রবিবার, মে ৩, ২০২৬
spot_img
Homeচট্টগ্রামচট্টগ্রামে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া বাড়ছে, জ্বরের প্রকোপ

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া বাড়ছে, জ্বরের প্রকোপ

প্রাইম ভিশন ডেস্ক »

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। জুন-জুলাইতেই শনাক্ত হয়েছে অর্ধশতাধিক রোগী। প্রতিবছর জুন থেকে অক্টোবর–নভেম্বর পর্যন্ত সময়কে ডেঙ্গুর প্রধান মৌসুম ধরে স্বাস্থ্য বিভাগ। সারা বছর ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেলেও এই সময়টাতে রোগী বেড়ে যায়।

বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজনন হয়। সে হিসেবে বর্ষার শুরু থেকে এবারও ডেঙ্গু রোগী ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে। একই মশার কামড়ে চিকুনগুনিয়া রোগও হয়। এবার চিকুনগুনিয়াও বাড়ছে।

২০২৩-২৪ সালে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর), সিটি করপোরেশন ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সমন্বয়ে একটি জরিপকাজ চলে। এতে চট্টগ্রামে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হিসেবে পাঁচটি এলাকাকে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এগুলো হলো কোতোয়ালি, বাকলিয়া, বায়েজিদ, চকবাজার ও বন্দর এলাকা। ওই জরিপ ধরেই বর্তমানে মশকনিধন কার্যক্রম চলছে। নতুন কোনো গবেষণা এখন আর হয়নি।

চলতি মাসের প্রথম পাঁচ দিনে মোট ডেঙ্গু রোগী মিলেছে ৫০ জন। জুন মাসে মোট ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যায় ১৭৬ জন। চলতি বছর চট্টগ্রামের মোট রোগী ৪৯৫ জন ডেঙ্গু রোগীর প্রায় অর্ধেকই জুন থেকে এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। চলতি বছর মারা গেছে দুজন। ডেঙ্গু বাড়ার আরও বড় প্রমাণ পাওয়া যায় হাসপাতালের ভর্তি তালিকা থেকে। শনিবার মোট ৪৩ জন রোগী ভর্তি ছিল বিভিন্ন হাসপাতালে। অথচ ১৪ জুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিল মাত্র ২২ জন।

সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বৃষ্টি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গু রোগী বাড়তে শুরু করেছে। নগর এবং উপজেলাগুলোতেও ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। সামনের কয়েক মাস এই রোগ নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’

ডেঙ্গু মোকাবিলায় সচেতনতায় জোর দিয়ে চলেছে দুই সংস্থা। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রচারপত্র বিতরণসহ নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সিভিল সার্জন কার্যালয়। এই প্রচারপত্রে ময়লা–আবর্জনা পরিষ্কার রাখা, জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াসহ নানা সচেতনতামূলক বার্তা রয়েছে।

এ ছাড়া সিটি করপোরেশন জনসচেতনতা বাড়াতে এলাকাভিত্তিক প্রচারণা শুরু করেছে। নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত অবকাঠামো বা পণ্য এবং পানি জমে থাকে—এমন সরঞ্জাম অপসারণে এনফোর্সমেন্ট অভিযানও শুরু করবে বলে করপোরেশন সূত্র জানায়। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানান মেয়র শাহাদাত হোসেন।

এ ছাড়া সিটি করপোরেশন নগরের আলকরণে সদরঘাট জেনারেল হাসপাতালে বিনা মূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে।

চলতি মৌসুমে কোভিড, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা- এ চার ধরনের রোগী বেড়েছে চট্টগ্রামে। এরমধ্যে প্রকোপ বেশি চিকুনগুনিয়ার।

