Homeমুল পাতামানুষকে ধনী হওয়ার পরামর্শ দেওয়া ‘রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড’ বইয়ের লেখক নিজেই...

মানুষকে ধনী হওয়ার পরামর্শ দেওয়া ‘রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড’ বইয়ের লেখক নিজেই ১২০ কোটি ডলার ঋণে

প্রাইম ভিশন ডেস্ক

‘রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড’ বইয়ের লেখক রবার্ট কিয়োসাকি ১২০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণের কথা জানিয়েছেন। অর্থ নিয়ে পরামর্শ দিয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই লেখকের বিপুল ঋণের খবর সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় ঋণের পরও কীভাবে তিনি নিজেকে সফল বিনিয়োগকারী হিসেবে উপস্থাপন করছেন।

তবে বিষয়টি যতটা সরলভাবে শোনা যাচ্ছে, বাস্তবতা ততটা নয়। কিয়োসাকি নিজে এবং তার সাবেক স্ত্রী ও ব্যবসায়িক অংশীদার কিম কিয়োসাকির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ১২০ কোটি ডলারের পুরো অর্থ কিয়োসাকির ব্যক্তিগত ঋণ নয়। এর বড় অংশ বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে করা আবাসন বিনিয়োগের ঋণ। অর্থাৎ ঋণের বিপরীতে রয়েছে সম্পদ ও আয় তৈরি করা সম্পত্তি।

সম্প্রতি মার্কিন সাময়িকী ভ্যানিটি ফেয়ারে প্রকাশিত ক্রিস্টোফার কক্সের দীর্ঘ প্রতিবেদনে কিয়োসাকির অর্থনৈতিক দর্শন, ব্যক্তিজীবন এবং ‘রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড’ বইয়ের পেছনের গল্প উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের জন্য অ্যারিজোনায় কিয়োসাকির সঙ্গে দেখা করেন কক্স। সেখানে ৭৯ বছর বয়সী এই লেখক তার বিপুল ঋণ, বিনিয়োগ এবং জীবনের নানা অধ্যায় নিয়ে কথা বলেন।

১৯৯৭ সালে প্রকাশিত ‘রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড’ কিয়োসাকিকে ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত লেখকে পরিণত করে। বইটি ৪ কোটি ৪০ লাখের বেশি কপি বিক্রি হয়েছে বলে ভ্যানিটি ফেয়ার ও প্রকাশনা-সংক্রান্ত সূত্রগুলো জানিয়েছে। বইটি বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং ব্যক্তিগত অর্থ ও বিনিয়োগ নিয়ে সাধারণ মানুষের ধারণায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।

বইটির মূল ধারণা ছিল, শুধু চাকরি করে বেতন পাওয়ার ওপর নির্ভর না করে সম্পদ তৈরি করা এবং আয় সৃষ্টি করতে পারে এমন সম্পদে বিনিয়োগ করা। কিয়োসাকি বিশেষ করে আবাসন, ব্যবসা ও অন্যান্য সম্পদ কেনার ক্ষেত্রে ঋণকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি ঋণকে ভালো ও খারাপ, এই দুই ভাগে দেখেন। তার মতে, যে ঋণ আয় তৈরি করা সম্পদ কেনার কাজে ব্যবহৃত হয়, সেটি সম্পদ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।

এই দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই কিয়োসাকি নিজের বিনিয়োগে বড় অঙ্কের ঋণ ব্যবহার করেছেন। ভ্যানিটি ফেয়ারের প্রতিবেদনে তার সাবেক স্ত্রী কিম জানান, তাদের অংশীদারদের সঙ্গে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি আবাসন ইউনিট রয়েছে। এসব সম্পত্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঋণ মিলিয়েই ১২০ কোটি ডলারের অঙ্কটি দাঁড়িয়েছে। কিমের ভাষ্য অনুযায়ী, এর বড় অংশ কিয়োসাকির ব্যক্তিগত দায় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

কিয়োসাকি নিজেও দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, বিপুল ঋণ থাকা তার কাছে অস্বাভাবিক কিছু নয়। ২০২৪ সালেও তিনি প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন যে তার ঋণের পরিমাণ ১০০ কোটি ডলারের বেশি। সে সময় তিনি বলেছিলেন, তিনি নগদ অর্থ জমিয়ে রাখার বদলে ঋণ ব্যবহার করে সম্পদ কেনার কৌশলে বিশ্বাস করেন।

তার যুক্তি হলো, কোনো সম্পত্তির মূল্য বাড়লে সেই সম্পত্তির বিপরীতে আরও ঋণ নেওয়া যায়। সেই অর্থ আবার নতুন সম্পদ কেনার কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। তার ভাষায়, ধনীরা ঋণকে সম্পদ তৈরির জন্য ব্যবহার করেন। তবে এই কৌশল একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে, কারণ সম্পত্তির মূল্য কমে গেলে বা আয় কমে গেলে ঋণের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে যেতে পারে।

কিয়োসাকির নিজের দাবি অনুযায়ী, তার মাসিক আয় একসময় প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত ছিল। ভ্যানিটি ফেয়ারের প্রতিবেদনে অবশ্য তিনি বার্ষিক আয় প্রায় ৩০ লাখ ডলার বলে উল্লেখ করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার ব্যক্তিগত ঋণের অংশ মোট ১২০ কোটি ডলারের তুলনায় অনেক কম হতে পারে। কিমের হিসাব অনুযায়ী, তা আনুমানিক ৩ কোটি থেকে ৬ কোটি ডলারের মধ্যে হতে পারে।

