প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
দেশের আকাশসীমা সুরক্ষা ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী। গত বছর মে মাসে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ফরাসি যুদ্ধবিমান রাফালের সঙ্গে টক্কর দেওয়া চীনের তৈরি ৪ দশমিক ৫ প্রজন্মের ২০টি ‘জে-১০সিই এমআরসিএ’ (মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট) যুদ্ধবিমান যুক্ত হচ্ছে বাহিনীটির বহরে। এরই মধ্যে সরকার থেকে সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থাপনায় যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়ায় মিলেছে নীতিগত ও আর্থিক চূড়ান্ত অনুমোদন। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়াটি প্রকল্পটির অর্থায়নে প্রায় সাড়ে ২৬ হাজার কোটি টাকা (সুদসহ ২১৩ কোটি ১৬ লাখ ডলার) পরিশোধের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছরই দেশে আসতে পারে যুদ্ধবিমানগুলো।
সূত্র জানাচ্ছে, জি-টু-জি ব্যবস্থাপনায় চীনের রাষ্ট্রীয় সংস্থা চায়না ন্যাশনাল অ্যারো-টেকনোলজি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএটিআইসি) থেকে কেনা হচ্ছে এসব যুদ্ধবিমান। প্রতিষ্ঠানটিকে প্রথম কিস্তিতে ২০ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ করা হবে। যুদ্ধবিমানগুলো কিনতে আসল ব্যয় হবে প্রায় ১৯৬ কোটি মার্কিন ডলার এবং সুদে ব্যয় ১৭ কোটি ডলার; যার মধ্যে প্রথম কিস্তি বাবদ পরিশোধ করতে হবে ৩৯ দশমিক ১৯ কোটি ডলার।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এরপর দুই বছরের ‘গ্রেস পিরিয়ড’ মিলবে। বাকি অর্থ গ্রেস পিরিয়ডের পর ছয়টি অসমান বার্ষিক কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে। সহজ কিস্তিতে পরিশোধের ফলে জাতীয় রাজস্বের ওপর তাৎক্ষণিক কোনো বড় চাপ ছাড়াই সামরিক বাহিনীকে আধুনিক করার সুযোগ হচ্ছে।
সব ঠিকঠাক থাকলে ২০২৭ সালের মধ্যে ফাইটার জেটগুলো বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এই প্যাকেজের আওতায় শুধু যুদ্ধবিমানই নয়; বরং লজিস্টিকস, পাইলট ও ক্রু ট্রেনিং, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্নত যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করবে চীন, যা দুই দেশের সামরিক নির্ভরতা আরও দীর্ঘস্থায়ী করবে।
সূত্র বলছে, জি-টু-জি ব্যবস্থাপনায় চীন সরকারের কাছ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্য এ যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর (প্রধানমন্ত্রী) অনুমোদন নিয়েছে বিমানবাহিনীর সদর দপ্তর।
যুদ্ধবিমান কেনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘চীনের তৈরি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনার জন্য একটি কমিটি খসড়া চুক্তি প্রস্তুত করেছে। রাফালকে ৪ দশমিক ৫ প্রজন্মের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে জে-১০সিই খুব ভালো করেছে। তাই বাংলাদেশ বিমানটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।’
জে-১০সিই একটি একক ইঞ্জিন ও একক আসনের আধুনিক মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট। এটি চীনের বিমানবাহিনীতে ব্যবহৃত জে-১০সি ফাইটার বিমানের রপ্তানি সংস্করণ। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত সংক্ষিপ্ত আকাশযুদ্ধ ‘অপারেশন সিন্দুর’-এ পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর জে-১০সি ফাইটার জেটের দুর্দান্ত কার্যকারিতা প্রদর্শনের পর এ বিমানের প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহ, বিশেষ করে বাংলাদেশের আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায়।
এই ফাইটার জেটটি অত্যন্ত শক্তিশালী অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে রাডারে সজ্জিত, যা একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্যবস্তু ট্র্যাক করতে পারে এবং শত্রুপক্ষের ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর। এ ছাড়া বিমানটি চীনের তৈরি দূরপাল্লার বিয়ন্ড-ভিজ্যুয়াল-রেঞ্জ এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল ‘পিএল-১৫’ ছুড়তে সক্ষম, যা যেকোনো আধুনিক পশ্চিমা বা রুশ বিমানকে আকাশযুদ্ধে বড় চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। উন্নত ডেটা লিংক এবং এয়ারবোর্ন আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের মাধ্যমে এটি যুদ্ধক্ষেত্রে নিখুঁত নেটওয়ার্ককেন্দ্রিক সমন্বয় সৃষ্টি করতে সক্ষম। এ ছাড়া সমমানের ইউরোপীয় যুদ্ধবিমানের (যেমন— রাফাল বা ইউরোফাইটার টাইফুন) তুলনায় জে-১০সিই-এর কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
জানা গেছে, চীন থেকে যুদ্ধবিমান কেনার নেগোসিয়েশনের আগেই অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে এ নিয়ে বিমানবাহিনীর মৌখিকভাবে আলোচনা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির অনুমোদনের জন্য অর্থমন্ত্রীকে পাঠানো সারসংক্ষেপে বলা হয়— বাহিনীর জন্য ক্রয়াধীন ২০টি জে-১০সিই এমআরসি যুদ্ধবিমানের মোট মূল্যের শতকরা ৮০ ভাগ অর্থ পরবর্তী সময়ে ছয়টি অসমান বার্ষিক কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে। এটি মূলত বাকিতে ক্রয় হিসেবে বিবেচিত। ফলে এ যুদ্ধবিমানগুলো মোট মূল্যের অপরিশোধিত অর্থ সরকারের জন্য হিসাব পরিশোধ হিসেবে সরাসরি দায়। এ ধরনের সরাসরি দায় পরিশোধের জন্য সরকার থেকে গ্যারান্টি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে বর্তমান ক্ষেত্রটি স্পর্শকাতর এবং বিক্রেতা কর্তৃক বিশেষভাবে অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ বিবেচনায় এক্ষেত্রে মোট মূল্যের ওপর গ্যারান্টি দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ভবিষ্যতে কোনো অবস্থাতেই এর পুনরাবৃত্তি করা যাবে না। ভবিষ্যতে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনার আগেই অর্থ বিভাগের সঙ্গে অর্থায়ন প্রক্রিয়া বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার পরই শুধু পরবর্তী পর্যায়ে অগ্রসর হতে হবে।


