মঙ্গলবার, মে ১৯, ২০২৬
spot_img
Homeমুল পাতাযুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তি: গতি পাচ্ছে আলোচনা

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তি: গতি পাচ্ছে আলোচনা

প্রাইম ভিশন ডেস্ক »

বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার হতে যাচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা দুটি মৌলিক সামরিক চুক্তি চূড়ান্ত করতে রাজনৈতিক স্তরে নীতিগত সম্মতি মিলেছে। চুক্তি দুটি হলো— ‘জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন এগ্রিমেন্ট’ (জিএসওএমআইএ) এবং ‘অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং এগ্রিমেন্ট’ (এসিএসএ)।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বড় বড় পরাশক্তিগুলোর মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার দীর্ঘদিনের নীতি ঠিক রেখেই বাংলাদেশ তার প্রতিরক্ষা উৎসে বৈচিত্র্য আনতে চাইছে। ফলে প্রায় এক দশক ধরে ঝুলে থাকা এই আলোচনা এখন নতুন গতি পেয়েছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, চুক্তি দুটি কোনো সামরিক জোট নয়, বরং এগুলো মূলত প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক প্রকৃতির। তবে আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর বিশেষ গুরুত্ব থাকায় প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো এই আলোচনার দিকে কড়া নজর রাখছে।

চুক্তি দুটির মধ্যে জিএসওএমআইএ একটি আইনি বাধ্যবাধকতাপূর্ণ চুক্তি, যার মাধ্যমে দুই দেশ নিজেদের মধ্যে অত্যন্ত গোপন সামরিক তথ্য সুরক্ষিতভাবে আদান-প্রদান করতে পারবে। আমেরিকার উন্নত সামরিক প্রযুক্তি এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাওয়ার ক্ষেত্রে এই চুক্তিটিকে একটি অন্যতম পূর্বশর্ত মনে করা হয়।

আর এসিএসএ চুক্তির লক্ষ্য হলো যৌথ মহড়া, মানবিক দুর্যোগ মোকাবিলা, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সময় দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে লজিস্টিক বা রসদ সরবরাহ এবং পারস্পরিক সেবা সহজ করা।

সহজ কথায়, এই ব্যবস্থার অধীনে দুই দেশ একে অপরের সামরিক সম্পদকে নির্দিষ্ট সুবিধাদি দিতে পারবে। যেমন— বাংলাদেশের নৌবাহিনীর নন-কমব্যাট বা যুদ্ধের জন্য নয় এমন জাহাজ মার্কিন কোনো ঘাঁটিতে রসদ বা লজিস্টিক সহায়তা পাবে। একইভাবে, চট্টগ্রামের মতো বাংলাদেশের বন্দরে আসা মার্কিন জাহাজও নির্দিষ্ট কিছু সেবা পাবে। এই সেবার মধ্যে রয়েছে খাদ্য, জ্বালানি, পরিবহন, চিকিৎসা, যোগাযোগ, মেরামত-রক্ষণাবেক্ষণ, বিমান ও সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুবিধা এবং সাময়িকভাবে প্রাণঘাতী নয় এমন সামরিক সরঞ্জামের ব্যবহার।

অতীতে কেন আটকে ছিল?

এর আগেও ঢাকা ও ওয়াশিংটন এই চুক্তির খসড়া নিয়ে একমত হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর একটি বড় অংশের আপত্তির কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি।

বাংলাদেশের একটি নিরাপত্তা সংস্থার একজন সাবেক প্রধান নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে দুই দেশ চুক্তি সইয়ের ব্যাপারে অনানুষ্ঠানিক সম্মতি দিলেও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো দেশের সুরক্ষার প্রশ্নে বড় ধরনের ঝুঁকি দেখেছিল। বিশেষ করে ‘এসিএসএ’র কিছু ধারা নিয়ে আপত্তি ছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, মার্কিন সামরিক বাহিনী কোনো প্রয়োজনে সাময়িক অবকাঠামো তৈরি করলে তা পরে স্থায়ী রূপ নিতে পারে। ফলে বাংলাদেশে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির একটি সুযোগ তৈরি হতে পারত।

