প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
গড়পড়তা। লিওনেল মেসিকে বর্ণনা করতে এই বিশেষণটি কেউই ব্যবহার করতে চাইবেন না। কিন্তু পেনাল্টি স্পটের সামনে দাঁড়ালে এই আর্জেন্টাইন জাদুকরের মধ্যে যেন বিশেষ কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের জয়ের ম্যাচটি ধরলে, বিশ্বকাপের মূল সময়ে নেওয়া মোট সাত পেনাল্টির মধ্যে তিনবারই গোল করতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। চার বছর আগে তার শট রুখে দিয়েছিলেন পোল্যান্ডের ভয়চেখ সেজনি। আর ২০১৮ সালে তার সামনে নিরেট দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আইসল্যান্ডের গোলরক্ষক হ্যানেস থর হ্যালডরসন।
মেসির পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে দেখা যায়, মোট ৩১টি পেনাল্টি শট নিয়ে তিনি গোল পেয়েছেন ২৫ বার। ক্লাব ফুটবলের হিসাব যোগ করলে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ১৪৯ পেনাল্টিতে ১১৬ গোল। অর্থাৎ তার সাফল্যের হার ৭৭ শতাংশ—এলিট ফুটবলারদের গড়ের চেয়ে খানিকটা কম।
যুক্তি দিয়ে এই হিসেব মেলানো কঠিন। মেসিকে বলা হয় সর্বকালের সেরা। রেকর্ড আটটি ব্যালন ডি’অর, চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি আর একটি বিশ্বকাপ শিরোপা সেই সাক্ষ্যই দেয়।
মেসি নিজে গোল করেন, সতীর্থদের দিয়ে গোল করান। মাঠে নিখুঁত জায়গা খুঁজে নিয়ে বল পাস দেওয়ায় তার সমকক্ষ কেউ নেই। ভবিষ্যতেও কোনো ফুটবলার তার জাদুকরী বাঁ পায়ের ধারেকাছে যেতে পারবে বলে মনে হয় না।
তাহলে সবচেয়ে সহজ সুযোগটি কাজে লাগানোর বেলায়, পরিসংখ্যানের বিচারে, তিনি এতটা সাধারণ হয়ে যান কেন?
একটি প্রচলিত হলো—মেসি বাঁ-পায়ের খেলোয়াড় বলেই এমনটা হয়। অনেকেই মনে করেন, পেনাল্টি শুটার হিসেবে ডান পায়ের খেলোয়াড়রাই বেশি নির্ভরযোগ্য। তবে পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। আসল ব্যাপার হলো, ফুটবলে বাঁ-পায়ের খেলোয়াড়ের সংখ্যা এমনিতেই কম (প্রতি পাঁচজনে প্রায় একজন)। তাই স্বভাবতই তারা পেনাল্টিও কম নেন। উল্টো বিরল হওয়ার কারণে তারা একটি বাড়তি সুবিধাও পান—গোলরক্ষকদের জন্য বাঁ-পায়ের খেলোয়াড়দের শটের দিক আগে থেকে অনুমান করা বেশ কঠিন।
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই পেনাল্টি নিয়ে আসছেন মেসি। ২০০৫ সালের অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের ফাইনালে তার নেওয়া দুটি স্পট-কিকের কল্যাণেই নাইজেরিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেবার অবলীলায় দুটি শটই জালে জড়িয়েছিলেন তিনি। প্রথম বলটি গড়িয়ে দিয়েছিলেন পোস্টের বাঁ দিকের নিচের কর্নারে, দ্বিতীয়বার বেছে নিয়েছিলেন উল্টো দিক। গোলরক্ষক দুবারই ডাইভ দিয়েছিলেন ভুল দিকে।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে পেনাল্টি শুটআউটে তিনি প্রথম শট নিয়েছেন মোট নয়বার। এর মধ্যে সাতটিতেই বল পাঠিয়েছেন জালে। মিস করেছেন মাত্র দুবার এবং দুবারই কোপা আমেরিকায়। প্রথমবার ২০১৬ সালে, যেবার ফাইনালে চিলির কাছে হেরেছিলেন তারা। দ্বিতীয়বার ২০২৪ সালে, যখন সেমিফাইনালে ইকুয়েডরকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করেছিল আর্জেন্টিনা।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি মিসের পেছনে যেমন কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে, তেমনি তার শট নেওয়ার সার্বিক কৌশল নিয়েও রয়েছে বিস্তর সমালোচনা।
টেক্সাসের আর্লিংটনে স্নায়ু আর বুদ্ধির রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে মেসি হেরে যান গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগারের কাছে। লাউতারো মার্তিনেসকে স্তেফান পোশ ফাউল করার পর ভিএআর-এর সিদ্ধান্তে পেনাল্টির বাঁশি বাজে। ফলে কীভাবে শট নেবেন, তা ভেবে দেখার জন্য পুরো পাঁচ মিনিটেরও বেশি সময় পেয়েছিলেন মেসি।
