শনিবার, এপ্রিল ১৮, ২০২৬
spot_img
Homeএই মুহুর্তেহরমুজে মার্কিন অবরোধ, রুশ তেলে ছাড়ের মেয়াদ শেষ; ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নয়া...

হরমুজে মার্কিন অবরোধ, রুশ তেলে ছাড়ের মেয়াদ শেষ; ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নয়া সংকটে

প্রাইম ভিশন ডেস্ক »

ভারত কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকলেও ক্রমেই এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে, যেখানে ওয়াশিংটনের নীতিগুলো তার স্বার্থের বিরুদ্ধেই যাচ্ছে—বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে। ইরান যুদ্ধ এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে।

সোমবার যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ ও সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজ চলাচল বন্ধ করা শুরু করে—যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদক্ষেপ নয়াদিল্লির জন্য বড় ধাক্কা। সাত বছর পর সম্প্রতি ভারত প্রথমবারের মতো ইরান থেকে তেল আমদানি শুরু করেছিল, ঠিক তখনই এই অবরোধ কার্যকর হয়। একই সঙ্গে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেই ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়া, যার আওতায় ভারতসহ বিভিন্ন দেশ রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল কিনতে পারত। গত ১১ এপ্রিল এই ছাড় শেষ হয়। এতে করে, বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকটের মধ্যে ভারতের একটি বড় জ্বালানি উৎসও বন্ধ হয়ে গেছে।

জ্বালানি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান এক্সঅ্যানালিস্টসের প্রধান তেল বিশ্লেষক মুকেশ সহদেব সিএনবিসিকে বলেন, “ইরানি তেলের সরবরাহ হারানো এবং রুশ তেল না পাওয়ার ফলে ভারতের সরবরাহ সংকট দ্রুত বাড়ছে।”

ভারত তার মোট চাহিদার ৮৫% এর বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানি করে—প্রতিদিন প্রায় ৫.৫ মিলিয়ন ব্যারেল—যার ফলে দেশটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক। সহদেবের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আগে যে প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল তেলের জোগান প্রতিদিন আসত, তা ইতোমধ্যে হারিয়েছে ভারত। ফলে বিকল্প উৎস, বিশেষ করে রাশিয়া থেকে তেল সংগ্রহে তৎপর হতে হয় দেশটিকে।

সরবরাহে বিঘ্ন দীর্ঘস্থায়ী হলে ভারত আরও নাজুক অবস্থায় পড়বে বলে সতর্ক করেন সহদেব। তিনি বলেন, চীনের যেখানে প্রায় ৩০০ দিনের তেলের মজুত রয়েছে, সেখানে ভারতের মজুত প্রায় ১৬ কোটি ব্যারেল—যা মাত্র ৩০ দিনের মতো সংকট মোকাবিলার সামর্থ্য দেয়।

যদিও এখনো জ্বালানি সরবরাহে সরাসরি ঘাটতি দেখা দেয়নি, তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকে পড়তে শুরু করেছে। গত মাসে এইচএসবিসি-এর ফ্ল্যাশ পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) দেখায়, অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়ায় মার্চে ভারতের বেসরকারি খাতের কার্যক্রম অক্টোবর ২০২২-এর পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।

জরিপে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বাজারের অস্থিরতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়া অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কয়েকদিন পর ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ও সতর্ক করে জানায়, ২০২৭ সালের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরের জন্য ৭–৭.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস “উল্লেখযোগ্য নিম্নমুখী ঝুঁকির” মুখে রয়েছে—যার পেছনে ইরান যুদ্ধজনিত জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন বড় কারণ।

কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের চ্যালেঞ্জ

বর্তমান এই সংকট ভারতের জন্য একটি বৃহত্তর চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছে—যেখানে তাকে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রত্যাশার ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে নয়াদিল্লি জ্বালানি নিরাপত্তায় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের কথা বললেও সাম্প্রতিক মার্কিন পদক্ষেপগুলো সেই স্বাধীনতাকে সীমিত করে দিচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।

গত বছর ওয়াশিংটন ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫% শুল্ক আরোপ করে এবং রাশিয়ার দেওয়া ছাড়কৃত মূল্যে তেল আমদানির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তার অভিযোগ তোলে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি এগিয়ে নিতে ভারত তখন রুশ তেল আমদানি কমিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি বাড়ায়।

কিন্তু অঞ্চলটিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই কৌশল ভেঙে পড়ে। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এবং জ্বালানির দাম বাড়ায় ভারত যখন আবারও রুশ তেলের দিকে ঝুঁকে পড়ে—ঠিক তখনই এই মাসে মার্কিন ছাড়ের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।

আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান- ভোগেল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা প্রধান সামির কাপাডিয়া সিএনবিসির ‘ইনসাইড ইন্ডিয়া’ অনুষ্ঠানে বলেন, “ভারত সরকারের জন্য আমার খারাপ লাগে। তাদেরকে বারবার বলা হচ্ছে তারা রাশিয়া বা ইরান থেকে তেল কিনতে পারবে কি না।”

তিনি বলেন, “তারা এখন এক ধরনের দোলাচলে আছে—যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা মেটাতে গিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করছে। ভারতের জন্য সহজ কোনো পথ নেই।”

জ্বালানিবাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে ভারত প্রতিদিন ১৫ লাখ ব্যারেল রাশিয়ান তেল আমদানি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তখন ৩০ দিনের একটি বিশেষ ছাড় দিয়েছিল, যাতে ভারত আবার এই আমদানি শুরু করতে পারে। এক সপ্তাহ পর ওয়াশিংটন সাময়িকভাবে সমুদ্রে ভাসমান ট্যাংকারে আটকে থাকা রুশ তেল কেনার অনুমতিও দেয়, যাতে বাজার স্থিতিশীল থাকে।

তবে ১১ এপ্রিল এই অনুমোদনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও এই ছাড় বাড়াতে হতে পারে।

রিস্টাড এনার্জির জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট পঙ্কজ শ্রীবাস্তব বলেন, “জ্বালানি বাজার ইতোমধ্যে চাপে রয়েছে, এবং ভারত আশা করছে এই ছাড় বাড়ানো হবে।”

তবে আপাতত সরকার তাৎক্ষণিক ঝুঁকি কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছে। সোমবার ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয় জানায়, “সব রিফাইনারি উচ্চ সক্ষমতায় চলছে এবং অপরিশোধিত তেলের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে।” তবে এ বিষয়ে সিএনবিসির অতিরিক্ত প্রশ্নের জবাব দেয়নি মন্ত্রণালয়।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়