প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
ভারতের গঙ্গাইকোন্ডা চোলাপুরম ছিল শক্তিশালী চোল রাজবংশের রাজধানী। এই রাজবংশ শাসন করেছিল দশম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে দক্ষিণ ভারত ও শ্রীলঙ্কার বড় একটি অংশ। প্রতিদ্বন্দ্বী পাল রাজবংশের বিরুদ্ধে বিজয় লাভের পর চোল শাসক প্রথম রাজেন্দ্রের নির্দেশে নির্মিত হয়েছিল এ শহর। প্রাচীন শহরটি সুউচ্চ রাজপ্রাসাদ ও বিভিন্ন মন্দির কমপ্লেক্সের জন্য বিখ্যাত। চোল শাসকেরা সুপরিচিত ছিলেন শিল্পকর্ম তৈরির জন্য। ইউরোপে ‘লাইডেন প্লেটস’ নামে পরিচিত এই তাম্রলিপিগুলো চোল সাম্রাজ্যের টিকে থাকা সবচেয়ে ঐতিহাসিক ও মূল্যবান দলিলগুলোর অন্যতম। ২০১২ সাল থেকেই এগুলো ফেরত চেয়ে আসছিল ভারত। অবশেষে নেদারল্যান্ডস থেকে সেগুলো ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে ভারত।
গতকাল শনিবার ঐতিহাসিক এই সাংস্কৃতিক পুনরুদ্ধার উদ্যোগের অংশ হিসেবে চোল যুগের বিরল তাম্রলিপি ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে নেদারল্যান্ডস। এই হস্তান্তর সম্পন্ন হয় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেদারল্যান্ডস সফরের সময়।
বহু বছরের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর এই তাম্রলিপিগুলো ফেরত পেল ভারত। এ ঘটনাকে দেখা হচ্ছে দুই দেশের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের প্রতীক হিসেবেও।
সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর শেষে গত শুক্রবার নেদারল্যান্ডসে পৌঁছান মোদি। তার চলমান পাঁচ দেশ সফরের বাকি গন্তব্য সুইডেন, নরওয়ে ও ইতালি।
সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তাম্রলিপিগুলো ফেরত পাওয়ার খবর জানান নরেন্দ্র মোদি।
তিনি লেখেন, ‘প্রত্যেক ভারতীয়ের জন্য এটি এক আনন্দের মুহূর্ত। একাদশ শতকের চোল তাম্রলিপি নেদারল্যান্ডস থেকে ফিরছে ভারতে। প্রধানমন্ত্রী রব জেটেনর উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছি।’
ইতিহাসবিদদের মতে, তাম্রলিপিলো চোল সম্রাট রাজরাজা চোলের শাসনামলের। ৯৮৫ থেকে ১০১৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন তিনি। ভারতের বাইরে সংরক্ষিত তামিল ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে এগুলোকে দেখা হয়।
সংগ্রহটিতে মোট ২১টি তাম্রফলক রয়েছে। যার ওজন প্রায় ৩০ কেজি। ব্রোঞ্জের একটি বৃত্তাকার রিংয়ের মাধ্যমে এগুলো একত্রে বাঁধা। যাতে খোদাই করা আছে চোল রাজবংশের রাজমোহর। ফলকগুলোর একাংশ সংস্কৃত ভাষায় এবং অন্য অংশ তামিল ভাষায় লেখা।
এতে বিবরণ রয়েছে নাগাপট্টিনমের একটি বৌদ্ধ বিহারের জন্য দেওয়া অনুদানের। গবেষকদের মতে, এই শিলালিপি দক্ষিণ ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যকার সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং তৎকালীন ধর্মীয় সহাবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ বহন করে।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, প্রথম মৌখিকভাবে এই নির্দেশ দিয়েছিলেন রাজরাজা চোল। পরে তা লিপিবদ্ধ করা হয় তালপাতায়। প্রথম স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য সেই তথ্য তাম্রলিপিকে খোদাই করান তার ছেলে রাজেন্দ্র চোল। বাঁধাইয়ের রিংয়ে রয়েছে রাজেন্দ্র চোলের রাজচিহ্নও।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে নাগাপট্টিনম ডাচ শাসনের অধীনে থাকাকালে খ্রিস্টান মিশনের সঙ্গে যুক্ত ফ্লোরেন্তিয়ুস ক্যাম্পার নামের এক ব্যক্তি এই তাম্রলিপিগুলো নিয়ে যান নেদারল্যান্ডসে।
দীর্ঘদিন ধরে এগুলো নেদারল্যান্ডসের নিরাপদ সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত ছিল এবং গবেষকদের অনুরোধে দেখার সুযোগ দেওয়া হতো। পরে এগুলো বিশেষ পরিচিতি পায় ইতিহাসবিদ ও তামিল লিপি বিশেষজ্ঞদের কাছে। চোল সাম্রাজ্যভিত্তিক জনপ্রিয় তামিল ঐতিহাসিক উপন্যাস পন্নিইন সেলভানে উল্লেখ থাকার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এর পরিচিতি বাড়ে।
ভারতের দাবি, ২৪তম আন্তঃসরকারি প্রত্যাবর্তন ও পুনরুদ্ধার কমিটির অধিবেশনে সমর্থন পায়। সেখানে এই নিদর্শনের বৈধ উৎসদেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় ভারতকে। দুই দেশের মধ্যে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
শেষ পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদির সফরের সময় আনুষ্ঠানিকভাবে তাম্রলিপিগুলো ভারতের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় নেদারল্যান্ডস সরকার।
সূত্র: এনডিটিভি