তবে কিয়োসাকির আর্থিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাস সবসময় মসৃণ ছিল না। ২০১২ সালে ‘রিচ ড্যাড’ নামের সেমিনারভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রিচ গ্লোবাল এলএলসি দেউলিয়া সুরক্ষার জন্য আবেদন করেছিল। এর আগে এক ব্যবসায়িক অংশীদারের সঙ্গে বিরোধে আদালত ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। তার আর্থিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা ও মামলা হয়েছে।

 

তারপরও ‘রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড’ বইয়ের জনপ্রিয়তা কমেনি। প্রথম দিকে বইটি নিজ উদ্যোগে প্রকাশ করা হয়েছিল। পরে এটি বেস্টসেলার তালিকায় জায়গা করে নেয় এবং ‘দ্য অপরাহ উইনফ্রে শো’তে কিয়োসাকির উপস্থিতির পর বইটির বিক্রি আরও বেড়ে যায়।

কিয়োসাকির নিজের জীবনও বইটির দর্শনের মতোই নানা বাঁকে ভরা। ১৯৪৭ সালে হাওয়াইয়ের হিলোতে জন্ম নেওয়া কিয়োসাকি জাপানি-আমেরিকান পরিবারের সন্তান। তার বাবা রালফ কিয়োসাকি ছিলেন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি এবং হাওয়াইয়ের শিক্ষা প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিয়োসাকি বইটিতে নিজের বাবাকে ‘পুওর ড্যাড’ হিসেবে উপস্থাপন করেন, যদিও বাস্তব জীবনে বাবার প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা ছিল।

অন্যদিকে বইয়ের ‘রিচ ড্যাড’ চরিত্রটি পুরোপুরি তার নিজের বাবার বিপরীত এক অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতীক। ২০১৮ সালে কিয়োসাকি জানান, এই চরিত্রের পেছনে হাওয়াইয়ের হোটেল ব্যবসায়ী রিচার্ড কিমির প্রভাব ছিল। ভ্যানিটি ফেয়ারের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বইয়ে তার বাবাকে ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে রালফই একসময় ছেলের ব্যবসায়িক উদ্যোগে ১ লাখ ডলার ঋণ দিয়েছিলেন।

বাবার সঙ্গে এই জটিল সম্পর্কই সম্ভবত কিয়োসাকির আর্থিক দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি। তার বোন তেনজিনও মনে করেন, বাবার শিক্ষা ও মূল্যবোধ তার ভাইয়ের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। কিয়োসাকি নিজেও স্বীকার করেছেন, তার বাবা তাকে নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা দিয়েছিলেন।

কিয়োসাকির জীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধ। তিনি মার্কিন মেরিন বাহিনীতে যোগ দিয়ে হেলিকপ্টার পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তার জীবন ও চিন্তাভাবনায় বড় প্রভাব ফেলে। পরে তিনি ব্যক্তিগত উন্নয়ন, দর্শন ও আর্থিক শিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে যুক্ত হন।

১৯৮০-এর দশকে তিনি ভবিষ্যৎচিন্তক ও স্থপতি বাকমিনস্টার ফুলারের সঙ্গে পরিচিত হন। ফুলারের চিন্তাধারা কিয়োসাকির ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। কিয়োসাকি পরে উপলব্ধি করেন, তার লক্ষ্য শুধু নিজে ধনী হওয়া নয়, বরং অন্যদের অর্থনৈতিক শিক্ষা দেওয়া। এরই ধারাবাহিকতায় তৈরি হয় ‘ক্যাশফ্লো’ নামের বোর্ড গেম এবং পরে সেই গেমকে বোঝাতে গিয়ে জন্ম নেয় ‘রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড’ বইয়ের ধারণা।

কিয়োসাকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা প্রকাশ্যে বলেছেন। দুজন মিলে ‘হোয়াই উই ওয়ান্ট ইউ টু বি রিচ’ এবং ‘মিডাস টাচ’ নামে দুটি বই লিখেছেন। ভ্যানিটি ফেয়ারের প্রতিবেদনে কিয়োসাকির ট্রাম্পের প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা ও ঘনিষ্ঠতার কথাও উঠে এসেছে।অনুপ্রেরণামূলক বই পড়া

তবে কিয়োসাকির জনপ্রিয়তার পাশাপাশি বিতর্কও কম নয়। বাজার ধস, স্বর্ণের দাম ও অর্থনীতি নিয়ে তার বিভিন্ন পূর্বাভাস অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে মেলেনি। তার উচ্চমূল্যের আর্থিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। ২০১৮ সালে রিচ ড্যাড এডুকেশনের বিরুদ্ধে একটি শ্রেণি-আদালত মামলায় অভিযোগ করা হয়েছিল, শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত ও ব্যয়বহুল কোর্স ও পরামর্শ সেবায় যুক্ত করাই ছিল কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য। মামলাটি অবশ্য কারিগরি কারণে খারিজ হয়ে যায়।

 

সব মিলিয়ে ১২০ কোটি ডলারের ঋণের খবর কিয়োসাকির ক্ষেত্রে প্রচলিত অর্থে দেউলিয়াত্বের গল্প নয়। বরং এটি তার দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ দর্শনেরই একটি চরম উদাহরণ। তিনি যে ধরনের ঋণকে সম্পদ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে দেখান, তার নিজের ব্যবসায়ও সেই কৌশলের প্রয়োগ রয়েছে। তবে বিপুল ঋণের সঙ্গে বিপুল সম্পদ থাকলেও ঝুঁকি যে থাকে, সেটিও এই ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়