রবিবার, মে ৩, ২০২৬
spot_img
Homeসংবাদ‘আতঙ্কের’ নাম মশা

‘আতঙ্কের’ নাম মশা

প্রাইম ভিশন ডেস্ক »

সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও অসংক্রামক রোগের (হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস ইত্যাদি) দৌরাত্ম্য বেড়েছে। মৃত্যুর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ঘটছে বিভিন্ন অসংক্রামক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে। তবে কয়েকটি সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবও জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে মশা ও মাছিবাহিত এমন ছয়টি রোগ দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। জনস্বাস্থ্য এবং সেই সূত্রে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে উঠছে এসব রোগ।

জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, মশাবাহিত রোগগুলো নিয়ে কয়েক দশকের সরকারি কার্যক্রমের সুবাদে কয়েকটি রোগ নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। আবার কয়েকটি মহামারি আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, জাপানিজ এনকেফালাইটিস ও জিকা রোগের প্রকোপ দেখা যাচ্ছে দেশে। এর মধ্যে গত ছয় বছরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ হয়েছে সবচেয়ে বেশি। মাত্রায় এর পর রয়েছে ম্যালেরিয়া ও চিকুনগুনিয়া। মশা নির্মূলে বিজ্ঞানসম্মত পন্থা অবলম্বন না করা, রোগের জিনভিত্তিক গবেষণার অনুপস্থিতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রোগ ও রোগী ব্যবস্থাপনার ঘাটতি মশাবাহিত রোগের বিস্তার ঘটাচ্ছে।

মশা নিয়ন্ত্রণে বিশ্বে নেতৃস্থানীয় অলাভজনক সংস্থা অ্যামেরিকান মসকিউটো কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের (এএমসিএ) তথ্যমতে, অন্য যেকোনো জীবের তুলনায় মশা মানুষের জন্য বেশি দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। বিশ্বে বছরে ১০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় মশাবাহিত রোগের কারণে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের জনস্বাস্থ্য বিভাগ ও অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির ওয়ার্ল্ড মসকিউটো প্রোগ্রামের ভাষ্য, বিশ্বে সাড়ে ৩ হাজারের বেশি প্রজাতির মশা রয়েছে। এই দুই কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, এর মধ্যে ১০০ প্রজাতির মশা মানবদেহে অন্তত ২০টি প্রাণঘাতী রোগ ছড়াতে সক্ষম। বাংলাদেশে ঠিক কত প্রজাতির মশা রয়েছে তার নিশ্চিত তথ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে নেই।

মশাবাহিত রোগগুলো

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোটা দাগে ছয়-সাতটি মশা ও মাছিবাহিত রোগ দেখা যায়। এগুলো হচ্ছে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, জিকা, ফাইলেরিয়া, জাপানিজ এনকেফালাইটিস ও কালাজ্বর। বাংলাদেশে বিরল হলেও ওয়েস্ট নাইল জ্বরের সংক্রমণও শনাক্ত হয়েছে। এ দেশে এডিস মশা চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু, লিম্ফ্যাটিক ফাইলেরিয়াসিস, জিকা; অ্যানোফিলিস প্রজাতির মশা লিম্ফ্যাটিক ফাইলেরিয়াসিস, ম্যালেরিয়া; কিউলেক্স মশা জাপানিজ এনকেফালাইটিস, লিম্ফ্যাটিক ফাইলেরিয়াসিস, ওয়েস্ট নাইল ফিভার ও ফাইলেরিয়া এবং স্যান্ডফ্লাই নামের এক প্রকার মাছি কালাজ্বরের বাহক হিসেবে কাজ করে।

