প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
বিতর্কের শুরু
ঘটনাটি ঘটেছে ইউনান প্রদেশের লিনচাং শহরের মেংডিং টাউনশিপের একটি গ্রামে। গত বছরের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে ওই গ্রামের পক্ষ থেকে একটি লিখিত নথি প্রকাশ করা হয়। সেই নথিতে গ্রামের বাসিন্দাদের দৈনন্দিন আচরণ, বিয়ে, দাম্পত্য সম্পর্ক এবং পারিবারিক জীবন-সংক্রান্ত একাধিক নিয়ম ও জরিমানার কথা উল্লেখ করা হয়। নথিটি প্রকাশের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
প্রদেশের বাইরে বিয়েতে অর্থদণ্ড
নিয়ম অনুযায়ী, গ্রামের কোনো বাসিন্দা যদি নিজের প্রদেশের বাইরে কাউকে বিয়ে করেন, তাহলে তাঁকে ১ হাজার ৫০০ ইউয়ান জরিমানা দিতে হবে। এ ছাড়া বিয়ে নিবন্ধন না করে একসঙ্গে বসবাস করলে প্রতিবছর ৫০০ ইউয়ান করে জরিমানা ধার্য করা হবে। অনেকের মতে, এ নিয়ম সরাসরি নাগরিকদের ব্যক্তিগত পছন্দ ও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে।
বিয়ের আগে গর্ভধারণে কঠোর শাস্তি
বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে গর্ভধারণ-সংক্রান্ত নিয়মটি। এতে বলা হয়েছে, কোনো নারী যদি বিয়ের আগে গর্ভবতী হন, অথবা বিয়ের পর ১০ মাসের কম সময়ের মধ্যে সন্তান জন্ম দেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট পরিবারকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ইউয়ান জরিমানা দিতে হবে। সমালোচকদের মতে, এ নিয়ম মানুষের একেবারে ব্যক্তিগত ও শারীরিক সিদ্ধান্তের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। কার কখন সন্তান হবে, সেটা ব্যক্তিগত বিষয়। সেখানে জরিমানা আরোপ করা অযৌক্তিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ।
ঝগড়া করলেও জরিমানা
নিয়মাবলিতে দাম্পত্যকলহের বিষয়েও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। কোনো স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ায় যদি গ্রাম কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ করতে হয়, তাহলে উভয় পক্ষকেই ৫০০ ইউয়ান করে জরিমানা দিতে হবে। এ ছাড়া মদ্যপ অবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং গ্রামে গুজব বা মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে ৫০০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ইউয়ান পর্যন্ত জরিমানার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশাসনের অবস্থান
নিয়মগুলো ভাইরাল হওয়ার পর মেংডিং টাউন সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। প্রশাসন স্পষ্ট করে জানায়, গ্রাম কর্তৃপক্ষ এসব নিয়ম জারি করার কোনো আইনগত ক্ষমতা রাখে না। তাঁদের ভাষায়, গ্রাম কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বতন প্রশাসনকে না জানিয়ে একতরফাভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা চীনের প্রচলিত আইনের পরিপন্থী। চীনের আইনে নাগরিকদের বিয়ের স্বাধীনতা স্বীকৃত। কোনো স্থানীয় সরকার বা গ্রাম প্রশাসনেরই প্রদেশের বাইরে কিংবা ভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে বিয়ে নিষিদ্ধ করার অধিকার নেই। তাই বিতর্কিত নিয়মগুলো অবিলম্বে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর চীনের জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম ওয়েইবোতে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা যায়। অনেক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, গ্রাম কর্তৃপক্ষ অর্থ আদায়ের জন্য অযৌক্তিক ও হাস্যকর নিয়ম তৈরি করেছে। কেউ কেউ লেখেন, ‘আমরা কি ২০২৫ সালে আছি, নাকি এক শ বছর আগের সামন্ত যুগে ফিরে গেছি?’
এর আগেও এমন ঘটনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের গ্রামীণ এলাকায় মাঝেমধ্যে এ ধরনের চরম ও অদ্ভুত নিয়মের কথা শোনা যায়। এর আগে ২০২৩ সালে সিচুয়ান প্রদেশের পুগে কাউন্টিতে কম্বল না ভাঁজ করা বা নোংরা বাসন রেখে দেওয়ার জন্য জরিমানা আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েও দেশটিতে সমালোচনা হয়েছিল ব্যাপক।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধানবিরোধী ও ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপমূলক এমন সিদ্ধান্ত শুধু সামাজিক অসন্তোষই বাড়ায় না, প্রশাসনের ওপর মানুষের আস্থাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সূত্র: ভিএন এক্সপ্রেস


