প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারের জন্য তিনটি বেসরকারি সংস্থাকে ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে ১০০ কোটি টাকা দিতে চাপ দিয়েছিল মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। তবে ব্যাংক তহবিলের এমন ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত নিয়ম লঙ্ঘন করে তিনটি সংস্থাকে দেওয়া হয় প্রায় ৪ কোটি টাকা।
‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর প্রাপ্ত নথি ও ডজনখানেক কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই অর্থ পেয়েছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), স্টুডেন্টস অ্যাগেইনস্ট ডিসক্রিমিনেশন (স্যাড) ফাউন্ডেশন এবং ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি।
নথিপত্র অনুযায়ী, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) সুজনকে আড়াই কোটি কোটি টাকা এবং ডিবেট ফর ডেমোক্রেসিকে ২১ লাখ টাকা দিয়েছে। অন্যদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘স্যাড ফাউন্ডেশন’কে এক কোটি টাকা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত ১১ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এক সভায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারকের উপস্থিতি দেখে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বিস্মিত হন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, একটি “গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যু” আলোচনার জন্য সচিব উপস্থিত হয়েছেন।
সভার আলোচ্যসূচিতে না থাকলেও সেখানে গণভোটের প্রচারণায় ব্যাংকগুলোকে অর্থায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। এজন্য সিএসআর তহবিল থেকে দাবি করা হয় ১০০ কোটি টাকা। উপস্থিত ব্যাংক কর্মকর্তারা এর তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, ভোটের প্রচারণায় সিএসআর তহবিল ব্যবহার করা যায় না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে উঠলে গভর্নর পরবর্তী সময়ে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দিয়ে সভা শেষ করেন।
পরদিন গভর্নর আবারও এবিবি বোর্ড সদস্যদের তলব করেন। সেখানে এবিবি চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনসহ সাতজন কর্মকর্তার উপস্থিতিতে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিদের নিয়ে আরেকটি সভা হয়। সেখানে আবারও ১০০ কোটি টাকার দাবি তোলা হয়।
সভায় উপস্থিত একজন কর্মকর্তা বলেন, গভর্নর সরাসরি ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেন যে, সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ‘হ্যাঁ ভোট’-এর প্রচারণার জন্য তিনটি সংস্থাকে ১০০ কোটি টাকা দিতে হবে।
এ বিষয়ে মাসরুর আরেফিন বলেন, “গভর্নর আমাদের সরাসরি ১০০ কোটি টাকা দিতে বলেছিলেন। আমরা জানিয়েছিলাম, আমাদের এত টাকা দেওয়ার সক্ষমতা নেই।”
আলোচনা চলাকালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সিএসআর তহবিলের বিপুল ব্যয়ের প্রসঙ্গও ওঠে।
তবে উপস্থিত একজন কর্মকর্তার মতে, গভর্নর স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যেহেতু সরকার এটি চাইছে, তাই এটি করতেই হবে। অন্যথায় প্রধান উপদেষ্টার মুখোমুখি হওয়া কঠিন হবে।
মাসরুর আরেফিন আরও জানান, “আমরা রাজি না হওয়ায় গভর্নর প্রস্তাব কমিয়ে ৮০-৯০ কোটি এবং শেষ পর্যন্ত অন্তত ২০ কোটি টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেন। আমরা লিখিত নির্দেশনা চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংক তা দিতে অস্বীকার করে।”
এবিবি চেয়ারম্যান আরও বলেন, “আমরা সুজনকে আড়াই কোটি এবং ডিবেট ফর ডেমোক্রেসিকে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা দিতে রাজি হই। কিন্তু স্যাড ফাউন্ডেশন নিবন্ধিত না হওয়ায় তাদের অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানাই।”
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই আপত্তির পরদিনই ‘স্যাড ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা হয় এবং ২১ জানুয়ারি এটি নিবন্ধন পায়। ওই দিনই সংস্থাটি সিএসআর তহবিল থেকে ১২ কোটি ৮০ লাখ টাকা চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করে। প্রচলিত নিয়ম এড়িয়ে ২৫ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ড সভায় তাদের ৯ কোটি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব তোলা হয়। কয়েকজন পরিচালকের আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত গভর্নর এক কোটি টাকা অনুমোদনের ব্যবস্থা করেন।
মাসরুর আরেফিন বলেন, “গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকের কয়েক দিনের মধ্যেই প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ‘হ্যাঁ ভোট’ প্রচারণায় সহায়তা করার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর ওই দুটি সংস্থার কাছ থেকে বিস্তারিত বাজেট পাওয়ার পর আমরা এবিবি’র পক্ষ থেকে চেক ইস্যু করি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার নির্দেশনা ও পরামর্শ আমাদের মেনে চলতে হয়েছে।”
গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এ বিষয়ে বলেন, “সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ‘হ্যাঁ ভোট’-এর প্রচারণার জন্য এই অর্থ দেওয়া হয়েছে। যেহেতু টাকাটি জনকল্যাণে ব্যয় হয়েছে, তাই আমি এতে নেতিবাচক কিছু দেখছি না।”
সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার জানান, গভর্নরের আমন্ত্রণে তিনি ওই সভায় যোগ দিয়েছিলেন। অডিট রিপোর্ট জমা না দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা ইতিমধ্যে এবিবি’কে প্রাথমিক ব্যয়ের বিবরণী দিয়েছি। অডিট চলছে, আশা করি এক সপ্তাহের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দিতে পারব।”
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ ভোট’-এর প্রচারণায় ছয়টি মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন মিলে মোট ১৪২ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৪৬ কোটি, তথ্য মন্ত্রণালয় চার কোটি ৭১ লাখ, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৭ কোটি, এলজিইডি ৭২ কোটি, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় চার কোটি ৫২ লাখ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় চার কোটি ৩৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ শাখা ৪ কোটি টাকা ব্যয় করেছে।


