সোমবার, মে ১১, ২০২৬
spot_img
Homeসংবাদভূমিকম্পের ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও কুমিল্লা অঞ্চল

ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও কুমিল্লা অঞ্চল

প্রাইম ভিশন ডেস্ক »

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও কুমিল্লাসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশি-বিদেশি একদল গবেষকের গবেষণায় এমন তথ্য উঠে আসে।

নেদারল্যান্ডভিত্তিক গবেষণা প্রকাশনা সংস্থা এলসিভিয়ার এর জিওসিস্টেম অ্যান্ড জিওএনভায়রনমেন্ট জার্নালে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রাম উপকূলীয় ফল্টে (মাটির ফাটল বা চ্যুতি) দীর্ঘদিন ধরে ভূ-তাত্ত্বিক চাপ জমা হচ্ছে এবং এটি ভবিষ্যতে শক্তিশালী ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে।

একইসঙ্গে বাংলাদেশের এই অঞ্চল ছাড়াও ভারতের আগরতলা এবং মিয়ানমারের উপকূলীয় আরাকান শহরও এ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

গবেষক দল ভূ-তাত্ত্বিক গঠন, নদীর প্রবাহ, পাহাড়ি ঢাল এবং ভূ-পৃষ্ঠের ফাটল বিশ্লেষণের মাধ্যমে টেকটোনিক সক্রিয়তার মাত্রা নির্ধারণ করেন।

এতে দেখা যায়, ইন্দো-বার্মা রেঞ্জ এর চট্টগ্রাম-ত্রিপুরা ভাঁজ অঞ্চলে ভারতীয় প্লেট ও বার্মা প্লেটের পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এই চাপের ফলে প্রতি বছর প্রায় ৫ মিলিমিটার করে ভূ-পৃষ্ঠে সংকোচন ঘটছে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিপুল শক্তি জমা হচ্ছে।

প্রায় ২ বছর ধরে চলা এ গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রাম-ত্রিপুরা ভাঁজ অঞ্চলের পশ্চিমাংশে অবস্থিত ‘চিটাগং কোস্টাল ফল্ট’ (বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত একটি ভূতাত্ত্বিক ফাটল রেখা) পূর্বাংশের কালাদান ফল্ট (এটি একটি প্রধান ভূতাত্ত্বিক চ্যুতি বা ফাটল রেখা যা উত্তর-পূর্ব ভারত, বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের আরাকান উপকূল বরাবর বিস্তৃত) এর তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয়। এর ফলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহর ছাড়াও ভারতের আগরতলা এবং মিয়ানমারের উপকূল অঞ্চল বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। এই বিশাল অঞ্চলে কয়েক কোটি মানুষের বসবাস, যারা সরাসরি ভূ-তাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে রয়েছে।

গবেষকরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘সিসমোজেনিক গ্যাপ’ চিহ্নিত করেছেন চট্টগ্রাম উপকূলীয় ফল্টের উত্তরাংশে। অর্থাৎ দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলে। ১৭৬২ সালে এই ফল্টের দক্ষিণাংশে ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামি ঘটলেও উত্তরাংশে দীর্ঘদিন বড় কোনো ভূমিকম্প হয়নি। ফলে ওই এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে ভূগর্ভে বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত হয়ে আছে।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, গত প্রায় ২০ লাখ বছরে এই অঞ্চলে প্রায় ১১ কিলোমিটার ভূমি সংকুচিত হয়েছে, যা টেকটোনিক সক্রিয়তার শক্তিশালী প্রমাণ। গবেষকরা ওই এলাকার টেকটোনিক সক্রিয়তা পরিমাপের জন্য ‘ইনডেক্স অফ অ্যাক্টিভ টেকটোনিক্স (আইএটি)’ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। পাশাপাশি উচ্চ-রেজোলিউশনের স্যাটেলাইট ডেটা ও আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে গবেষণা পরিচালনা করেন। যার মাধ্যমে মাটির নিচের সূক্ষ্ম ফাটল ও গঠনগুলো বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে।

এতে দেখা গেছে, বান্দরবান ও পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি অঞ্চলের কিছু অংশ অত্যন্ত সক্রিয়। যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন গবেষকরা। আবার কিছু অংশ মাঝারি ও তুলনামূলক কম সক্রিয়। এই সক্রিয়তা শুধু পাহাড়েই সীমাবদ্ধ নয়; নদীর গতিপথ, ঢাল এবং ভূ-পৃষ্ঠের গঠনেও এর প্রভাব স্পষ্ট। বিভিন্ন স্থানে নদীর বাঁক, প্রবাহের পরিবর্তন এবং ভূমির স্থানচ্যুতি টেকটোনিক চাপের প্রতিফলন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, চট্টগ্রাম-ত্রিপুরা ভাঁজ অঞ্চলটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত এলাকার মধ্যে পড়ে এবং এখানে সক্রিয় গ্যাস নিঃসরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে এই অঞ্চলে গ্যাস ও জ্বালানি সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

গবেষণা দলের প্রধান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপক ড. সাখাওয়াত হোসাইন  জানান, গবেষণায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই এই অঞ্চলে দ্রুত নগরায়ন, ঘনবসতি এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন ভবিষ্যতের ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। চট্টগ্রামসহ আশপাশের অঞ্চলে ভূমিকম্প সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, ঝুঁকিভিত্তিক নগর পরিকল্পনা, বিস্তারিত ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ এবং জনগণের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পে জানমালের অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

গবেষক দলের আরেক সদস্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপক ড. শরীফ হোসাইন খান জানান, এই গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে মাটির নিচে আসলে কী ঘটছে তা বৈজ্ঞানিকভাবে দেখা। আমরা অনুসন্ধানে পেয়েছি, এই অঞ্চলটি ভূ-তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত অস্থির এবং সক্রিয়। ভারতীয় প্লেটের নড়াচড়ার কারণে প্রতি বছর আমাদের এই এলাকার ভূমি সংকুচিত হচ্ছে, যার ফলে মাটির গভীরে ক্রমাগত প্রচণ্ড চাপ বা শক্তি জমা হচ্ছে।

এ গবেষকের মতে, এই পরিস্থিতি চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং কুমিল্লার মতো জনবহুল শহরগুলোর জন্য বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি তৈরি করছে। এই বিপদটি বাস্তব এবং একে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। তাই ভবিষ্যতের বড় বিপর্যয় এড়াতে এবং কোটি কোটি মানুষের জানমাল রক্ষা করতে আমাদের এখন থেকেই পরিকল্পিত নগরায়ন ও দীর্ঘমেয়াদী সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়