প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বিপুল জয়ের পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের বিকাশ থমকে যাওয়ার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারবাজারে ব্যাপক ধস নেমেছে। এর ফলে একদিনেই শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর শত শত কোটি ডলারের বাজারমূল্য হাওয়া হয়ে গেছে।
এআই প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত বিকাশ সীমিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচার চালানো ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনে জয়লাভ করার পরই বিশ্বজুড়ে টেক ও এআই খাতের শেয়ারে এই দরপতন শুরু হয়।
ডাও জোন্সের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক শেয়ারবাজারের সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। এতে বাজারমূল্য থেকে একদিনেই মুছে গেছে ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এটি ২০২৫ সালের পর প্রধান মার্কিন পুঁজিবাজারগুলোর জন্য সবচেয়ে বাজে দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এআই প্রযুক্তির পেছনে ঢালা বিপুল অর্থ শেষ পর্যন্ত লাভজনক হবে কি না—বিনিয়োগকারীদের এমন গভীর সংশয়ের ওপর মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল বাড়তি আঘাত হেনেছে।
এর ধাক্কায় শুক্রবার সকালে এশিয়ার বাজারেও বড় দরপতন দেখা গেছে। এআই শক্তি জোগাতে প্রয়োজনীয় কম্পিউটার চিপ ও অন্যান্য সরঞ্জাম উৎপাদনকারী এশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম তীব্রভাবে হ্রাস পেয়েছে।
জাপানের নিকেই ২২৫ সূচক লেনদেনের শুরুতেই ৬ শতাংশ কমে যায়। মেমোরি চিপ নির্মাতা কিওক্সিয়ার শেয়ারের দরপতন হয় ১২ দশমিক ৬ শতাংশের বেশি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী টোকিও ইলেকট্রনের শেয়ার পড়ে যায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ।
দক্ষিণ কোরিয়ার চিপ প্রস্তুতকারক এসকে হাইনিক্সের শেয়ারদর কমেছে সাড়ে ১১ শতাংশের বেশি এবং স্যামসাংয়ের শেয়ার পড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। সিউলের এই ব্যাপক দরপতনের কারণে কোসপি সূচক ৮ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি নিমজ্জিত হয় এবং আতঙ্কিত বিক্রি থামাতে সাময়িকভাবে শেয়ার কেনাবেচা বন্ধ রাখার ব্যবস্থা ‘সার্কিট ব্রেকার’ সক্রিয় করতে হয়।
তাইওয়ানের তাইয়েক্স সূচক পড়েছে ৮ দশমিক ৩ শতাংশের বেশি; যেখানে বিশ্বের শীর্ষ চিপ নির্মাতা টিএসএমসি-এর শেয়ারদর প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
মার্কেটওয়াচের চিপ বিশ্লেষক ব্রিটনি নগুয়েন বলেন, ‘এআই অবকাঠামোতে বিপুল ব্যয়ের বিষয়টি নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, এই দরপতন তারই ধারাবাহিকতা।’
ডেটাসেন্টারের ওপর রাজনৈতিক খড়্গ
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা মূলত ডেটাসেন্টার ও এআই প্রযুক্তির লাগাম টেনে ধরার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনি প্রচার চালিয়েছিলেন। ব্যালটেও এই প্রযুক্তির কেন্দ্রস্থল ডেটাসেন্টারগুলোর রাশ টানার লক্ষ্যে বহু প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। মঙ্গলবারের নির্বাচনে সেনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—উভয়েরই নিয়ন্ত্রণ জিতে নেন ডেমোক্র্যাটরা; যা ট্রাম্পের বাকি মেয়াদের জন্য পুরো কংগ্রেসকে তাঁদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গেছে।
টেক্সাসের নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট গভর্নর জিনা হিনোজোসা ডেটাসেন্টার সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রচার চালিয়েছিলেন এবং এ খাতে নতুন নির্মাণকাজ পুরোপুরি স্থগিত রাখার অঙ্গীকার করেছিলেন।
শেয়ারবাজারের এই বিপর্যয়ের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি লেখেন, ‘নির্বাচনের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে শেয়ারবাজার তার ইতিহাসের অন্যতম বাজে দিনের মুখোমুখি হয়েছে। মনে রাখবেন, এটি রিপাবলিকানদের জন্য নয়, হয়েছে ‘ডামোক্র্যাটদের’ (ডেমোক্র্যাটদের ব্যঙ্গ করে লেখা) কারণে। তবে ভয় পাবেন না, যেভাবেই হোক আমরা খুব শীঘ্রই আগের চেয়ে আরও বড় ও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসব। মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন!’
