প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
এরই মধ্যে দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত এ কনটেইনার টার্মিনালের ইজারা পেতে পৃথক প্রস্তাব নিয়ে সামনে এসেছে দেশী প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেকের নেতৃত্বাধীন তিন প্রতিষ্ঠানের কনসোর্টিয়াম ও দেশীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপ। উভয় পক্ষের দাবি, বিদেশী অপারেটরের তুলনায় তারা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে বেশি রাজস্ব দিতে সক্ষম। একই সঙ্গে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ বন্দর অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ দেশীয় ব্যবস্থাপনার আওতায় রাখাও সম্ভব হবে।
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের নেতৃত্বে গঠিত ‘সাইফ-কসমস-এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস কনসোর্টিয়াম’ এনসিটি ১৫ বছরের জন্য পরিচালনার প্রস্তাব জমা দিয়েছে। কনসোর্টিয়ামটির প্রস্তাবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, টার্মিনালের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকবে। একই সঙ্গে জাহাজ ও কনটেইনার সংক্রান্ত সব ধরনের মাশুলও আদায় করবে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেই। অন্যদিকে পরিচালনা, জনবল, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি সরবরাহ এবং অন্যান্য দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় নিজেদের অর্থায়নে বহন করবে কনসোর্টিয়াম। এর বিনিময়ে প্রতি টিইইউ কনটেইনার পরিচালনার জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ৬৯ ডলার মাশুল চেয়েছে তারা।
কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রতি টিইইউ কনটেইনার থেকে বন্দরের গড় আয় ১৬১ দশমিক ৮২ ডলার। এর বিপরীতে ব্যয় ৫৬ দশমিক ১৫ ডলার এবং নিট আয় ১০৫ দশমিক ৬৭ ডলার। সে হিসাবে কনসোর্টিয়ামকে প্রতি টিইইউ কনটেইনার ৬৯ ডলার পরিশোধের পরও বন্দরের হাতে প্রায় ৯২ ডলার অবশিষ্ট থাকবে। তাদের দাবি, এ ৬৯ ডলারের বিনিময়ে জ্বালানি, লুব্রিক্যান্ট, বিদ্যুৎ, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ, নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন, জনবল ব্যবস্থাপনা এবং কনটেইনার পরিচালনার পুরো দায়িত্ব তারা বহন করবে। ফলে আগামী ১৫ বছরে এনসিটির পরিচালনা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বন্দর কর্তৃপক্ষকে কোনো ধরনের অপারেশনাল কিংবা মূলধনি ব্যয় বহন করতে হবে না।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। কনসোর্টিয়ামের অন্য দুই অংশীদার এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেড ও কসমস এন্টারপ্রাইজও দীর্ঘদিন ধরে বন্দরে কনটেইনার ও পণ্য হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে যুক্ত। তিন প্রতিষ্ঠানেরই কয়েক দশকের বন্দরসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই কনসোর্টিয়ামের অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে রাজনীতিরও সংযোগ রয়েছে। এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাত হোসেন সেলিম বর্তমানে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য। অন্যদিকে কসমস এন্টারপ্রাইজের চেয়ারম্যান এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ।
সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন বলেন, ‘জার্মান পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হামবুর্গ পোর্ট কনসাল্টিং (এইচপিসি) এনসিটির বার্ষিক পরিচালন সক্ষমতা ১১ লাখ টিইইউ নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বর্তমানে দেশীয় অপারেটররাই বছরে প্রায় ১৩ লাখ ৩০ হাজার টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করছে। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া স্থানীয় অপারেটরদের বাইরে রেখে সরাসরি কোনো বিদেশী প্রতিষ্ঠানের হাতে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার টার্মিনাল তুলে দেয়া সম্মানজনক হবে না। ২০০৬ সাল থেকে আমরা প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ টিইইউ কনটেইনার এবং ১৫ হাজার ১৫৬টি কনটেইনারবাহী জাহাজ পরিচালনা করেছি। আমাদের প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন সনদ রয়েছে। অংশীদারসহ আমাদের পূর্ণাঙ্গ টার্মিনাল অপারেশন ব্যবস্থাপনা কাঠামো ও প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতাও রয়েছে। ফলে আমাদের কনসোর্টিয়াম সুযোগ পেলে বছরে ১৭ লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ড তৈরি করতে পারব।’