প্রতিদিনই নগরীর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রোগীরা ভিড় করছেন জ্বর, জয়েন্টে ব্যথা ও লালচে র‌্যাশ নিয়ে।নগরীর বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে এমন শত শত রোগীর দেখা মিলছে। শরীরে জ্বর, জয়েন্টে তীব্র ব্যথা, শরীরে র‌্যাশ, প্রায় উপসর্গ এক। তবে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা না কোভিড, তা বোঝার উপায় নেই।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. আবদুর রব বলেন, ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া দুটোই এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। উপসর্গ এক হলেও চিকুনগুনিয়ায় জয়েন্ট ফুলে যায়, ডেঙ্গুতে তেমন হয় না। কিন্তু পরীক্ষা না থাকলে রোগ বোঝা যায় না।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন বলেন, সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত এলে আমরাও চিকুনগুনিয়া পরীক্ষা করতে পারব। যেহেতু সরকারি প্রতিষ্ঠান, তাই সরকারের সিদ্ধান্ত ছাড়া কোন কিছু করার সুযোগ নেই।

চিকিৎসকদের পরামর্শ:

উপসর্গ একই হওয়ায় অনেক সময় ভুল চিকিৎসা হচ্ছে। প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য ওষুধ না খাওয়ার পরামর্শ দিলেও অনেকেই এন্টিবায়োটিক, ব্যথানাশক খেয়ে পরিস্থিতি খারাপ করে ফেলছেন।

চমেক হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আবুল ফয়সাল মো. নুরুদ্দীন চৌধুরী বলেন, এ মৌসুমে একসঙ্গে এত রোগের প্রকোপ আগে কখনও দেখা যায়নি। উপসর্গ প্রায় এক হওয়ায় রোগ নির্ণয় ছাড়া ওষুধ দেওয়া বিপজ্জনক। এর ফলে অনেকে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া-ইনফ্লুয়েঞ্জা একসঙ্গে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাই পরীক্ষা ছাড়া ওষুধ নয়।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বর্ষার পানি জমে থাকায় এডিস মশার প্রজনন বাড়ছে। এতে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি বাড়বে। তাই সবার সতর্ক থাকা জরুরি।

ডেঙ্গু না চিকুনগুনিয়া

চিকিৎসকেরা জানান, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া এডিস মশার কামড়ে হয়। দুই ধরনের জ্বরেই শরীরে ব্যথা হয়। তবে চিকুনগুনিয়ার ব্যথা মারাত্মক হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যথা ১০ দিন থেকে এক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এবার চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ এক মাস ধরে বেশি বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।

চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে ব্যথা বেশি হওয়ায় রোগীর নড়তেচড়তে কষ্ট হয়। চিকুনগুনিয়ায় শরীরে র‍্যাশও দেখা দেয়।

আর ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও তীব্র জ্বরের পাশাপাশি শরীর ব্যথা থাকে। এ ক্ষেত্রে রক্তে অণুচক্রিকা বা প্লাটিলেট কমে যায়। জ্বর আসার তিন দিনের দিন পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। তবে চিকুনগুনিয়া কি না, তা জানতে এক সপ্তাহ পর অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করতে হয়। এই পরীক্ষায় অনেক সময় তা শনাক্ত করা যায় না।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আবদুস সাত্তার  বলেন, এবার এখন পর্যন্ত চিকুনগুনিয়ার রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এতে শরীরে তীব্র ব্যথা থাকে, বিশেষ করে জয়েন্টে। এই ব্যথা অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী হয়। শরীরে র‍্যাশও আসে। তবে ডেঙ্গুও হচ্ছে। ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট এবং রক্তচাপ কমে জীবনের ঝুঁকি দেখা দেয়। চিকুনগুনিয়ায় সেই ঝুঁকি নেই।

তিনি আরও জানান, ২০১৭ সালেও চিকুনগুনিয়া রোগী বেশি দেখা গিয়েছিল। সে বছর ডেঙ্গু রোগী কম ছিল। তবে যে জ্বরই হোক না কেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

এই দুই জ্বরের পাশাপাশি সাধারণ ভাইরাস জ্বর এবং করোনাও হচ্ছে বলে চিকিৎসকেরা জানান।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়