Friday, July 17, 2026
spot_img
Homeমুল পাতামিয়ানমার সীমান্তে ১০৮ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করবে বাংলাদেশ: নিক্কেই এশিয়া

মিয়ানমার সীমান্তে ১০৮ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করবে বাংলাদেশ: নিক্কেই এশিয়া

প্রাইম ভিশন ডেস্ক »

মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের ২৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের কিছু অংশে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলার লক্ষ্যে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। প্রতিবেশী দেশটির রাখাইন রাজ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি আরও গভীর হওয়ায় ঢাকার নিরাপত্তা উদ্বেগও বেড়েছে।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে, মিয়ানমার কিংবা ভারত—কোনো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গেই এর আগে বাংলাদেশ সরকার সীমান্তে এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করেনি; ফলে এটিই হবে প্রথম উদ্যোগ।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন শুরু হলে কয়েক লাখ মানুষ রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় শহর কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়। এরপর থেকেই এই সীমান্ত অঞ্চলের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

গত মাসে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ও চোরাচালান’ প্রতিরোধ করা।

রাখাইনে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি রাজ্যটির অধিকাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার প্রেক্ষাপটে এই ঘোষণা আসে। এর ফলে নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের আশঙ্কা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ বৃদ্ধি এবং সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ জানিয়েছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ নির্বাচিত অংশজুড়ে প্রায় ১০৮ কিলোমিটার এলাকায় বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ঠিক কোন কোন স্থানে এই বেড়া নির্মাণ করা হবে, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।

সীমান্তরক্ষী বাহিনী জানিয়েছে, অননুমোদিত সীমান্ত অতিক্রম ঠেকানো, মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচারের মতো আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের কার্যক্রম ব্যাহত করার প্রয়োজনীয়তা এই সীমান্ত অবকাঠামো নির্মাণের যৌক্তিকতা আরও জোরদার করেছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, বাংলাদেশের বিপরীত পাশের অনেক এলাকায় সীমান্ত ব্যবস্থাপনার যে প্রচলিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো ছিল, তা এখন আর আগের মতো কার্যকর নেই।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মোহাম্মদ শহিদুল হক সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পেছনে বাংলাদেশের উদ্দেশ্য আরও ব্যাখ্যা করেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু ব্যক্তি অর্থের বিনিময়ে যোদ্ধা হিসেবে যোগ দিতে রাখাইন রাজ্যে প্রবেশ করছে। একই সঙ্গে এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক ও অবৈধ অস্ত্র বাংলাদেশে পাচার হচ্ছে।’ তিনি মিয়ানমারে বাংলাদেশ দূতাবাসের সাবেক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টাও ছিলেন।

তিনি বলেন, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ হলে এ ধরনের সীমান্ত পারাপার কমে আসবে। কারণ, সাধারণত বেড়া নির্মাণের পাশাপাশি একটি টহল সড়কও তৈরি করা হয়, যা সীমান্তে আরও কার্যকরভাবে নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ চালাতে সহায়তা করে।

মোহাম্মদ শহিদুল হকের ভাষ্য, মিয়ানমার ২০০৯ সালের শেষ দিকে অথবা ২০১০ সালের শুরুতে দুই দেশের সীমান্তবর্তী নাফ নদীর তীরে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু করেছিল। তবে ১২০ কিলোমিটার অংশের মধ্যে প্রায় ৭০ কিলোমিটার নির্মাণের পর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘এই অংশটি দীর্ঘদিন ধরেই মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচারকারীদের জন্য সবচেয়ে সহজ চলাচলের পথগুলোর একটি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নাফ নদীর এই অংশে বেড়া নির্মাণ করা। এরপর স্থল সীমান্তের অংশে কাজ করা যেতে পারে, যদিও সেটি কিছুটা কঠিন। এছাড়া নাইক্ষ্যংছড়ি ও বান্দরবানের পার্বত্য এলাকার সীমান্তেও বেড়া নির্মাণ করা উচিত। এই এলাকা ভারতীয় ও মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর চলাচল ও আশ্রয়স্থল হিসেবে কুখ্যাত।’

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড বাহিনীর গণমাধ্যম কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে আরাকান আর্মি মংডু দখল করার পর এবং পরে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করার ফলে সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে নেপিদোতে সামরিক জান্তা সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখলেও বাস্তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সীমান্ত এলাকায় এখন আর কোনো নির্দেশনা বা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রশাসনিক শূন্যতার কারণে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বেড়েছে। এর বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বাংলাদেশি জেলেদের অপহরণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, আন্তঃসীমান্ত অস্ত্র ও মাদক পাচার বেড়েছে, নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং সীমান্তে আগে থেকে পুঁতে রাখা স্থলমাইন ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের ঝুঁকি অব্যাহত রয়েছে।’

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের কার্যক্রমসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে, যখন আরাকান আর্মি সীমান্তে মিয়ানমার অংশের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে, তখন থেকে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর এলাকা থেকে ৪২৬ জনেরও বেশি বাংলাদেশি জেলেকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩২৪ জনকে ধাপে ধাপে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে বাকিরা এখনো অপহরণকারীদের কবলে রয়েছে।

সাব্বির আলম সুজন বলেন, ‘ফলে সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা রক্ষা করা বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য ক্রমেই আরও জটিল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরাকান আর্মির সদস্য বলে ধারণা করা সশস্ত্র ব্যক্তিরা সীমান্ত এলাকার বেসামরিক মানুষকে অপহরণ করে এবং পরে তাদের পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে যোগাযোগ করে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আরাকান আর্মি অর্থের জোগান নিশ্চিত করার জন্য জেলেদের অপহরণ করছে এবং মুক্তিপণ দাবি করছে। তারা রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে চোরাচালান, মাদক ও অস্ত্র পাচারের ঘটনা বেড়েছে। নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনার অর্থ জোগাড় করতেই আরাকান আর্মি এসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।’

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়