কিছু ডেমোক্র্যাট যুক্তি দিচ্ছেন যে কোনো ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা ও তদারকি ছাড়াই এআই প্রযুক্তি মাত্রাতিরিক্ত বড় হয়ে উঠেছে এবং কংগ্রেসে পাওয়া নতুন ক্ষমতার মাধ্যমে তারা এই পরিস্থিতি পাল্টানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
ডেমোক্র্যাট সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স বৃহস্পতিবার এক্সে লেখেন, ‘বিগ টেক অলিগার্করা পরিবেশ ধ্বংস করবে, মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে এবং মানবতার ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে ফেলবে—আমেরিকানরা তা চায় না। এখনই দেশব্যাপী ডেটাসেন্টার নির্মাণের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করুন।’
এআই ডেটাসেন্টারের সঙ্গে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে বৃহস্পতিবার ব্যাপক পতন ঘটে; যা বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান ভয়কে আরও উসকে দেয়।
ইউরোপীয় বাজারে চিপ নির্মাতা ইনফিনিয়নের শেয়ার কমেছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং টেক সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক এএসএমএল পড়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
নিউইয়র্কের বাজারে এনভিডিয়ার শেয়ার দরপতন হয়েছে ৯ শতাংশেরও বেশি, যা প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য থেকে এক ধাক্কায় ৪০ হাজার কোটি (৪০০ বিলিয়ন) ডলারের বেশি মুছে দিয়েছে।
অন্যান্য চিপ নির্মাতাদের অবস্থাও শোচনীয় ছিল। এএমডি এবং মাইক্রন উভয়েরই দরপতন হয়েছে ১৭ শতাংশের বেশি। ইন্টেলের শেয়ার কমেছে ১০ দশমিক ৩ শতাংশ এবং স্যান্ডিস্কের শেয়ারে ২২ শতাংশের বড় ধস নেমেছে। শীর্ষ ৩০টি সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানির পারফরম্যান্স পরিমাপক ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর ইনডেক্স ১২ শতাংশেরও বেশি কমেছে।
এদিকে ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স এবং টেসলার শেয়ারেও বড় ধাক্কা লেগেছে; যথাক্রমে ৮ শতাংশ ও প্রায় ১১ শতাংশ কমে বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠান দুটির বাজারমূল্য থেকে ৩০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি উধাও হয়ে গেছে। নির্বাচনে টেক্সাসের সেনেট আসনটিতে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের জন্য অন্তত সাড়ে চার কোটি ডলারসহ রিপাবলিকানদের পেছনে মোট প্রায় ৪৫ কোটি ডলার খরচ করেছিলেন মাস্ক; তবে মঙ্গলবারের ডেমোক্র্যাটিক ঝড়ে টেক্সাস ডেমোক্র্যাটদের দখলে চলে যায়।
অ্যাপল, এনভিডিয়া এবং টেসলাসহ প্রযুক্তি খাতের তথাকথিত ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ কোম্পানিগুলো এক দিনে সম্মিলিতভাবে এক ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারের মূল্য হারিয়েছে।
এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ডাও জোন্স ৩ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। নাসডাকের এই পতন এতটাই বড় ছিল যে এটি এখন বাজার পর্যবেক্ষকদের ভাষায় ‘কারেকশন টেরিটরি’তে প্রবেশ করেছে; অর্থাৎ সাম্প্রতিক শীর্ষ মূল্যের চেয়ে সূচকের পতন অন্তত ১০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুসানাহ স্ট্রিটার বলেন, ‘এআই বাণিজ্যকে ঘিরে নতুন আতঙ্ক ওয়াল স্ট্রিটে মারাত্মক আঘাত হেনেছে। এআই অবকাঠামোতে ঢালা বিপুল অর্থ প্রত্যাশিত মুনাফা এনে দিতে পারবে না—এমন ভয়ের সঙ্গে এখন ডেটাসেন্টার নির্মাণে বড় ধরনের স্থবিরতা নেমে আসার শঙ্কা এসে মিলেছে।’
সাক্সোর প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ চারু চানানা জানান, পরিবেশ ও বিদ্যুতের ওপর প্রভাব পর্যালোচনায় ডেটাসেন্টার অনুমোদনে কড়াকড়ি এই খাতের প্রকল্পগুলোকে বিলম্বিত করতে পারে এবং খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে। তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বজায় রাখতে উভয় দলই আগ্রহী হলেও, যেকোনো মূল্যে বা অনিয়ন্ত্রিত গতিতে অবকাঠামো সম্প্রসারণের সুযোগ দেওয়া আর এআই বিকাশকে সমর্থন জানানোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।’
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেটাসেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এমন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া টেক জগতের শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও অপ্রস্তুত করে ফেলেছে।
ওপেনএআই-এর প্রেসিডেন্ট ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা গ্রেগ ব্রকম্যান বুধবার ক্যালিফোর্নিয়ায় ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল টেক সম্মেলনে বলেন, ডেটাসেন্টার নিয়ে এমন প্রতিক্রিয়ায় সবাই অবাক হয়েছেন এবং সাধারণ মানুষকে আস্থায় নিতে আরও কাজ করা দরকার। মেটার প্রেসিডেন্ট দিনা পাওয়েল ম্যাককরমিকও একই সম্মেলনে বলেন, এআই প্রযুক্তি যে একটি ভালো উদ্যোগ, তা সাধারণ মানুষকে বোঝাতে এই শিল্পকে আরও দ্বিগুণ প্রচেষ্টা চালাতে হবে।


