প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন সামনে রেখে দেশটির ডেমোক্র্যাটিক বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং রিপাবলিকান প্রতিপক্ষ সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টেলিভিশন বিতর্কে মুখোমুখি হয়েছেন।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২৮ জুন) রাতে এ বিতর্ক হয়। ৫ নভেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। নির্বাচন সামনে রেখে চার বছরের মধ্যে এই প্রথম তারা একে অন্যের মুখোমুখি হলেন।
বিতর্কে পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, সীমান্ত ইস্যু, সামাজিক নিরাপত্তা, চাইল্ড কেয়ার, কংগ্রেস ভবনে হামলার ঘটনা, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলার সময় তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলার অভিযোগ আনেন এবং পরস্পরকে তীব্র বাক্যবাণে জর্জরিত করার চেষ্টা করেছেন।
অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতির রেকর্ড ও ব্যাপকসংখ্যক অভিবাসীর বিষয়ে বাইডেনের তীব্র সমালোচনা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে আদালতে সম্প্রতি ট্রাম্পের সাজার প্রসঙ্গ তুলে ট্রাম্পকে ‘গণতন্ত্রের জন্য হুমকি’ বলে উল্লেখ করেন বাইডেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এখন জাহান্নামে বাস করছেÑএই বলে বিতর্ক শেষ করেছেন ট্রাম্প। তার ভাষায়, ‘সাড়ে তিন বছর ধরে আমরা জাহান্নামে বাস করছি’। অন্যদিকে বাইডেন তার শেষ বক্তব্যে মার্কিনিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন এবং বলেন, তিনি কর কমিয়ে আনতে চান। একই সঙ্গে দাবি করেন যে ট্রাম্প কর বাড়িয়ে দেবেন।
২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ডেমোক্র্যাট দলের বাইডেন ও রিপাবলিকান ট্রাম্প পরস্পরের মুখোমুখি হলেন।
কে জিতেছেন বিতর্কে?
যুক্তরাষ্ট্রের বিবিসির স্পেশাল করেসপনডেন্ট কেইটি কে লিখেছেন, এবারের বিতর্কের ফরম্যাট ছিল মার্কিনিদের জন্য তুলনামূলক ভালো। তবে সঞ্চালকরা তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করেননি এবং এটা ছিল জো বাইডেনের জন্য একটি খারাপ রাত।
তার অনেক জবাবই পরিষ্কার ছিল না। তাকে বয়স্ক মনে হচ্ছিল। তবে বিতর্কের দ্বিতীয় ধাপ তার জন্য কিছুটা ভালো ছিল এবং তিনি কিছুটা শক্তি পেয়েছিলেন। তবে এটা হতে হতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।
বিতর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্প জিতেছেন। কিন্তু এটা কি তাকে নির্বাচনে জিততে সহায়তা করবে?
পর্যবেক্ষকরা কী বলছেন?
রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের বিতর্ক যারা মনোযোগ দিয়ে দেখেছেন তারা অনেকেই তাদের প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন।
সাবেক ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যান স্টেফাইন মারফি বিবিসিকে বলেছেন, কিছু মুহূর্ত ছিল যেখানে বাইডেন তার বয়স তুলে ধরেছেন। তাকে বোঝাটা কষ্টসাধ্য ছিল।
অন্যদিকে তার মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প কিছু মন্তব্য করেছেন যা ‘সত্যি নয়’ এবং এগুলো সত্যতা যাচাই করা উচিত। তিনি বলেন, তার উদ্বেগের জায়গা হলো নির্বাচনের ফল গ্রহণ করবেন কি না তা বলতে ডোনাল্ড ট্রাম্প অনীহা দেখিয়েছেন।
সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান রোডনি ডেভিস বলেছেন, বিতর্কটি ছিল ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিষ্কার জয়’।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ডেমোক্র্যাটদের জন্য দুঃখজনক যে, বিতর্কের ধরনটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সহায়তা করেছে, বলেছেন তিনি।
বিবিসির ম্যাডেলাইন হ্যালপার্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর কোরউইন স্মিডট বলেছেন, বাইডেন তার অনেক দুর্বলতা দেখিয়েছেন এবং খুব বেশি শক্তির জায়গা দেখাননি।
ভিজুয়াল, কণ্ঠ ও জবাব দেওয়ার গতির কারণে তাকে অনুসরণ করাটা কঠিন ছিল।
অনেক তথ্যভিত্তিক জবাব ও পয়েন্ট প্রেসিডেন্ট বাইডেন দিয়েছেন। কিন্তু বলার ধরনের কারণে সেগুলো দ্রুত হারিয়ে গেছে, বলছিলেন তিনি।
ট্রাম্পের পারফরম্যান্স থেকেও অনেক বেশি শক্তির জায়গা পাওয়া যায়নি এবং তিনিও কিছু দুর্বলতার প্রদর্শন করেছেন, বলেছেন তিনি।
প্রশ্নের জবাবে তার উত্তরগুলো দৃঢ় ছিল না। কিন্তু উত্তরগুলো তার ভোটারদের কিছু উদ্বেগ ও ইস্যুকে স্পর্শ করে গেছে, বলছিলেন প্রফেসর স্মিডট। তার সমর্থকরা তাকে চার বছর আগের প্রার্থীর মতোই দেখতে চায়।
ট্রাম্প নির্বাচনের ফল মানবেন?