তিনি আরও জানান, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা ছিল, ওয়াশিংটন মূলত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে চায়। আর এই কারণেই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংস্থাগুলো এর তীব্র বিরোধিতা করেছিল।

অবশ্য এ বিষয়ে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, এই দুটি চুক্তি নিয়ে চলমান কোনো আলোচনার তথ্য তাদের জানা নেই। তবে ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনসহ বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের চুক্তি রয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, একক কোনো দেশের ওপর অতি-নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা আধুনিক করার লক্ষ্যেই ঢাকা এই আলোচনার টেবিলে বসেছে।

প্রতিরক্ষা বৈচিত্র্যকরণ ও কৌশলগত লাভ

বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে সাবমেরিন, যুদ্ধবিমান ও নৌ-জাহাজের মতো ভারী সামরিক সরঞ্জামের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা এই নির্ভরতা কমাতে তুরস্কের সাথে ড্রোন এবং কামান তৈরির প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি পশ্চিমা ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথেও যোগাযোগ রক্ষা করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ওয়াশিংটনের সাথে এই চুক্তি হলে বাংলাদেশ উন্নত প্রযুক্তির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও বাড়তি সুবিধা পাবে। একই সাথে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন সমর্থন এবং বাণিজ্য ক্ষেত্রে বড় অর্থনৈতিক সুবিধাও মিলতে পারে।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একটি অভিনন্দন পত্র পাঠান। এরপরই এই আলোচনা দ্রুত গতি পায়। ট্রাম্প তার চিঠিতে একটি “মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক” গড়ে তোলা, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়ানো এবং দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো চূড়ান্ত করার ওপর জোর দেন।

কূটনৈতিক মহল মনে করছে, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থান এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে থাকার কারণে বাংলাদেশের প্রতি ওয়াশিংটনের ভূ-রাজনৈতিক আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।

আঞ্চলিক সংবেদনশীলতা ও ভারসাম্যের রাজনীতি

এই চুক্তির যেমন সুবিধা রয়েছে, তেমনি এর সাথে জড়িয়ে আছে তীব্র আঞ্চলিক সংবেদনশীলতা। বিশেষ করে চীন, ভারত ও জাপান বাংলাদেশের এই পদক্ষেপের দিকে গভীরভাবে নজর রাখছে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি লন্ডনের ইউস্টন এলাকার একটি হোটেলে বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক কিছু অংশীদারের একটি প্রতিনিধি দল এই চুক্তিগুলোর বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা ও তথ্য বিনিময় করেছে।

এ বিষয়ে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক বলেন, “এটি একই সাথে ঝুঁকি এড়ানো এবং ভারসাম্য বজায় রাখার একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া।” তিনি সতর্ক করে বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার সময় ভারত, রাশিয়া বা জাপানের মতো বন্ধুদের ভুলে গেলে চলবে না। ভবিষ্যৎ চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক মাথায় রেখেই এই ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।

এই পুরো প্রক্রিয়াকে “পাতলা বরফের ওপর দিয়ে হাঁটার” সাথে তুলনা করে তিনি বলেন, এর সফলতা নির্ভর করবে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আলোচনাকারীদের দক্ষতার ওপর। অতীতেও এই খসড়াগুলো তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনুমোদন দেয়নি। তাছাড়া আমেরিকার মূল লক্ষ্যই হলো এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমানো। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক শুল্ক চুক্তি এবং এই সামরিক আলোচনা বেইজিংয়ের মনে সংশয় তৈরি করতে পারে।

শহীদুল হক মনে করেন, বাংলাদেশকে অবশ্যই চীনকে আশ্বস্ত করতে হবে যে ওয়াশিংটনের সাথে এই সম্পর্ক বেইজিংয়ের কোনো ক্ষতি করবে না। যেমনটি করা হয়েছিল ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করার মাধ্যমে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) বায়েজিদ সারওয়ার অবশ্য আশাবাদী। তিনি বলেন, এই চুক্তিগুলো হলে বাংলাদেশের প্রতিরোধ ও গোয়েন্দা নজরদারির ক্ষমতা বাড়বে। তবে নিজের দেশের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে ঢাকাকে মার্কিনীদের সাথে অত্যন্ত শক্তভাবে দরকষাকষি করতে হবে।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়