প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
এ অভিযোগে শাকিল হাসান নামের এক পুলিশ কনস্টেবলকে বাহিনীর পক্ষ থেকে আইসোলেট করে রাখা হয়েছে। অভিযুক্তের সেলফোন ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে আরো কোনো পুলিশ সদস্য বা অন্য কেউ এ সশস্ত্র চরমপন্থী সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়েছেন কিনা তা খুঁজে দেখা হচ্ছে। জানা গেছে, বিশেষ করে দীর্ঘদিন যেসব কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের বিষয়েও খোঁজ নিচ্ছে পুলিশ। অভিযুক্ত কনস্টেবল সবশেষ পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (কল্যাণ ট্রাস্ট শাখা) আহমেদ মুইদের দেহরক্ষী হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। অভিযুক্ত শাকিল সে সময় দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার আশঙ্কার মধ্যেই পুলিশ সদস্যের টিটিপি সম্পৃক্ততার অভিযোগকে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির ইঙ্গিত বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত কনস্টেবল শাকিল হাসানের বাড়ি নেত্রকোনায়। তার বিরুদ্ধে টিটিপি সম্পৃক্ততার বিষয়টি একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তরের নজরে আসে। পরে কনস্টেবল শাকিল হাসানকে দুই দফা অভ্যন্তরীণ জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বরিশালে বদলি করে আইসোলেট করা হয়েছে। অভিযুক্তের ব্যক্তিগত ও ডিজিটাল যোগাযোগ, বিদেশী সংযোগ এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয়েও খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে শাকিল হাসানের কিছু অনলাইন যোগাযোগমাধ্যম এবং সীমান্তবর্তী নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে টিটিপির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার বিষয়টি বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া তার ব্যবহৃত সেলফোনে থাকা তথ্য বিশ্লেষণ করে বাহিনী কিংবা বাইরে আরো কেউ জড়িত কিনা তা শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানা গেছে। কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এর মাধ্যমে অভিযুক্তের কোনো ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা ছিল কিনা সেটাও জানা যাবে।
সবশেষ শাকিল হাসান দেহরক্ষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (কল্যাণ ট্রাস্ট) আহমেদ মুইদের দেহরক্ষী হিসেবে। এর আগে ২০১৪ ও ২০১৫ সালেও আহমেদ মুইদের দেহরক্ষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কনস্টেবল শাকিল। এরপর আহমেদ মুইদ মিশনে গেলে কনস্টেবল শাকিল এসবিতে বদলি হন। সে সময় এসবি প্রধান ছিলেন তৎকালীন অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম (জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার)। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আহমেদ মুইদ ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন দেহরক্ষী হিসেবে কনস্টেবল শাকিলকে দায়িত্ব দেয়ার জন্য আবেদন করেন আহমেদ মুইদ। সেই আবেদনের ভিত্তিতেই কনস্টেবল শাকিলকে পুনরায় তার দেহরক্ষী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর আহমেদ মুইদ পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে পুলিশ সদর দপ্তরে বসেন। সেখানেও তার সঙ্গে দেহরক্ষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কনস্টেবল শাকিল।
কনস্টেবল শাকিলের টিটিপি সম্পৃক্ততার অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে কথা হয় অতিরিক্ত ডিআইজি আহমেদ মুইদের সঙ্গে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কনস্টেবল শাকিল হাসান আমার সঙ্গে দীর্ঘদিন দেহরক্ষী হিসেবে আছেন। সে অত্যন্ত সৎ এবং বিশ্বস্ত একজন পুলিশ সদস্য। এজন্য আমি দেহরক্ষী হিসেবে তাকে সঙ্গে রেখেছি। তবে তার মধ্যে আমি কখনো টিটিপি বা কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার মতো ইঙ্গিত লক্ষ্য করি নাই। তার বিরুদ্ধে টিটিপি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আসার পর সিনিয়র স্যাররা তাকে বরিশালে বদলি করে আইসোলেট রাখতে বলেছেন।’
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনার গুরুত্ব কেবল অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর জন্যও একটি বড় সতর্ক সংকেত। পুলিশের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন দেশের কোনো উগ্রপন্থী সংগঠনের প্রভাব বা অনুপ্রবেশ দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই রাষ্ট্রকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে টিটিপি বা যেকোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টিটিপি নিজ দেশে বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা অগণতান্ত্রিক ঘটনা সৃষ্টি করার জন্য সমালোচিত। সেখানে আমার দেশের কোনো পুলিশ সদস্য বা নাগরিক তাদের সঙ্গে জড়িত থাকা মানে আমাদের জন্য ভয়ের, উৎকণ্ঠার বিষয়। এর মধ্য দিয়ে দেশে কোনো ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটার শঙ্কাকে আমরা উড়িয়ে দিতে পারি না। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার সম্পৃক্ততার ধরন এবং মাত্রা যাচাই-বাছাই করে দেখা প্রয়োজন।’
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘পুলিশ কনস্টেবল শাকিল হাসানের টিটিপি সম্পৃক্ততার বিষয়টি এখন পর্যন্ত আমার জানা নেই। বিস্তারিত জেনে পরবর্তী সময়ে জানাতে পারব।’
এদিকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সরকারি স্থাপনায় সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কায় গোয়েন্দা সতর্কতা জারি করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। জাতীয় সংসদসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদারে সংশ্লিষ্ট সব ইউনিটকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ২৩ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (গোপনীয়) কামরুল আহসানের স্বাক্ষরিত একটি দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে এ সতর্কতা জারি করা হয়। গোপনীয় এ চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ বজায় রাখছে এবং তারা সমন্বিত হামলার পরিকল্পনা করতে পারে।
সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে জাতীয় সংসদ ভবন, গুরুত্বপূর্ণ পুলিশ ও সামরিক স্থাপনা, উপাসনালয়, বিনোদন কেন্দ্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীটি হামলার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসন্ধান করছে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলায় নিরাপত্তা জোরদার, নজরদারি বৃদ্ধি এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ সতর্কতা বার্তার অনুলিপি সিআইডি, স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), সিটিটিসি এবং দেশের সব জেলার পুলিশ সুপারদের কাছে পাঠানো হয়েছে।