ডেঙ্গু

দেশে মশাবাহিত রোগগুলোর মধ্যে এখন ডেঙ্গুর সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। শুরুর দিকে রাজধানী ঢাকায় সীমিত থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের সব অঞ্চলে বড় পরিসরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছড়িয়েছে। ২০০০ সালে প্রথম এ রোগের নিয়মিত পরিসংখ্যান রাখতে শুরু করে সরকারের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। ২০১৯ সালে শহর ও গ্রাম উভয় স্থানে ছড়িয়ে পড়ে ডেঙ্গু। সে বছর লাখের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে দেড় শর বেশি রোগীর মৃত্যু হয়। ২০০০ থেকে ২০২২ সাল—এ ২৩ বছরে ডেঙ্গু রোগীর মোট সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৪৪ হাজার ২৪৬। এর মধ্যে মারা গেছে ৮৫০ রোগী। সর্বোচ্চ আক্রান্তের বছর ছিল ২০২৩। সে বছর হাসপাতালে ভর্তি হয় ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি রোগী। মারা যায় ১ হাজার ৭০৫ জন। গত বছর ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন রোগীর বিপরীতে মারা গেছে ৫৭৫ জন। আর চলতি বছরের শুরু থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত ১১ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ৪৪ জনের। সূত্র আজকের পত্রিকা।

ডেঙ্গুতে বাংলাদেশেই মৃত্যু সবচেয়ে বেশি, এমনটি জানা যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (ইসিডিসি) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য বিশ্লেষণে। এদের তথ্য বলছে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে। দেশটিতে গত বছর প্রায় ১ কোটি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার। গত বছর রোগীর অনুপাতে ব্রাজিলে মৃত্যুহার ছিল শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ আর বাংলাদেশে ছিল শূন্য দশমিক ৫৬ শতাংশ।

চিকুনগুনিয়া

ডেঙ্গুর মতোই চিকুনগুনিয়াও ছড়ায় এডিস মশার মাধ্যমে। রোগ দুটির উপসর্গে কিছু মিলও আছে। বাংলাদেশে প্রথম চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হয় ২০০৮ সালে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে। ২০১১ সালে ঢাকার দোহারে কিছু রোগী পাওয়া যায়। এর পরের বছরগুলোতে কমবেশি সংক্রমণ দেখা গেছে। তবে ২০১৭ সালে দেশজুড়ে এ ভাইরাল রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। গত বছরের ডিসেম্বরে আইইডিসিআর জানায়, দেশে জিকা ভাইরাসে ১১ জন এবং চিকুনগুনিয়ায় ৬৭ জন আক্রান্ত হয়েছে। চলতি বছরেও চিকুনগুনিয়া রোগী পাওয়া যাচ্ছে। গত জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে ৩৩৭ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১৫৩ জনের দেহে চিকুনগুনিয়ার ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে আইইডিসিআর।

ম্যালেরিয়া

ম্যালেরিয়াই সম্ভবত সবচেয়ে পরিচিত মশাবাহিত রোগ। স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু ছড়ায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সারা দেশে ৬ লাখ ১ হাজার মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ৬৬৩ জন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ২ হাজার রোগী পাওয়া গেছে। আর মারা গেছে ১ জন। দুই দশক ধরে দেশে ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ নিম্নমুখী থাকলেও গত তিন বছরে সংক্রমণ বেড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা জানিয়েছে, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় রোগটি নির্মূল করা যায়নি। চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের ১৩ জেলায় ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। জেলাগুলো হলো কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, শেরপুর, কুড়িগ্রাম, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজার। তবে মোট ম্যালেরিয়া রোগীর দুই-তৃতীয়াংশই পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার। গভীর জঙ্গলে অ্যানোফিলিস মশার প্রকোপ বেশি হওয়ায় পার্বত্য অঞ্চলে রোগী বেশি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবশ্য বলছে, আগের চেয়ে ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ ৭৯ শতাংশ কমেছে। মৃত্যুও কমেছে ৯১ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআর জানিয়েছে, কিউলেক্স মশার দুটি প্রজাতি ও ম্যানসোনিয়া মশা ফাইলেরিয়া বা গোদ রোগ ছড়াচ্ছে। গোদ রোগে জ্বর ও ঠান্ডা লাগে এবং জটিল হলে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ব্যাপকভাবে ফুলে যায়। দেশের অন্তত ৩৪টি জেলায় এ রোগ দেখা যাচ্ছে। কালাজ্বরের বাহক হিসেবে কাজ করে স্যান্ডফ্লাই নামের মাছি। দেশে ১৯৯৩ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত দেড় লাখ কালাজ্বরের রোগী পাওয়া গেছে। তবে বাংলাদেশ গোদ ও কালাজ্বর মোটের ওপর নিয়ন্ত্রণ করেছে বলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেছে।

