প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নতুন করে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও জাতীয় নেতাদের উত্তরসূরিদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি বিস্তৃত করছে। দলীয় সূত্র বলছে, বর্তমানে শুধু সদস্য সংগ্রহ নয়, বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবার, আন্দোলনভিত্তিক সংগঠন এবং সাবেক রাজনৈতিক নেতাদের এক প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টা চলছে। এর মাধ্যমে দলটি জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করতে চাইছে।
দলটির এই সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে গতকাল মঙ্গলবার এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছোট ছেলে ড. মোহাম্মদ নাদিমুর রহমান, ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা হাজি শরীয়তুল্লাহর বংশধর আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হোসাইন, গাজীপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক এম এ এইচ আরিফ এবং ‘ওয়ারিয়র্স অব জুলাই’-এর সদস্যরা। রাজধানীর বাংলামোটরে দলের অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁরা এনসিপিতে যুক্ত হন।
দলীয় সূত্র বলছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়ের এসব ব্যক্তির যোগদান এনসিপির পরিসর ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর কৌশলের অংশ। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।
নতুন যোগদানকারীদের মধ্যে মোহাম্মদ নাদিমুর রহমান বর্তমানে তুরস্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকায় গতকাল সশরীরে যোগদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি অনলাইনে যুক্ত ছিলেন। অন্যদিকে ‘ওয়ারিয়র্স অব জুলাই’-এর সদস্যদের মধ্যে প্রায় ৫০ জন যোগদান অনুষ্ঠানে ছিলেন। তাঁদের দাবি, সংগঠনটির প্রায় ৪ হাজার সদস্য এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন।
গত ২৪ এপ্রিল এনসিপিতে যোগ দেন বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ইসহাক সরকার, অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি ফেরসামিন হক ইকবাল (ফ্লোরা), কনটেন্ট ক্রিয়েটর নুরুজ্জামান কাফি ও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রেলের অনিয়ম নিয়ে আন্দোলন করে আলোচনায় আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন রনি।
এনসিপির বিস্তৃতি প্রসঙ্গে দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, এনসিপিতে সবাই সম্ভাবনা দেখছেন। এ জন্য যুক্ত হচ্ছেন।
অন্য দল থেকেও এনসিপিতে আসছেন অনেকে। যাঁরা দেশপ্রেমী এবং সংস্কার-পন্থী, তাঁরা এনসিপিতে আসতে চাইলে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তাঁদের নিতে আমাদের কোনো আপত্তি নাই।’
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্যের সন্তানও এনসিপিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করছেন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র নির্বাচন করে দল থেকে বহিষ্কার হওয়া বিএনপির ঢাকা মহানগরীর একজন সাবেক নেতার সঙ্গেও এনসিপির যোগাযোগ হচ্ছে। যদিও এসব বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবে রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মনজুর আলমও এনসিপিতে যোগ দিতে পারেন বলে শোনা হচ্ছে। এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপি মূলত তিনটি কৌশলে নিজেদের বিস্তার ঘটাচ্ছে—নতুন করে দলভুক্তি বাড়ানো, সহযোগী সংগঠন যুক্ত করা ও চব্বিশের আন্দোলনের ধারাবাহিকতাকে কেন্দ্র করে তরুণ প্রজন্মকে সংগঠিত করা।
দলটির নেতারা মনে করছেন, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে এনসিপি একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জায়গা করে নিতে পারবে।
তবে বামপন্থীদের কোণঠাসা করে দলে ডানপন্থীদের উত্থান হচ্ছে, এ রকম একটি আলোচনাও রাজনৈতিক মহলে রয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন সাবেক শিবির নেতার এনসিপিতে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে এই আলোচনা নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা মধ্যমপন্থী। ডান, বাম সকলেই আছে এখানে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সামাজিক আন্দোলনকর্মী যাঁরা দেশের পরিবর্তন চাচ্ছেন, যাঁদের সঙ্গে কোনো দুর্নীতি, অস্ত্রবাজি, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির ব্যাপার নাই, আমরা তাঁদের জায়গা করে দিচ্ছি।’
ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগেরও বাধা নেই
এনসিপির নেতারা বলছেন, ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগের অথবা ‘এই ঘরানার’ নিষ্কলুষ নেতারাও এনসিপিতে যুক্ত হতে পারেন। এ বিষয়ে সারোয়ার তুষার বলেন, যাঁরা ছাত্রলীগের মধ্যে গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলেন, যাঁদের বিষয়ে কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই, তাঁরা এনসিপিতে যুক্ত হতে পারেন।
একই কথা জানান হান্নান মাসউদ। তিনি বলেন, ‘ব্যাপারটা হচ্ছে, অত্যাচারী কাউকে আমরা যুক্ত করব না। সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ কাউকে আমরা নিব না। সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজের বাইরে যাঁরা আছেন, তাঁদেরকে আমরা স্বাগত জানাই।’