ছোট একটি রানআপ নিয়ে দৌড় শুরু করেছিলেন। কিন্তু শেষ দু-কদমে এসে আচমকাই গতি কমিয়ে আনেন তিনি। উদ্দেশ্য, শ্লাগারকে ধোঁকা দিয়ে আগেভাগেই ডাইভ দিতে বাধ্য করা। কিন্তু অস্ট্রিয়ান গোলরক্ষক নিজের জায়গায় অনড় ছিলেন। দুই হাত প্রসারিত করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলেন তিনি। বলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পুরোটা সময় শ্লাগারের চোখে চোখ আটকে ছিল মেসির। শ্লাগার ডাইভ দিলেন একেবারে শেষ মুহূর্তে। কিন্তু ততক্ষণে মেসিকে বিভ্রান্ত করার আসল কাজটা তিনি সেরে ফেলেছেন। ফলশ্রুতিতে ডান পোস্টের বেশ খানিকটা বাইরে দিয়ে অদ্ভুত ইনস্টেপ শট মেরে বসেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের কাছে ওই পেনাল্টি প্রসঙ্গে মেসি বলেন, ‘নিজের ওপর খুব রাগ হচ্ছিল। খুব বাজে একটা শট নিয়েছিলাম।’ ঘটনাটি ঘটেছে ম্যাচের একদম শুরুতে, মাত্র আট মিনিটের মাথায়। এর আগে মেসি বল পায়ে পেয়েছিলেন সাকল্যে তিনবার। গোলমুখে কোনো শট নেওয়াই হয়নি।
দি অ্যাথলেটিক-এর পেনাল্টি বিশেষজ্ঞ গেইর জর্ডেটের ব্যাখ্যাটা এ রকম—’গোলরক্ষকের মুভমেন্টের ওপর নির্ভর করে যারা পেনাল্টি নেন, তাদের ব্যাপারে গোলরক্ষকরা এখন কতটা সচেতন, এটি তারই আরেকটা নিখুঁত উদাহরণ।’
পেনাল্টি নেওয়ার এই বিশেষ রান-আপ কৌশলের মূল কথাই হলো গোলরক্ষকের দিকে চোখ রাখা। গোলরক্ষক কোন দিকে ডাইভ দিচ্ছেন, সেটা দেখে শেষ মুহূর্তে বলের দিক নির্ধারণ করা। এই কৌশলের জন্য জর্জিনহো বা রবার্ট লেভানডভস্কি বিখ্যাত। হালে হ্যারি কেনও এই দলে নাম লিখিয়েছেন।
জর্ডেট আরও বলেন, ‘এসব ক্ষেত্রে গোলরক্ষক ঠিক কোন দিকে ঝাঁপ দেবেন, তা নিশ্চিত না হয়েই মেসিকে শট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যেহেতু তার চোখ আটকে থাকে গোলরক্ষকের দিকে, তাই স্বাভাবিকভাবেই বলের ওপর থেকে তার নজর সরে যায়। ফলে শটের নিখুঁত নিশানায় কিছুটা হলেও গড়বড় হবেই।
‘আমার ধারণা, শট নেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে মেসি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি যেদিকে বল পাঠাতে চাইছেন, শ্লাগারও ঠিক সেই দিকেই ঝাঁপ দিচ্ছেন। কিন্তু শটের দিক পরিবর্তনের আর কোনো উপায় ছিল না। তখন মেসি হয়তো মরিয়া হয়ে বলটা পোস্টের একেবারে কোণ ঘেঁষে মারার চেষ্টা করেছিলেন, আর সেটাই শেষমেশ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বাইরে চলে যায়।’
ওপেন প্লে-তে যে অসামান্য উদ্ভাবনী ক্ষমতার কারণে মেসি সবার চেয়ে আলাদা, ঠিক সেই জিনিসটাই হয়তো পেনাল্টির সময় তার বিপক্ষে কাজ করে! পেনাল্টি নেওয়ার ক্ষেত্রে তার ধরাবাঁধা কোনো কৌশল বা নির্দিষ্ট কোনো স্পট নেই। যেমন হ্যারি কেনের ট্রেডমার্ক হলো গোলরক্ষকের পাশ ঘেঁষে মাঝ-উচ্চতায় নেওয়া প্রচণ্ড গতির শট। অন্যদিকে মেসি কখনো ইনস্টেপ, আবার কখনো বুটের লেসের অংশ দিয়ে শট নিয়ে থাকেন।
গত বিশ্বকাপে নিজের নেওয়া সাতটি পেনাল্টির ছয়টিতেই গোল করেছিলেন মেসি। এর মধ্যে নেদারল্যান্ডস (কোয়ার্টার ফাইনাল) ও ফ্রান্সের (ফাইনাল) বিপক্ষে টাইব্রেকারে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শটও ছিল। মজার ব্যাপার হলো, ওই দুই ম্যাচেই নির্ধারিত সময়ে পেনাল্টি থেকে গোল পেয়েছিলেন তিনি। সেখানে তিনি আন্দ্রেস নোপার্ট ও হুগো লরিসকে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে রেখেছিলেন। টাইব্রেকারে শট নেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে বল পাঠিয়েছিলেন ঠিক উল্টো দিকে।
