প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
চট্টগ্রাম নগরে পশুর বড় হাট গুলো সংকুচিত হয়ে আসছে । পাঁচ বছর আগে বড় বিসৃত এলাকা জুড়ে পশুর হাট বসলেও এখন তা দেখা মিলে না। বাজার সংকুচিত হওয়ার সাথে কমেছে ক্রেতাদের উপস্থিতিও।
জানা গেছে, চট্টগ্রামের সাগরিকা পশুর হাট দেশ জুড়ে নাম-ডাক ছিল। ২০১৭-১৮ সালের দিকেও সাগরিকার পশুর হাটের বাহিরে চারপাশে এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বাজার বসত। আশে-পাশে খালি জায়গাগুলোতেও রাখা হত পশু।
দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে বেপারিরা খাইন (পশু বাধার জায়গা) ভাড়া নিয়ে কোরবান উপলক্ষে বেচা-বিক্রি করতো। এ বাজারে পশুর ক্রেতার সঙ্গে উৎসুক জনতা ভিড় করতো।
রবিবার (২৪ মে ) বেলা ১২ টায় সাগরিকা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, আগের মত সেই হাক-ডাক আর নেই। খাইনে বাধা গরু আর রাখাল শ্রমিকদের দেখা গেলেও ক্রেতার দেখা মেলেনি।
এক ঘন্টা ওই বাজারে ঘুরাঘুরি করে দেখা যায়, সাগরিকা সড়কের দুই পাশে গরু বাধার খুটি স্থাপন করা হয়েছে কিন্তু সেখানে গরু নাই। বাজারে প্রবেশ করলে কয়েকটি ট্রাক থেকে গরু নামাতে দেখা যায়। সাগরিকা বাজারের উত্তর পাশে সাগরিকা শীল্প এলাকায় প্রবেশের ওই সড়কেও এক সময় পশু দেখা যেত। এখন সেখানে বাস-ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এছাড়াও উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বপাশে খালি পড়ে থাকার শীল্প প্লট গুলোতেও পশুর দেখা মিলে নাই।
সাগরিকা বাজারে কথা হয় আগ্রাবাদ এলাকার মো. আবুল হাসেমের সঙ্গে। তিনি ২০০০ সাল থেকে এ বাজারে আসতেন। কখনো গরু কেনার জন্য আবার কখনো বাজার দেখার জন্য আসতেন।
তিনি খবরের কাগজকে বলেন, গত পাঁচ বছর থেকে এ সাগরিকা বাজার ধীরে ধীরে যৌবন হারিয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৭ মে) পবিত্র ঈদুল আজহা হলেও বাকি আছে মাত্র তিন দিন। এ সময়ে বাজারে গরু বিক্রির ধুম ও গরুতে বাজার ভরপুর থাকার কথা। কিন্তু আজ এসে দেখছি এখানে খাইন গুলো ফাঁকা। আমি বাজার দেখার জন্য এসেছি। গত বছরও কিছুটা চাপ দেখা গেলেও এবছর তাও নেই।
উনার কথার মিল পাওয়া যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা বেপারি আবদুর রহিমের মুখেও। তিনি গত বুধবার একটি খাইন ভাড়া নিয়ে ৪০ টি গরু তুলেছেন। এখনো একটি গরুও বিক্রি করতে পারেননি।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আগামীতে আর গরু নিয়ে এখানে আসবো কিনা জানিনা। গরু বিক্রি না হলে পুঁজিসহ হারাতে হবে। দীর্ঘ দশ বছর ধরে সাগরিকা বাজারে গরু বিক্রি করতে আসি। এমন পরিস্থিতি আগে কখনো হয়নি।
বাজারের ইজারাদার মোহাম্মদ আরিফ বলেন, আট কোটি টাকায় বাজারটি ইজারা নেওয়া হয়েছে। এ টাকা তুলতে পারবো কিনা আমি শষ্কায় রয়েছি। বাজারে গরু ও ক্রেতা আশানুরূপ হচ্ছে না।
চট্টগ্রামের অন্য আরেকটি স্থায়ী পশুর হাট বিবির হাট বাজার। ষোলশহর মুরাদপুর থেকে অক্সিজেন যাওয়ার পথে রেল বিটের পরে হাতের বাম পাশে এ বাজারের অবস্থান।
সকাল ১০টায় এ বাজার ঘুরে দেখা যায় বাজারের ভিতরে প্রতিটি খাইনে গরু বাধা রয়েছে। কিন্তু ক্রেতার উপস্থিতি নেই। ইজারাদারের দপ্তর থেকে মাইকে বার বার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে হাসিল না দিয়ে যাতে কেউ না যায়। হাসিল না দিলে কোরবানি শুদ্ধ হবে না। এক সময় বিবির হাট বাজারের বিপরীতে জামিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসার মাঠে ও রেলবিটে গরুর হাট বসতো। এখন তা দেখা যায় নি।
