলনের চেয়েও কম। এমন পরিপ্রেক্ষিতে ইজারার জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বান করেছে সংস্থাটি।
অতিথিশালাটি নির্মাণ করা হয়েছে কর্ণফুলী টানেলের আনোয়ারা প্রান্তে। এতে রয়েছে একটি ভিআইপি বাংলো। অত্যাধুনিক ও সুসজ্জিত এ বাংলোটি প্রায় পাঁচ হাজার বর্গফুট আয়তনের। কক্ষ রয়েছে ছয়টি। আছে একটি সুইমিংপুলও। ভিআইপি এ বাংলো ছাড়াও অতিথিশালায় রয়েছে আরো ৩০টি বাংলো। রয়েছে ৪৮টি মোটেল মেস। আরো আছে একটি কনভেনশন সেন্টার, রেস্টুরেন্টসহ অভ্যর্থনা ভবন, দোকান, ফুড কোর্ট, জিমনেশিয়াম, কনফারেন্স সুবিধাসহ অফিস স্পেস, বিনোদন এলাকা, অ্যাম্ফিথিয়েটার, জাদুঘর, মসজিদ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পানি শোধনাগার, সড়কসহ আনুষঙ্গিক নানা অবকাঠামো।
সব অবকাঠামোসহ পুরো অতিথিশালাটি ইজারা দেয়ার জন্য গত ২ জুলাই প্রথমবার দরপত্র আহ্বান করে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। ইজারার মেয়াদ ধরা হয় ২৯ বছর। সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতিথিশালার সব অবকাঠামো আন্তর্জাতিক মানের। এগুলো ইজারার জন্য তাই আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও কোনো বিদেশী প্রতিষ্ঠান কিংবা বিদেশী প্রতিষ্ঠানের জয়েন্ট ভেঞ্চার দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদাউস।
কেন দ্বিতীয়বার দরপত্র আহ্বানের প্রয়োজন হলো—এমন প্রশ্নে সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী বলেন, ‘প্রথম টেন্ডারে দর কম এসেছিল। সাধারণত লিজের দরপত্রে দু-একবার দেখতে হয়, যেন দর বেশি পাওয়া যায়। আসলে আমরা আরেকবার দেখতে চাই, এর চেয়ে বেশি আসে কিনা। বেশি না এলে তাদেরই দিয়ে দেব।’
তিনি বলেন, ‘এটা অনেকটা নিলামের মতো। আবার আমাদের দর প্রাক্কলনের কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ডও ঠিক করা নেই। এ ধরনের কাজের জন্য কোনো প্রাক্কলনও আমাদের শিডিউলে নেই। প্রতিদিন কতজন লোক ওখানে (অতিথিশালা) থাকবে, তাও আমরা জানি না। তার পরও আমরা একটি আনুমানিক প্রাক্কলন করেছি। আমরা চাই, এ রাষ্ট্রীয় সম্পদ থেকে সর্বোচ্চ রাজস্ব যেন সরকারের কোষাগারে জমা হয়।’
কর্ণফুলী টানেলের অতিথিশালা ইজারার প্রথম দরপত্রে দুটি প্রতিষ্ঠান দরপ্রস্তাব জমা দিয়েছিল। দ্বিতীয়বার আহ্বান করা দরপত্রে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছে কিনা এমন প্রশ্নে কাজী মো. ফেরদাউস বলেন, ‘এবার তিনটি প্রতিষ্ঠান দর প্রস্তাব করেছে। এখনো প্রস্তাব মূল্যায়নের কাজ শুরু হয়নি।’
কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মাণ করা হয়েছে এ বিলাসবহুল অতিথিশালা। এতে খরচ হয়েছে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা, যার সিংহভাগই ঋণ হিসেবে বাংলাদেশকে দিয়েছে চীন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল চালুর পর থেকেই লোকসানে রয়েছে। টোল বাবদ যা আয় হচ্ছে, তা দিয়ে টানেলটির পরিচালন ব্যয় উঠছে না। ব্যয় মেটাতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ লোকসান গুনছে টানেলটির নির্মাণকারী সংস্থা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরও এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। সেতু কর্তৃপক্ষের প্রাক্কলন অনুযায়ী চলতি অর্থবছর টানেল থেকে লোকসান হতে পারে ১৬৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
টানেলের ভেতরে কৃত্রিম অক্সিজেন ও আলো সরবরাহ, সামগ্রিক নিরাপত্তা ও সার্বক্ষণিক জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখতে হয়। এ কারণে টানেলের পরিচালন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে থাকে। প্রকল্পটির জন্য করা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, নির্মাণের পর টানেলটিতে দুই ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ দরকার হবে। একটি হলো প্রতিদিনকার রক্ষণাবেক্ষণ। টানেলের ভেতরে বিদ্যুৎ সরবরাহ, কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ করে অক্সিজেন সরবরাহসহ বিভিন্ন দৈনন্দিন কাজ এ রক্ষণাবেক্ষণের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে প্রতি পাঁচ বছর পর একবার বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ। রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াও কর্মীদের বেতন, বিদ্যুৎ-জ্বালানিসহ আনুষঙ্গিক পরিচালন কাজেও খরচ হবে। বিপরীতে টানেল থেকে আয়ের প্রধান খাত চলাচল করা যানবাহন থেকে টোল আদায়। টানেল প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মিত অতিথিশালা ইজারা দিয়ে আয় বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে সেতু কর্তৃপক্ষ।
শুধু কর্ণফুলী টানেল নয়, সেতু কর্তৃপক্ষের আরেক প্রকল্প পদ্মা বহুমুখী সেতুর সার্ভিস এলাকায়ও বিলাসবহুল অতিথিশালা তৈরি করা হয়েছে। এজন্য খরচ হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। এ অতিথিশালাও ইজারার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে সেতু কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে দরপত্র মূল্যায়নের কাজ চলমান আছে। পদ্মা সেতুর অতিথিশালার জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বানের দরকার হবে কিনা তা মূল্যায়নের পর বোঝা যাবে বলে জানিয়েছেন সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা।