‘লরিসের বিপক্ষে কোথায় শট নেব, সেটা নিয়ে আমি মাথা ঘামাইনি। আমার লক্ষ্য ছিল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করা। আমি ওর জন্য অপেক্ষা করেছি, ও নড়েছে, কিন্তু আমি শান্ত থেকেছি,’ বলেছিলেন মেসি।
এই ‘গোলরক্ষক-নির্ভর’ পদ্ধতিতে পেনাল্টির মধ্যেও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে প্রথম গোল করার সময় মেসি হেঁটেছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে। রাউন্ড অভ সিক্সটিন আর কোয়ার্টার ফাইনালে যে গোলরক্ষকের বীরত্বে টাইব্রেকারে জিতেছিল ক্রোয়েশিয়া, সেই দমিনিক লিভাকোভিচকে যেন পাত্তাই দেননি তিনি। লিভাকোভিচ ঠিক দিকেই ডাইভ দিয়েছিলেন। কিন্তু শটের প্রচণ্ড গতি আর উচ্চতার কাছে পরাস্ত হন তিনি; বল গিয়ে সোজা আছড়ে পড়ে জালের একেবারে ওপরের ছাদে।
টুর্নামেন্টের শুরুর দিকে ঠিক একই ধরনের একটি পেনাল্টি শট রুখে দিয়েছিলেন ভয়চেখ সেজনি। তা সত্ত্বেও মেসি আবার সেই একই ঝুঁকি নিলেন। অন্য খেলোয়াড়রা যেখানে চর্চিত ছক আর অভ্যস্ত নিয়মের ওপর ভরসা রাখেন, সেখানে মেসি শট নেওয়ার ধরন বেছে নেন একেবারে শেষ মুহূর্তের উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে। এই কারণেই শ্লাগারের মতো পেনাল্টি ঠেকানোতে পটু গোলরক্ষককে বুদ্ধির খেলায় হারানোর আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছিলেন তিনি। চলতি মৌসুমেই ইউরোপা লিগে দুটি পেনাল্টি সেভ করার রেকর্ড ছিল এই অস্ট্রিয়ানের।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ছোট আর ধীরগতির রান-আপ নিয়ে নিচু শট নিতেন মেসি। অনেকটা সাধারণ পাসের মতোই বল পাঠিয়ে দিতেন দূরের কর্নারে। চার-চারটি পেনাল্টি মিস করার পরও এই একই কৌশল ধরে রেখেছিলেন তিনি। রেফারির বাঁশি বাজার পরপরই দ্রুত শট নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে তার। গবেষণায় দেখা গেছে, এভাবে তাড়াহুড়ো করে নেওয়া শটে সাফল্যের হার বেশ কম। আর একে মূলত স্নায়ুচাপেরই লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়।
২০১২ সাল—মেসির ৯১ গোলের বছর। সেবার ১৭ পেনাল্টির মধ্যে ১৪টিতে জালের দেখা পেয়েছিলেন তিনি। ওই সময়টাতেই রান-আপের শেষ মুহূর্তে এসে আচমকা গতি কমিয়ে আনার কৌশল ব্যবহার শুরু করেন মেসি। এরপর থেকে তার জোরালো আর উঁচু শটগুলো নিয়মিত দৃশ্য হয়ে ওঠে, বিশেষ করে ডানদিকে। বেশিরভাগ খেলোয়াড়ের মতোই এই শটগুলোর দিক আগে থেকে অনুমান করা গোলরক্ষকদের জন্য সহজ ছিল। তাই গোল করতে হলে পুরোপুরি শটের গতির ওপরই নির্ভর করতে হতো তাকে।
২০১৫ সালে এসে তিনি শুরু করলেন আলতো চিপ করে পেনাল্টি নেওয়া—ফুটবলের ভাষায় যার নাম ‘পানেনকা’। এই শটের উদ্ভাবক আন্তোনিন পানেনকা স্বয়ং মেসির এই কৌশলের প্রশংসা করেছিলেন।
যে বছরগুলোতে মেসি একাধিক পেনাল্টি নিয়েছেন, তার প্রতিটিতেই অন্তত একটি করে মিস করেছেন তিনি। দু-বছর আগে কোপা আমেরিকায় ইকুয়েডরের বিপক্ষে একটি পানেনকা শট মারতে গিয়ে বল লাগিয়েছিলেন ক্রসবারে। আর গত সেপ্টেম্বরে তার এই একই কৌশলকে রীতিমতো হাস্যকর বানিয়ে ছেড়েছিলেন শার্লট এফসির গোলরক্ষক ক্রিস্টিজান কাহলিনা। শট ঠেকানোর জন্য কোনো ডাইভ না দিয়ে তিনি স্রেফ নিজের জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন!
তবু তিনি লিওনেল মেসি বলেই এই খামতিটা সুদে-আসলে পুষিয়ে দেন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচেই জোড়া গোল করেছেন তিনি। আর তাতেই মিরোস্লাভ ক্লোসার রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা বনে গেছেন। সর্বকালের সেরাদেরও কিছু দুর্বলতা থাকে। পেনাল্টি স্পটটাই হলো লিওনেল মেসির সেই দুর্বলতার জায়গা।