অন্যদিকে কসমস এন্টারপ্রাইজ ১৯৮৯ সাল থেকে প্রায় দুই কোটি টন ব্রেকবাল্ক কার্গো ও ১ হাজার ৮৬৫টি জাহাজ পরিচালনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছে। এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসও ১৯৮৮ সাল থেকে বন্দরের বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত থাকার কথা জানিয়েছে।
এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘১৫ বছরের জন্য দায়িত্ব পেলে ডিজিটালাইজড ভেসেল অপারেশন, রিয়েল টাইম ট্র্যাকিং, টিওএস-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, অপটিমাইজড ক্রেন অ্যালোকেশন এবং দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে এনসিটির সক্ষমতা আরো বাড়ানোর বিষয়টি চিঠিতে তুলে ধরা হয়েছে। আমরা এমনভাবে প্রস্তাবটি দিয়েছি যাতে এনসিটির নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আহরণে ক্ষমতা পুরোপুরি বন্দরের কাছে থাকবে। আমাদের কনসোর্টিয়াম শুধু পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে এবং এ সেবার বিনিময়ে বন্দর থেকে কনটেইনারপ্রতি মাশুল নেব।’
এদিকে এনসিটির ইজারা পেতে এর আগে আলোচনায় এসেছে পিপিপি কাঠামোয় দেশীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপের প্রস্তাবটি। নিজেদের প্রস্তাবের পক্ষে বিস্তারিত তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ‘স্ট্রেংথ অব এমজিএইচ প্রপোজাল দ্যান ডিপি ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক ওই বিশ্লেষণে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের তুলনায় প্রতি টিইইউ কনটেইনারে ৫ ডলার বেশি রাজস্ব বন্দরকে দিতে পারবে তারা।
তারা প্রস্তাবে উল্লেখ করেছে, প্রতি টিইইউ কনটেইনার থেকে প্রকৃত রাজস্ব ১১৫ ডলারের কম হলে ডিপি ওয়ার্ল্ড বন্দরকে ৫২ ডলার দেয়ার প্রস্তাব করেছে। একই ক্ষেত্রে এমজিএইচের প্রস্তাব ৫৭ ডলার। আবার প্রকৃত রাজস্ব ১১৫-১২০ ডলারের মধ্যে হলে ডিপি ওয়ার্ল্ড দেবে ৫৫ দশমিক ৫ ডলার আর একই স্ল্যাবে এমজিএইচ ৬০ দশমিক ৫ ডলার দিতে রাজি। একইভাবে ১২০ থেকে ১৬০ ডলার পর্যন্ত প্রতিটি রাজস্ব স্তরেই ডিপি ওয়ার্ল্ডের তুলনায় ৫ ডলার বেশি ভাগাভাগির প্রস্তাব দিয়েছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানটি।
আগাম কনসেশন ফি হিসেবে ডিপি ওয়ার্ল্ড ২ কোটি ডলার দেয়ার প্রস্তাব করলেও এমজিএইচ ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার দেয়ার প্রস্তাব করেছে। এমজিএইচ গ্রুপের দাবি, তাদের ১৫ বছরের এ চুক্তি মডেলের মাধ্যমে বন্দর কর্তৃপক্ষ মোট প্রায় ১ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব পেতে পারে।
সার্বভৌম ও রাজনৈতিক ঝুঁকির প্রসঙ্গ তুলে এমজিএইচ উল্লেখ করেছে, ডিপি ওয়ার্ল্ড একটি বিদেশী রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অংশ হওয়ায় সেখানে ভূরাজনৈতিক প্রভাব ও মুনাফা প্রত্যাবাসনের বিষয় রয়েছে। বিপরীতে স্থানীয় কোম্পানি হওয়ায় তাদের মুনাফার একটি অংশ দেশেই পুনর্বিনিয়োগ হবে।
এমজিএইচ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এনসিটি পরিচালনায় অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি প্রস্তাব দিয়েছি আমরা। দেশীয় প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে সবচেয়ে বড় ও কৌশলগত এই টার্মিনাল হতে অর্জিত অর্থ দেশেই থাকবে।’
পোর্টলিংক আইসিডির ৪৩ একর অবকাঠামো ও মাসে ১২ হাজার টিইইউ হ্যান্ডলিং সক্ষমতাকে নিজেদের বাড়তি শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে প্রতিষ্ঠানটি। সাতটি শিপিং লাইনের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির কারণে প্রথম দিন থেকেই নিশ্চিত কার্গোপ্রবাহ পাওয়া যাবে বলেও দাবি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আরো দাবি করেছে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন-২০২২, পিপিপি নির্দেশিকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা বিধিমালার সঙ্গে তাদের প্রস্তাব পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। সূত্র বণিকবার্ত।
চট্টগ্রাম বন্দরের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে দরকষাকষি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার কাজ করছি। আন্তর্জাতিক অপারেটরের সঙ্গে সমঝোতা হলে তাদের অভিজ্ঞতা ও সম্ভাব্য বিনিয়োগ বন্দরের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। তবে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা না হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়টি সামনে আসবে।’


