চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন নগরীর পরিবেশ সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা নিরসন ও কর্ণফুলী নদীর দূষণ রোধে ২৫টি ওয়ার্ডে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে বিনামূল্যে গৃহস্থালি বর্জ্য সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই কার্যক্রমের জন্য নগরবাসীর কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হবে না। দীর্ঘমেয়াদে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব চট্টগ্রাম গড়ে তুলতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার নগর ভবনে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সার্বিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য গঠিত কমিটির ১০ম সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ ঘোষণা দেন।
মেয়র বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরীতে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য সংগ্রহের বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে অনেকেই যত্রতত্র ময়লা ফেলছেন, যা নালা-নর্দমা ভরাট, জলাবদ্ধতা সৃষ্টি এবং কর্ণফুলী নদীর দূষণের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“বিনামূল্যে বর্জ্য সংগ্রহে বছরে হয়তো ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা ব্যয় হবে, কিন্তু এর সুফল দীর্ঘমেয়াদে নগরবাসী ভোগ করবে। অতিরিক্ত ৪০০ থেকে ৫০০ মেট্রিক টন বর্জ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাস উৎপাদনের প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে।”
সবুজ জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করে মেয়র বলেন, চট্টগ্রামে ইউটিলিটি-স্কেল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি জমি বরাদ্দ চেয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে। তিনি জানান, কর্ণফুলী নদরীর ওপারে সম্ভাব্য একটি জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। জমি বরাদ্দ পাওয়া গেলে আধুনিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।
সভায় বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ ফজলে রাব্বী নগরীর ডেঙ্গু পরিস্থিতি তুলে ধরলে মেয়র বলেন, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে জুলাই মাসে বৃষ্টির কারণে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। তিনি বলেন, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাস ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এডিস মশার প্রজনন রোধে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মেয়র জানান, বর্তমানে কোতোয়ালী, বায়েজিদ, বন্দর, পাহাড়তলী, হালিশহর, বাকলিয়া ও আকবরশাহ এলাকাকে ডেঙ্গুর রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় সকালে লার্ভিসাইড এবং বিকেলে অ্যাডাল্টিসাইড স্প্রে করা হচ্ছে। এ কার্যক্রম আরও জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আরও ১৪টি বিশেষায়িত ফগার মেশিন সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) স্বীকৃত আধুনিক মশকনাশক ব্যবহার করছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, যা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। একই সঙ্গে নগরবাসীকে বাসার ছাদ, টব, বারান্দা, এসির ট্রে, ডাবের খোসা ও অন্যান্য পাত্রে জমে থাকা পরিষ্কার পানি অপসারণে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নগরীর সেবার মান আরও বাড়াতে প্রকৌশল ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের আওতায় বিদ্যমান ৬টি জোনকে ৮টি জোনে উন্নীত করার প্রস্তাব সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করেন চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন। তিনি বলেন, ওয়ার্ডভিত্তিক দায়িত্বের পরিধি কমিয়ে আনলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা আরও কার্যকরভাবে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে পারবেন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
ডিজিটাল নাগরিক সেবা প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, চসিকের নাগরিক অভিযোগ ব্যবস্থাপনা অ্যাপে ইতোমধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮৬৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যার ১২৩৮ টি সমাধান করা হয়েছে। তিনি বলেন, নাগরিকরা ছবি তুলে সরাসরি অভিযোগ পাঠাতে পারছেন এবং প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে তা মনিটরিং করছে। এর মাধ্যমে জবাবদিহিতা ও সেবার মান আরও বৃদ্ধি পাবে।
নগরীর যানজট নিরসনে পরিবেশবান্ধব ই-রিকশা চালুর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন মেয়র। তিনি বলেন, নিবন্ধিত প্যাডেলচালিত রিকশার মালিকদের মাধ্যমে ধাপে ধাপে বৈধ ও পরিবেশবান্ধব ই-রিকশা চালু করা হবে। এতে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা কমবে, চালকদের কর্মসংস্থান বজায় থাকবে এবং নগরীর যানজটও অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
সভায় নগরীর ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখতে ভ্রাম্যমাণ দোকান উচ্ছেদ অভিযানে পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী অবৈধ দখল ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারা জানান, উচ্ছেদের পর দ্রুত পুনরায় দখল হয়ে যাওয়ায় স্থায়ী সমাধানের জন্য নিয়মিত পুলিশি সহায়তা প্রয়োজন।
এদিকে চসিকের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ড. কিসিঞ্জার চাকমা জানান, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের শিক্ষা কার্যক্রম শতবর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে শতবর্ষ স্মারক প্রকাশনা, শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক আয়োজন বাস্তবায়ন করা হবে।
সভায় বিভিন্ন সেবা সংস্থার কর্মকর্তাবৃন্দ, চসিকের বিভাগীয় প্রধানবৃন্দ ও আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
ছবির ক্যাপশন: চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সার্বিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য গঠিত কমিটির ১০ম সভায় সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
নগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থা নিরাপদ করতে ৩৮ ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ হচ্ছে: চসিক মেয়র
নগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও নিরাপদ, শৃঙ্খলিত ও জনবান্ধব করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) উদ্যোগে নগরজুড়ে ৩৮টি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও ৭–৮টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নতুন ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সোমবার (৩ আগস্ট) নগরীর ৪০ নম্বর উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ডের কাঠগড় মোড়ে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণকাজের উদ্বোধনকালে মেয়র এসব কথা বলেন। মেয়র জানান, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ‘বিমানবন্দর সড়ক সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পিতভাবে এসব ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৯টি ফুটওভার ব্রিজের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে, ২১টির নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এসব ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের মাধ্যমে ব্যস্ত সড়কে পথচারীদের নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। যেসব ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে, সেগুলো সংস্কারের উদ্যোগও নেয়া হবে।
কাঠগড় মোড়ে নির্মাণাধীন ফুটওভার ব্রিজটি ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। ব্রিজটির দৈর্ঘ্য ৩৫ মিটার, যা প্রায় ১১৫ ফুট এবং প্রস্থ ৩ মিটার। এতে দুই পাশে একটি করে মোট দুটি সিঁড়ি থাকবে।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, এ এলাকায় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থাকায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ চলাচল করেন। বিশেষ করে দূরপাল্লার যাত্রী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সড়ক পারাপারে ফুটওভার ব্রিজটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একইসঙ্গে এটি সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর পাশাপাশি যানজট নিরসন ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সহায়ক হবে।
তিনি বলেন, নগরীর উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়; বরং নাগরিকদের জীবন ও চলাচলকে নিরাপদ করা। পরিকল্পিত ফুটওভার ব্রিজ ও উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে পথচারী ও যানবাহন—উভয়ের জন্যই একটি নিরাপদ নগর গড়ে তোলাই চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম, সহকারী প্রকৌশলী মোহাইমিনুল ইসলাম মাহিসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, চসিকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও স্থানীয় এলাকাবাসী উপস্থিত ছিলেন।