মুরাদপুর হোটেল জামানের ম্যানেজার মো. নাছির উদ্দিন বলেন, এক সময় কোরবানিকে কেন্দ্র করে বিবির হাটের পশুর বাজার ষোলশহর, ২নং গেইট থেকে বহদ্দারহাট মোড় এবং অক্সিজিনের দিকে আতুড়ার ডিপো পর্যন্ত বিসৃত ছিল। এখন শুধু বিবির হাটের ভিতরে গরুর বাজার সীমাবদ্ধ। গরুর বাজারকে কেন্দ্র করে আমাদের হোটেলের খাবার বেচা-বিক্রি বেড়ে যেত এখন সেটিও নেই।
রবিবার (২৪ মে) বেলা ১১ টায় সরেজমিনে দেখা যায় ত্রিপলের ছাউনি দিয়ে খাইন তৈরি করা হয়ে হয়েছে। খাইনগুলোও অনেকটা ফাঁকা দেখা যায়।
স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর আগেও ইলিয়াস ব্রাদার্সের বাড়ি থেকে বাকলিয়া আবাসিক এলাকার উত্তর পাশ পর্যন্ত বিসৃত এলাকা জুড়ে পশুর হাট বসতো। দূর-দুরন্ত থেকে ক্রেতারা এসে পশু ক্রয় করে নিয়ে যেত। এখন ক্রেতাদের তেমন আর আনাগোনা নাই।
পশুর হাট সংকুচিত হওয়ার কারণ:
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে জানা যায়, চট্টগ্রামে জেলা উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার এগ্রো ফার্ম রয়েছে। এসব এগ্রো ফার্ম নিজেরা অনলাইনে এবং অফলাইনে গরু বিক্রি করছে। যা সরকারের ইজারাভুক্ত বাজারে তোলা হয় না। ছোট-বড় বিভিন্ন শিল্প গ্রুপেরও এগ্রো ফার্ম রয়েছে। চট্টগ্রাম নগরে প্রায় পাঁচশতাধীক এগ্রো ফার্ম নিজস্ব খামারে বা খামার থেকে গরু এনে নিজের জায়গায় বিক্রি করছে।
এশিয়ান গ্রুপের গামেন্টর্স ব্যবসার পাশাপাশি ২০১৬ সালে এশিয়ান এগ্রো নামে এগ্রো শিল্পে আসে প্রতিষ্ঠানটি। নগরের বায়েজিদ এলাকায় এশিয়ান গ্রুপের শিল্পপ্লটে বিক্রি হচ্ছে গরু। এখান থেকে তারা ১৫০টি গরু বিক্রি করছে। মার্কেট থেকে ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা সংগ্রহের টার্গেট রয়েছে এশিয়ান এগ্রোর।
বায়জিদ থানা সড়কের এর আর একটু দক্ষিণ পাশে চৌধুরী র্যাংক । চৌধুরী গার্মেন্টেসের মাঠে বিক্রি হচ্ছে গরু। হাটহাজারি থেকে গরু এনে বিক্রি করছে।
এগ্রোর মালিক রশিদ চৌধুরী বলেন, তারা এবার কোরবানিতে ২০০টি গরু বিক্রি করে প্রায় ৫ থেকে ৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে প্রতিষ্ঠানটি। বায়জিদ সড়কের পাশে অপর একটি প্রতিষ্ঠান ইউনিক্যাম এগ্রো লিমিটেড। সড়কের পাশে হওয়ায় প্রতিদিন ক্রেতার ভিড় করছে। সেখানেই লালনপালন হচ্ছে গরু। গার্মেন্টস শিল্প প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এগ্রো ফার্ম। ৮০০ থেকে এক হাজার কেজি ওজনের থেকে শুরু করে সর্বনিম্ম ৫০০ কেজি ওজানের গরু রয়েছে খামারে। ১৫০ থেকে ২০০ গরু বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে। এটির মালিক বিজিএমইএ নেতা রাকিবুল আলম চৌধরীর।
তিনি বলেন, নিজস্ব খামারে প্রস্তুত করা অর্গানিক পশু বিক্রি করছি। গরু কিনে এখানে রেখে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে ক্রেতাদের। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনেকে পশু কিনে রেখে যাচ্ছে। এসব পশু কোরবানের আগের দিন ক্রেতাদের বাসার ঠিকানায় পাঠেয়ে দেওয়া হবে ।
ওয়েল গ্রুপ কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকায় ও নগরের কাজির দেউড়ি এলাকায় প্যান্ডেল সাজিয়ে গরু বিক্রি শুরু করেছে শেঠ এগ্রো। নগরের দক্ষিণ হালিশহর এলাকায় ইসহাক ডিপোর পাশে দুইশত থেকে আড়াইশত গরু বিক্রির জন্য সেল সেন্টার করেছে ইনফিনিটি গ্রুপ অব কোম্পানিজ এর ইনফিনিটি মডার্ন এগ্রো লিমিটেড।
শিল্পগ্রুপ পাশাপাশি এগ্রো খাতে এলেও সরকার এসব কোম্পানি থেকে কোন ধরণের রাজস্ব পায় না। এগ্রো ফার্ম থেকে গরু কিনায় স্থানীয়রা আর গরু বাজারে আসে না। এগ্রো খামারে গরু বিক্রি হওয়ায় বাজারেও কোরবানীর পশুর সংখ্যা কমে গেছে। তাই বাজারও সংকুচিত হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