বাংলাদেশে প্রথম জাপানিজ এনকেফালাইটিস রোগী শনাক্ত হয় ১৯৭৭ সালে টাঙ্গাইলের মধুপুর বন এলাকায়। পরবর্তী সময়ে রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম ও খুলনা অঞ্চলেও রোগটি পাওয়া যায়। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশের মৃত্যু হয় বলে বৈশ্বিক বিভিন্ন জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থা উল্লেখ করেছে। এই রোগের জন্য বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)। দেশে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসবাহিত জ্বর ও জিকার সংক্রমণও শনাক্ত হয়েছে। তবে এই দুটি রোগ তেমন ছড়িয়ে পড়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।

কীটতত্ত্ব ও রোগতত্ত্ববিদেরা যা বলেন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, মানুষের চলাফেরা বৃদ্ধি, অনুপযুক্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, শিক্ষা ও সচেতনতার অভাব ইত্যাদি মশাবাহিত রোগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছারোয়ার বলেন, ‘এ ধরনের রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশে সে রকম কোনো গাইডলাইন নেই। মশা বা মাছিবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য মেডিকেল এন্টোমলজিস্টের প্রয়োজন। কিন্তু দেশে মেডিকেল এন্টোমলজিতে একাডেমিক ডিগ্রি প্রদানের প্রতিষ্ঠানই নেই। মেডিকেল এন্টোমলজির ওপর স্নাতকোত্তর চালুর জন্য আমরা চেষ্টা করছি। এসব সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণার জন্য উচ্চ প্রযুক্তির পরীক্ষাগারও প্রয়োজন।’

মশা বা মাছিবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য মশা নির্মূলে বৈজ্ঞানিক উপায় অবলম্বন করা, গবেষণা এবং জনসম্পৃক্ততার তাগিদ দিলেন ড. ছারোয়ার।

দেশে ফাইলেরিয়া ও কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণ করা গেছে উল্লেখ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘কোনো রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকা মানে সেই রোগ নিয়ে কম সতর্ক থাকার সুযোগ নেই। ম্যালেরিয়া নিয়ে ব্যাপক কাজ হয়েছে বলেই রোগটি দেশে ১৩ জেলায় সীমাবদ্ধ।’

ডেঙ্গু ভবিষ্যতে দেশে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে উল্লেখ করে এ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘কোনো দেশে এই রোগ একবার প্রবেশ করলে তা বের হয় না। গত ২৫ বছরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ধারেকাছেও যাওয়া যায়নি। বরং এখন সারা দেশে ছড়িয়ে গেছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সঠিকভাবে কার্যক্রম চালানো হয়নি। এডিস মশা নির্মূল করা গেলে চিকুনগুনিয়াও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। আর জাপানিজ এনকেফালাইটিস মারাত্মক রোগ। মস্তিষ্কে সংক্রমণ ছড়ায় বলে মৃত্যুহার অনেক বেশি।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদ  বলেন, ‘মশা বা মাছি নির্মূলের কাজ স্থানীয় সরকারের। আমরা স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। এসব রোগের প্রকোপ বাড়লে স্বাস্থ্য বিভাগের ওপর চাপ বাড়বে। বাহক বাহিত রোগের বাহক নির্মূলের জন্য শুধু কর্তৃপক্ষ নয়, জনগণেরও দায়িত্ব আছে। জনসম্পৃক্ততা ছাড়া এসব রোগের বাহক ও রোগ নিয়ন্ত্রণ সহজ নয়।’

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়