Homeএই মুহুর্তেচট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম চেম্বারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর: শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতায় নতুন...

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম চেম্বারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর: শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন

প্রাইম ভিশন ডেস্ক »

শিল্প ও একাডেমিয়ার মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার, গবেষণার ফলাফল শিল্প খাতে প্রয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর আজ বুধবার (৪ নভেম্বর ২০২৬) চট্টগ্রামের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে অনুষ্ঠিত হয় ‘রাউন্ডটেবিল ডিসকাশন অন ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশন’ শীর্ষক আলোচনা ও মতবিনিময় সভা। এর মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং যৌথ উদ্যোগে শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের নতুন ক্ষেত্র তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সম্মানিত সদস্য প্রফেসর ড. আবদুল্লাহ আল-মামুন। সভায় সভাপতিত্ব করেন চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক।

সভায় মূল প্রবন্ধ ও বক্তব্য উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান এবং পোর্ট ইউজার্স ফোরামের চেয়ারম্যান ও চিটাগাং চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-আমীন এবং মাননীয় উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রফেসর ড. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ২০২৯ সালে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে দক্ষ মানবসম্পদ, উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং প্রতিযোগিতামূলক শিল্পব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে কোলাবোরেশন অত্যাবশ্যক বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা জোরদার হলে শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি নিজেদের দক্ষতা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ পাবে। অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষক-গবেষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণা, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনী ধারণা কাজে লাগিয়ে উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে পারবে। এ ধরনের উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

কি-নোট স্পিকারের বক্তব্যে মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, বর্তমান বিশ্বে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব চাহিদার মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা দূর করতে শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণাকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনের সঙ্গে সংযুক্ত করা। শিক্ষার্থীরা যেন শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন না করে, বরং বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। এ জন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন, ইন্টার্নশিপ, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ এবং প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

উপাচার্য বলেন, একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যৌথ গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব সমস্যাগুলোকে গবেষণার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকরা কার্যকর সমাধান দিতে পারেন। গবেষণালব্ধ উদ্ভাবনকে প্রযুক্তি হস্তান্তর, পেটেন্ট এবং বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার সুযোগও তৈরি করতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা প্রত্যাশা করি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা স্মারক একটি কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের ভিত্তি তৈরি করবে। এর মাধ্যমে যৌথ গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন, ইন্টার্নশিপ, প্রযুক্তি বিনিময় এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী বলেন, শিল্প–শিক্ষা সহযোগিতা হলো এমন একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব, যা মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে এগিয়ে নেয়। বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে শিক্ষা, মৌলিক গবেষণা ও জ্ঞান সৃষ্টিতে গুরুত্ব দেয়, শিল্প সেখানে গুরুত্ব দেয় ব্যবহারিক প্রয়োগ, বাণিজ্যিকীকরণ ও বাজারমুখী সমাধানে। দুই পক্ষ একসঙ্গে কাজ করলে নিজেদের শক্তি মিলিয়ে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। বিশ্বজুড়ে এর অনেক সফল উদাহরণ আছে, যেখানে উভয় পক্ষ এবং সমাজ উপকৃত হয়েছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এ ধরনের অংশীদারিত্ব আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে ইন্টার্নশিপ, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের ভেতর দিয়ে দক্ষ গ্র্যাজুয়েট খুঁজে পাওয়া যায়। শিক্ষা ও শিল্প উভয় ক্ষেত্রেই নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করা সহজ হয়। আর যৌথ গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে ব্যয় ও ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া যায়।

চিটাগং চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের বিশেষায়িত দক্ষতা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। আগামীর শিক্ষা ব্যবস্থাকে গড়ে তুলতে হবে অর্থনীতির সহায়ক হিসেবে। কারণ আগামীর অর্থনীতি হচ্ছে প্রতিযোগিতামূলক ও চ্যালেঞ্জিং। তাই একাডেমীগুলোকে আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম ও পারদর্শী দক্ষ মানব সম্পদ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে।

চবি উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-আমীন বলেন, আমরা জোরালোভাবে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া নিয়ে ভাবছি। ইতোমধ্যে সব বিভাগে কমিটি অব কোর্সেস সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সব বিভাগের সিলেবাসে ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে সিলেবাস প্রণয়ন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে ট্রাস্ট বিল্ডিং করতে হবে। যাতে শিল্পের সমস্যার সমাধানে শিল্পোদ্যোক্তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে গুরুত্ব দেয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের অতিথি বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ, পাঠ্যক্রম প্রণয়ন ও সংশোধনে শিল্পখাতের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্তকরণ, শিক্ষার্থীদের জন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রাতিষ্ঠানিক ইন্টার্নশিপের সুযোগ সৃষ্টি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণালব্ধ ফলাফল বাণিজ্যিকীকরণ ও যৌথ গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের উপর গুরুত্বারোপ করেন।

মাননীয় উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম বলেন, উন্নত বিশ্বে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি, ব্যবহারবান্ধব করা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং নতুন বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা করে। আমাদের দেশেও এ ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সমস্যা, গবেষণার চাহিদা কিংবা পণ্যের উন্নয়নের বিষয়গুলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে তুলে ধরলে আমরা গবেষণার মাধ্যমে কার্যকর সমাধান দিতে পারব। একইভাবে নতুন শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাইয়ে ফিজিবিলিটি স্টাডিও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে করানো সম্ভব। এভাবেই শিল্প ও একাডেমিয়ার মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠবে।

গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আলী আহমেদ, একেখান গ্রুপের চেয়ারম্যান সালাহউদ্দীন কাসেম খান, চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক ডা. মঈনুল ইসলাম মাহমুদ চৌধুরী ও এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য এস.এম ফজলুল হক। এ সময় অন্যান্যদের মধ্যে চিটাগং চেম্বারের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোঃ আমজাদ হোসেন চৌধুরী, চেম্বার পরিচালক মোঃ নাসির উদ্দিন চৌধুরী, কামাল মোস্তফা চৌধুরী, আসাদ ইফতেখার, মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম, সরোয়ার আলম খান ও মোঃ সেলিম নুর, রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত), বিভিন্ন অনুষদের ডিনবৃন্দ, বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষকবৃন্দ এবং বিভিন্ন সেক্টরের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি সমন্বয়ক করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্ডাস্ট্রি একাডেমিয়া কমিটির সদস্য,চবি ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সালেহ্ জহুর।

পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, UTSA Bangladesh, Sharon Chou Apparels Ltd, Chowdhury Shipping Agencies Pvt. Ltd, Fashion of Wales Ltd ও হাক্কানি গ্রুপ।

চুক্তিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে স্বাক্ষর করেন রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ হাছান মিয়া। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে শিক্ষা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ এবং জ্ঞান ও প্রযুক্তি বিনিময়ের ক্ষেত্র সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন, এ উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক জ্ঞান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটবে এবং চট্টগ্রামকে শিল্প, শিক্ষা ও গবেষণার একটি কার্যকর সংযোগস্থল হিসেবে গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়