প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
চট্টগ্রামের পাহাড়তলী-ঝাউতলা বাইপাসে বদলে যাবে ঢাকা-কক্সবাজার রেলপথ। মাত্র দুই দশমিক দুই কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথ নতুন করে নির্মাণে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে যাতায়াতের সময় প্রায় দেড় ঘণ্টা কমে আসবে। শিগগিরই এই বাইপাস নির্মাণের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে রেলওয়ে। রেলপথ নির্মাণের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও নিয়োগের পর্যায়ে রয়েছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ১০ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘চট্টগ্রাম-দোহাজারী মিটার গেজ রেলপথকে ডুয়েল গেজ রেলপথে রূপান্তর’ প্রকল্পের আওতায় নতুন এই বাইপাস রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পেলেও এতদিন বাইপাসের বিষয়টি আলোচনায় আসেনি। গত দুই দিন ধরে এডিবি ও রেলওয়ের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এই প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামে কাজ করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো নতুন এই বাইপাস রেলপথটি কোন দিক দিয়ে যাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর জানতে গতকাল পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ তানভীরুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকা-কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী ট্রেনগুলো পাহাড়তলী থেকে এখন চট্টগ্রাম রেলওয়ে পর্যন্ত এসে আবারও ঘুরে উল্টোপথে যাত্রা করে কক্সবাজারের দিকে। এতে বেশি সময় ও পথ অতিক্রম করতে হয়। বর্তমানে ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় নতুন একটি বাইপাস নির্মাণ করা হচ্ছে।
কোন দিক দিয়ে হবে এই বাইপাস? : বাইপাস রেলপথটি কোন দিক দিয়ে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কথা হয় প্রকল্পের উপ-পরিচালক আরিফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, পাহাড়তলী থেকে ঝাউতলা পর্যন্ত ২ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বাইপাস নির্মিত হবে। এতে পাহাড়তলী রেলওয়ে স্টেশন ও ঝাউতলা রেলওয়ে স্টেশন নতুন করে নির্মিত হবে। এতে রেলপথ নির্মাণের জন্য কি কোনো জায়গা অধিগ্রহণ করতে হবে? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাইপাস রেলপথটি রেলওয়ের নিজস্ব ভূমির ওপর দিয়ে নির্মিত হবে। ফলে এখানে জায়গা অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না।
এ বিষয়ে রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নতুন করে নির্মাণ হতে যাওয়া বাইপাসটি পাহাড়তলী রেলওয়ে স্টেশন থেকে দক্ষিণে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যেতে ৯১৫ মিটার দূরে রয়েছে আজব বাহার খাল। আর এই খালের পাশ দিয়ে পূর্ব দিকে ৪০০ মিটার এগুলোই কক্সবাজার রুটে যাওয়ার জন্য রেলপথ রয়েছে। রেলপথের এই পয়েন্ট থেকে উত্তর দিকে ৭৭৫ মিটার এগোলেই ঝাউতলা রেলওয়ে স্টেশন। বাইপাস রুটটি এই পথেই নির্মাণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এতে পুরো রেলপথটি রেলওয়ের জায়গার ওপর দিয়ে যাবে। এছাড়া এই জায়গাগুলোতে কোথাও বস্তি কিংবা কোথাও রেলওয়ের কয়েকটি একতলা কোয়ার্টার রয়েছে। কোয়ার্টারের বাসিন্দাদের অন্যত্র পুনর্বাসন করলেই সহজে বাইপাস রেলপথটি নির্মাণ সম্ভব।
ঝাউতলায় নামবেন চট্টগ্রামের যাত্রীরা : নতুন এই বাইপাস রেলপথটি নির্মিত হলে ঢাকা থেকে কক্সবাজারমুখী ট্রেনটি চট্টগ্রাম স্টেশনে প্রবেশ করবে না। তাহলে ঢাকা থেকে কিংবা কক্সবাজার থেকে আসা চট্টগ্রামের যাত্রীরা কোথায় নামবেন? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে উপ-প্রকল্প পরিচালক আরিফুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রামের যাত্রীরা ঝাউতলা স্টেশন থেকে উঠতে ও নামতে পারবেন। এ জন্য আমরা ঝাউতলা স্টেশনকে আরও বড় করার পাশাপাশি উন্নত সুযোগ-সুবিধাযুক্ত করা হবে প্রকল্পের আওতায়।
বাঁচবে দেড় ঘণ্টা : কক্সবাজার রুটে বর্তমানে চারটি ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে পর্যটক এক্সপ্রেস ও কক্সবাজার এক্সপ্রেস ঢাকা থেকে কক্সবাজার এবং সৈকত ও প্রবাল এক্সপ্রেস চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত যাতায়াত করে। রেলওয়ের বাণিজ্যিক বিভাগের তথ্য মতে, রেলওয়ের লাভজনক রুটগুলোর মধ্যে ঢাকা-কক্সবাজার রুট শীর্ষে রয়েছে। এছাড়া এই রুটে যাত্রীদের চাপও বেশি। ঢাকা থেকে বর্তমানে যাতায়াত করতে ৭ ঘণ্টা ৫২ মিনিট সময় লাগে রেলওয়ের টাইট টেবিল অনুযায়ী। এ বিষয়ে কথা হয় রেলওয়ের সিনিয়র লোকো মাস্টার আবদুল আউয়াল রানার সঙ্গে। তিনি বলেন, নতুন এই বাইপাস ও রেলপথ নতুন হলে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় কম লাগবে।’
কীভাবে সময় কমবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন আমরা পাহাড়তলী থেকে ট্রেনটি চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে নিয়ে যাই। সেখানে ২০ মিনিট অপেক্ষা টাইম রয়েছে। এসময় ট্রেনের ইঞ্জিন ঘুরিয়ে আনতে হয়। ঘুরানোর পর আবারও উল্টোপথে (যে পথে ট্রেনটি একটু আগে গিয়েছে) প্রায় আড়াই কিলোমিটার গিয়ে জংশন কেবিন হয়ে ঝাউতলা স্টেশনের দিকে যেতে হয়। আবার জংশন কেবিন থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৪৯ কিলোমিটারের এই রেলপথটি পুরনো হওয়ায় এখানে ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটারের বেশি গতি তোলা যায় না। ফলে সময় বেশি লাগে। তাই এই প্রকল্পের আওতায় বাইপাস ও রেলপথটি নতুনভাবে নির্মিত হলে ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৮৫ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালনা করা গেলে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় কম লাগবে।
উল্লেখ্য, নতুন এই প্রকল্পের আওতায় ৫২ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে যাত্রীদের সুবিধার্থে পাহাড়তলী, ষোলশহর এবং ঝাউতলা স্টেশন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি সিবিআই সিগন্যাল এবং ইন্টারলকিং পদ্ধতিও চালু করা হবে। বাইপাস কার্যকর হলে চট্টগ্রামের যাত্রীরা এসব স্টেশন থেকেই ওঠানামা করার সুযোগ পাবেন। দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ হলেও চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত মিটার গেজ রেলপথে চলছে ট্রেন।


