প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
নিজের ২০৮তম ও দেশের জার্সিতে মাঠে নামা শেষ ম্যাচে গোল করে ফুটবলকে স্মরণীয় বিদায় জানালেন লিওনেল মেসি। বিশ্বতারকাকে আবেগঘন বিদায় জানাল দেশ ও সমর্থকেরাও।
২১ বছরের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। ঝুলিতে জোড়া কোপা আমেরিকা ও একটি বিশ্বকাপ। মঙ্গলবার বুয়েনস আইরেসে বেনিনের বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচ ছিল আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির শেষ ম্যাচ।
বিদায়ের মঞ্চে মেসির পা থেকে অন্তত একটি গোল ছিল প্রত্যাশিত। ৩৯ বছর বয়সি তারকাও ভক্তদের হতাশ করেননি। ৭১ মিনিটে তার চেনা বাঁ পায়ের জাদুতে পেনাল্টি থেকে বল জড়ায় জালের ওপরের দিকে। তাতেই কানায় কানায় পূর্ণ এস্তাদিয়ো মনুমেন্তাল গ্যালারি সমস্বরে ফেটে পড়ে ‘মেসি, মেসি’ গর্জনে।
শেষ বাঁশি বাজার পর দর্শকদের উদ্দেশে মেসি বলেন, ‘আমি চিরকাল এখানে ফিরে আসতে চাই। কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলাটা যেকোনো ফুটবলারের জীবনেই সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি। এর চেয়ে সুন্দর আর কিছু হতে পারে না।’
ম্যাচের শুরুতে অবশ্য কয়েকটি সুযোগ মিস করেছিলেন তিনি। একটা সময় মনে হচ্ছিল, হয়তো গোলবঞ্চিত থেকেই মাঠ ছাড়তে হবে তাকে।
কিন্তু শেষপর্যন্ত নিজে তো গোল করলেনই, দলের ৩-০ ব্যবধানের জয়ে বাকি দুটি গোলও তারই করানো। ৪৮ মিনিটে তার কর্নার থেকে হেড করে বল জালে জড়ান নিকোলাস ওতামেন্দি। পরে তার বাড়ানো নিখুঁত পাস থেকে চমৎকার বাঁকানো শটে গোল করেন নিকো পাজ।
ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই ড্রোন-শোয়ে আলোকিত হয়ে ওঠে মনুমেন্তালের আকাশ। ড্রোনের আলোয় ফুটে ওঠে মেসির ক্যারিয়ারের নানা স্মরণীয় মুহূর্ত। তার মধ্যে অন্যতম ছিল ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তার সেই বিখ্যাত ছবি।
মেসির বিদায়ের জন্য মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামই ছিল সবচেয়ে উপযুক্ত মঞ্চ। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এই মাঠেই সবচেয়ে বেশি গোল (১৯টি) করেছেন তিনি। ১৯৮৬ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের উৎসব উদযাপনের জন্যও এই স্টেডিয়ামেই ফিরেছিলেন মেসি ও তার দল।
মেসি বলেন, ‘বিশ্বকাপের পর প্রথম ম্যাচ খেলতে যেদিন আমরা এখানে ফিরেছিলাম, সেটা ছিল আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম আনন্দের দিন। সেদিন যা দেখেছিলাম, তা আমি কখনও ভুলব না। আমার জীবনে ঘটা সেটাই ছিল সবচেয়ে সুন্দর ঘটনা।’
তার কথা শুনে গ্যালারির অগণিত দর্শক ও তাকে ঘিরে থাকা সতীর্থদের চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে।
ছবি: রয়টার্স
আর্জেন্টাইন গ্রেট আরও বলেন, ‘অনিবার্যভাবেই আজ আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বিষণ্ণ দিন। জাতীয় দলকে বিদায় জানাতে হচ্ছে। সবাইকে বিদায়। আপনাদের খুব মনে পড়বে। মনে পড়বে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামার মুহূর্তগুলো। তবে এখন থেকে আমি আপনাদের পাশেই থাকব। এই দলের ছেলেদের এবং আগামী দিনে যারা আসবে, তাদের সমর্থন জোগাব। আমরা সব সময় ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকব।’
ম্যাচ শুরুর আগে থেকেই আবেগের ঢল নেমেছিল।
এস্তাদিয়ো মনুমেন্তালের পথে রাস্তার দুধারে জমেছিল অগণিত ভক্ত-অনুরাগীর ভিড়। সেই ভিড় ঠেলে আর্জেন্টিনার টিম বাস এগোনোর সময়ই জানলার ধারে বসা মেসির চোখে পানি দেখা যায়।
মাঠে তখন তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও ও সিরোকে নিয়ে জাতীয় সঙ্গীতের জন্য দাঁড়িয়ে মেসি। তার ফুটবলজীবনে শেষবারের মতো বাজছে আর্জেন্টিনার জাতীয় সঙ্গীত। সেই মুহূর্তে মেসির সঙ্গে কোচ লিয়োনেল স্কালোনির দুচোখ বেয়েও অশ্রু গড়াতে দেখা যায়।
এদিন যে ফুটবল ম্যাচের চেয়েও বিদায়ী আবেগ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছিল, তা আরও এক বার স্পষ্ট হয় ম্যাচের ১০ মিনিটে। ১০ নম্বর জার্সিধারী আর্জেন্টাইন কিংবদন্তিকে সম্মান জানাতে কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে দেওয়া হয় খেলা। গোটা স্টেডিয়াম তখন উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছিল। আর বেনিনের ফুটবলাররা একে একে এসে হাত মেলাচ্ছিলেন মেসির সঙ্গে।
গ্যালারি থেকে তখন ভেসে আসছিল গান: ‘এসো, আমার সঙ্গে গাও, পেয়ে যাবে এক বন্ধুকে। লিও মেসির হাত ধরে, আমরা সবাই মেতে উঠব বিজয়ের আনন্দে।’
বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের কয়েক সপ্তাহ পরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিছিলেন মেসি। বলেছিলেন, ‘বিদায় নেওয়ার সময় চলে এসেছে।’
ছবি: রয়টার্স
আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) তাকে ‘প্রাপ্য বিদায়সংবর্ধনা’ দেওয়ার জন্য শেষ একবার মাঠে নামার অনুরোধ জানায়। বুয়েনস এইরেসের বৃহত্তম স্টেডিয়ামের ৮৫ হাজারেরও বেশি টিকিট মাত্র ৯০ মিনিটে শেষ হয়ে যায়। পরে কালোবাজারে সেই টিকিটের দাম আড়াই হাজার ডলারও ছাড়িয়ে যায়।
মেসিকে এই শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাতে মাঠে সপরিবার উপস্থিত ছিলেন আর্জেন্টিনার ১৯৭৮, ১৯৮৬ ও ২০২২ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্যেরা।
আবেগাপ্লুত মেসি বলেন, ‘আমি শুধু এটুকু বলতে চাই, আপনাদের সবাইকে খুব ভালবাসি। খুব মনে পড়বে আপনাদের। একজন আর্জেন্টাইন হিসেবে আমি গর্বিত। আপনাদের সবার সঙ্গে আমার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি। অসংখ্য ধন্যবাদ।’
জুলাইয়ে নিউ জার্সিতে স্পেনের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালে ১-০ গোলে হেরে যায় গতবারের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ফলে টানা দুবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে যায় মেসির।
রানার্স হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হলেও টুর্নামেন্টে তার অনবদ্য পারফরম্যান্স তাতে ঢাকা পড়েনি। আট গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন চার গোল।