বিতর্ক পরিচালনাকারী সিএনএনের সঞ্চালক ট্রাম্পের কাছে দুবার জানতে চান, নির্বাচনে যে-ই জিতুক তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনের ফল মানবেন কি না।
তিনি বারবার প্রশ্নটি উপেক্ষা করছিলেন, বরং রাশিয়া-ইউক্রেন ইস্যুতে চলে যাচ্ছিলেন। এরপর আবারও তাকে প্রশ্নটি করা হয়।
জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘যদি এটি সুষ্ঠু, আইনগত ও ভালো নির্বাচন হয় তাহলে অবশ্যই।’ একই সঙ্গে তিনি ২০২০ সালের নির্বাচন নিয়ে তার বড় ধরনের কারচুপির অপ্রমাণিত দাবির পুনরাবৃত্তি করেন।
প্রার্থীদের বয়স প্রসঙ্গ
বাইডেনকে তার বয়স সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয় যে তিনি যখন দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ করবেন তখন তার বয়স হবে ৮৬। তিনি হবেন সবচেয়ে বয়স্ক প্রেসিডেন্ট।
প্রেসিডেন্ট জবাবে বলেন, একসময় তিনি সবচেয়ে কমবয়সি আইনপ্রণেতা বলে সমালোচনার শিকার হতেন এবং ট্রাম্প ‘তিন বছরের ছোট এবং অনেকটাই কম যোগ্য’।
‘রেকর্ড দেখুন। দেখুন তিনি যে ভয়ানক পরিস্থিতি রেখে গিয়েছিলেন সেখান থেকে কীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছি’, বলছিলেন বাইডেন।
অন্যদিকে ট্রাম্পকে বলা হয়, তার বয়স এখন ৭৮ এবং দ্বিতীয় মেয়াদ শেষে তা হবে ৮২ বছর।
জবাবে ট্রাম্প বলেন, তার স্বাস্থ্য ভালো এবং তিনি এ সময় গলফ খেলার প্রসঙ্গও টেনে আনেন।
‘তিনি এটা করেন না। তিনি ৫০ গজ দূরেও বল পাঠাতে পারেন না,’ ট্রাম্প বলছিলেন। ‘আমার মনে হয় আমি ২৫-৩০ বছর আগের মতোই ভালো অবস্থায় আছি। সত্যি বলতে, আমি এখন আরও উজ্জ্বল’।
শিশু যত্নের খরচ প্রসঙ্গ
শিশু যত্নের খরচ মেটানোর সক্ষমতা নিয়ে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়েছিল খরচ কমিয়ে আনতে তিনি কী করবেন। জবাবে বলতে গিয়ে ট্রাম্প যথারীতি যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত ইস্যু টেনে এনে বাইডেনের তীব্র সমালোচনা করেন।
জবাবে পাল্টা আক্রমণ করে বাইডেন বলেন, ট্রাম্প হলেন ‘আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ প্রেসিডেন্ট’। এরপর তিনি বলেন, শিশু যত্নের খরচ কমাতে ট্রাম্প খুব কম ব্যবস্থাই নিয়েছিলেন।
পরে ট্রাম্প তিনি প্রেসিডেন্ট থাকাকালে কী করেছেন তা তুলে ধরেন। ‘তারা আমাকে সবচেয়ে ভালো মনে করে এবং আমি যদি আরও চার বছর পাই তাহলে আমি আমার সেরাটাই দেব’।
‘বীরেরা রাস্তায় বাস করছে’
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি জো বাইডেনের মতো আর কাউকে ‘এত মিথ্যা’ বলতে দেখেননি এবং ভেটেরান অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক সদস্যদের বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ তুলে সমালোচনা করেন বাইডেনের।
‘তিনি (বাইডেন) যা-ই বলছেন সব মিথ্যা,’ বলছিলেন তিনি।
এ পর্বেও ট্রাম্প সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়ার অভিযোগ করেন বাইডেনের বিরুদ্ধে এবং বলেন, ‘লাখ লাখ মানুষ’ পাবলিক পেনশন স্কিমে যোগ হতে যাচ্ছে।
‘তারা ভেটেরান অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্ট ও আমাদের ভেটেরানদের সঙ্গে যা করেছে তা অবিশ্বাস্য,’ বলছিলেন তিনি।
আমাদের বীরেরা এখন রাস্তায় বাস করে। আর এসব লোকেরা (অভিবাসী) থাকে বিলাসবহুল হোটেলে।
সূত্র : বিবিসি বাংলা


