প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
হজমপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখা এবং অন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখতে বৃহদন্ত্র বা কোলনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে করেন, কোলন পরিষ্কার রাখলে হজমের কার্যক্রম ভালো থাকে। তবে এ জন্য বিশেষ কোনো ওষুধ বা জটিল পদ্ধতির প্রয়োজন নেই। বরং দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনলেই অন্ত্রের স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে পারে।
১. পর্যাপ্ত পানি পান
হজমপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। প্রতিদিন ছয় থেকে আট গ্লাস পানি পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি তরমুজ, টমেটো, লেটুস ও সেলারির মতো পানিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া যেতে পারে।
তবে কোলন পরিষ্কারের জন্য অতিরিক্ত জোলাপ বা ল্যাক্সেটিভ ব্যবহার করা উচিত নয়। দীর্ঘদিন এসব ওষুধের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে।
২. লবণ-পানি পান
কোষ্ঠকাঠিন্য বা অনিয়মিত মলত্যাগের সমস্যায় কেউ কেউ লবণ-পানি পান করার পদ্ধতি অনুসরণ করেন। ২০১০ সালের একটি গবেষণায় যোগব্যায়ামের নির্দিষ্ট কিছু ভঙ্গির সঙ্গে লবণ-পানি ব্যবহারে কোলন পরিষ্কারের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছিল।
এ পদ্ধতিতে সকালে খালি পেটে কুসুম গরম পানিতে দুই চা-চামচ লবণ মিশিয়ে পান করার কথা বলা হয়েছে। এতে কিছুক্ষণের মধ্যে মলত্যাগের চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে কিংবা যাদের খাবারে সোডিয়াম সীমিত রাখতে হয়, তাদের এ পদ্ধতি এড়িয়ে চলা উচিত। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা নিরাপদ নয়।
৩. আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া
অন্ত্রের সুস্থতার জন্য খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত আঁশ রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ফলমূল, শাকসবজি, গোটা শস্য, বাদাম ও বিভিন্ন বীজে প্রচুর খাদ্যআঁশ থাকে।
খাদ্যআঁশ মলের পরিমাণ বাড়াতে এবং মলত্যাগ নিয়মিত রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখে। তাই প্রতিদিনের খাবারে আঁশযুক্ত খাবার রাখা প্রয়োজন।
৪. ফল ও সবজির জুস এবং স্মুদি
ফল ও সবজির জুস হজমের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। এসব পানীয়তে থাকা পানি শরীরকে আর্দ্র রাখতে এবং মল নরম করতে সহায়তা করে।
২০১৫ সালের একটি গবেষণায় কোলন পরিষ্কারে ভিটামিন সি-এর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আপেল, লেবু ও সবুজ শাকসবজিতে এ ভিটামিন পাওয়া যায়।
তবে শুধু জুস পান করে উপবাস করার পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং জুসের পরিবর্তে স্মুদি খাওয়া ভালো হতে পারে। কারণ স্মুদিতে ফলের আঁশ অক্ষত থাকে, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
৫. প্রতিরোধী শ্বেতসারযুক্ত খাবার
প্রতিরোধী শ্বেতসার বা রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ এক ধরনের শর্করা, যা খাদ্যআঁশের মতো কাজ করে। আলু, ভাত, ডাল, কাঁচা কলা ও বিভিন্ন শস্যে এটি পাওয়া যায়।
এ ধরনের খাবার অন্ত্রের উপকারী অণুজীবের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। ২০১৩ সালের একটি পর্যালোচনামূলক গবেষণায় প্রতিরোধী শ্বেতসার বৃহদন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
যারা কম শর্করাযুক্ত খাবার গ্রহণ করেন, তারা ডাল, কাঁচা কলা ও গোটা গমের মতো খাবার বেছে নিতে পারেন।
৬. প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ খাবার
অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রোবায়োটিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দই, কিমচি, আচার ও অন্যান্য গাঁজন করা খাবারে প্রোবায়োটিক পাওয়া যায়।
প্রোবায়োটিকের পাশাপাশি খাদ্যআঁশ ও প্রতিরোধী শ্বেতসার অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্রমে সহায়তা করে। এগুলো অন্ত্রের প্রদাহ কমানো এবং নিয়মিত মলত্যাগে ভূমিকা রাখতে পারে।
আপেল সিডার ভিনেগারকেও অনেকে প্রোবায়োটিক হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে এর মাধ্যমে অন্ত্রের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দমনের বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা নেই।
৭. ভেষজ চা পান
কিছু ভেষজ উপাদানে জোলাপের বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়তা করতে পারে। এসব উপাদানের মধ্যে রয়েছে—
– ইসবগুলের ভুসি
– অ্যালোভেরা
– মার্শম্যালো রুট
– স্লিপারি এলম
তবে এসব ভেষজ উপাদান ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ কিছু উপাদান নিয়মিত ব্যবহৃত ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। অতিরিক্ত ভেষজ জোলাপ গ্রহণও শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
এ ছাড়া আদা, রসুন ও গোলমরিচে থাকা কিছু উপাদানের জীবাণুরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আদা-চা পান করাও খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।
অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হোন
কোলনের সুস্থতা বজায় রাখতে সুষম খাবার, পর্যাপ্ত পানি এবং নিয়মিত মলত্যাগের অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোলন পরিষ্কারের নামে অতিরিক্ত লবণ-পানি, জোলাপ বা ভেষজ উপাদান ব্যবহার করা উচিত নয়।
এ ধরনের কোনো পদ্ধতি অনুসরণের সময় বমি বমি ভাব, বমি, মাথা ঘোরা, পানিশূন্যতা, শরীরে লবণ-খনিজের ভারসাম্যহীনতা কিংবা পেটে ব্যথা দেখা দিলে তা অবহেলা করা যাবে না। এসব লক্ষণ দেখা দিলে পদ্ধতিটি বন্ধ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।


