প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম সুড়ঙ্গপথ কর্ণফুলী টানেল চালুর দুই বছর পার হলেও এখনো প্রত্যাশিত যান চলাচল করতে পারছে না। চীনের অর্থায়নে প্রায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই টানেল দিয়ে বর্তমানে যে পরিমাণ গাড়ি চলছে, তা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার এক-সপ্তমাংশেরও কম। ফলে টানেল থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে দৈনন্দিন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৭ লাখ টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে।
এই লোকসান কমাতে এবং টানেলের ব্যবহার বাড়াতে সরকার একের পর এক নতুন অবকাঠামো প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার তিনটি বড় সড়ক প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ৪৬৩ কোটি টাকার একটি সংযোগ সড়ক প্রকল্প আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদনের জন্য তোলা হচ্ছে।
পরিকল্পনা বিভাগ সূত্র জানায়, একনেকের অনুমোদন পেলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (আরএইচডি) আগামী তিন বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আজ একনেকে উঠতে যাওয়া প্রকল্পটি হলো কর্ণফুলী টানেলের আনোয়ারা প্রান্ত থেকে চন্দনাইশের গাছবাড়ি পর্যন্ত ২১.১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সংযোগ সড়ক নির্মাণ। সড়কটি হবে ১০.৩০ মিটার প্রশস্ত এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে। অনুমোদন মিললে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর আগামী তিন বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের দাবি, এই সড়ক হলে কক্সবাজারগামী যানবাহনকে আর শিকলবাহা ক্রসিং-বিজিসি ট্রাস্ট-গাছবাড়িয়া সড়ক ব্যবহার করতে হবে না।
যাত্রাপথ কমবে প্রায় ১৭ কিলোমিটার, সময় বাঁচবে ৩০ মিনিট। টানেলের ব্যবহার বাড়বে, শাহ আমানত সেতুর ওপর চাপ কমবে, চট্টগ্রাম নগরীর যানজটও কিছুটা কমবে।
পরিকল্পনা কমিশন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রশ্ন তুলেছেন, টানেল নির্মাণের সময় এই সংযোগ সড়ক কেন ছিল না? এত বড় একটি অবকাঠামো প্রকল্প নেওয়ার সময় কি ব্যবহারযোগ্যতা ও সংযোগ সড়ক নিয়ে যথাযথ পরিকল্পনা করা হয়নি?
টানেল নির্মাণের সময়কার সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ২৮ হাজার ৩০৫টি যান চলাচলের কথা ছিল। বাস্তবে বর্তমানে চলছে মাত্র তিন হাজার ৮৭০টি যান। এর মধ্যে ৭৬ শতাংশ হালকা যান, বাস মাত্র ১০ শতাংশ, ট্রাক ১২ শতাংশ এবং বড় ট্রেইলার এক শতাংশেরও কম।
ফলে প্রতিদিন টানেল থেকে আয় হচ্ছে গড়ে ১০ লাখ ৭৪ হাজার টাকা, অথচ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৩৭ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ চালু রেখেই প্রতিদিন লোকসান বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় ৪৬৩ কোটি টাকার সংযোগ সড়কই শেষ কথা নয়। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এরই মধ্যে আনোয়ারা-বাঁশখালী-তোইতং-পেকুয়া-বদরখালী-চকরিয়া (ঈদমানি) আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্তকরণের প্রস্তাব দিয়েছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় এক হাজার ২৮৯ কোটি টাকা। উদ্দেশ্য একটাই—টানেলের দিকে আরো বেশি যান টেনে আনা। এর বাইরেও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ কর্ণফুলী টানেলের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে আরো বড় পরিকল্পনা সামনে এনেছে। চট্টগ্রামের মিরসরাই শিল্পনগরী থেকে আনোয়ারা-বাঁশখালী হয়ে পেকুয়া, মাতারবাড়ী ও কক্সবাজার পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ‘মেরিন ড্রাইভ’ নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থায়ন এখনো অনিশ্চিত।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি একটি ক্লাসিক ‘প্ল্যানিং ফেলিওর’-এর উদাহরণ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম মনে করেন, টানেল নির্মাণের সময় শিল্পাঞ্চল, সমুদ্রবন্দর ও পর্যটন রুটের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত না করায় আজ এই সংকট তৈরি হয়েছে। এখন সেই ঘাটতি পুষিয়ে নিতে নতুন করে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আজ একনেকে উঠছে ৪৬ হাজার কোটি টাকার আরো ২২ প্রকল্প : একনেক সভায় আজ মঙ্গলবার অনুমোদন পেতে যাচ্ছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ২২টি উন্নয়ন প্রকল্প। সভায় অনুমোদনের জন্য ২০টি প্রকল্প তালিকাভুক্ত থাকলেও আরো দুটি নতুন প্রকল্প সরাসরি টেবিলে উপস্থাপন করা হবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ৪২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা, যার মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৩০ হাজার ৪৮৯ কোটি ৩৫ লাখ, সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ১৪ হাজার ২৪৭ কোটি ৫৬ লাখ এবং বৈদেশিক অর্থায়ন এক হাজার ৬৮৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা। বৈদেশিক অর্থায়নের মধ্যে ঋণ এক হাজার ৫০৮ কোটি ৪২ লাখ এবং অনুদান ১৮১ কোটি ১৯ লাখ টাকা।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আজ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সপ্তম এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮তম সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন প্রধান উপদেষ্টা ও একনেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূস।


