সোমবার, জানুয়ারি ১৯, ২০২৬
spot_img
Homeচট্টগ্রামচট্টগ্রামে জ্বরের প্রকোপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ এডিস মশার প্রজনন

চট্টগ্রামে জ্বরের প্রকোপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ এডিস মশার প্রজনন

প্রাইম ভিশন ডেস্ক »

চট্টগ্রামে এডিস মশার প্রজনন ও এডিস বাহিত রোগের বিস্তার মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। সরকারের দুই প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত জরিপে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বাসা-বাড়িতে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি বেড়েছে ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। একই অবস্থা এডিস মশার লার্ভার ঘনত্বের চিত্রেও। যেখানে ২০২৪ সালে এ হার ছিল মাত্র ৩৬ শতাংশ, সেটি ২০২৫ সালে পাওয়া গেছে ৭৫ শতাংশের বেশি। যা তুলনা করলে এডিস মশার ঘনত্ব দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।

তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের পরিচালিত জরিপে ২০০টি বাড়ির মধ্যে ৭৪টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গিয়েছিল। যার হার ছিল ৩৭ শতাংশ। পরের বছর ২০২৫ সালে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) নগরীর ছয়টি এলাকায় জরিপ চালিয়ে ১২৮টি বাড়ির মধ্যে ৬২টিতে লার্ভা খুঁজে পায়। যার হার দাঁড়ায় ৪৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

আরও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে ‘ব্রæটো ইনডেক্স’ (এডিস লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপের সূচক) বিশ্লেষণে। যা পরিমাপ করে লার্ভার ঘনত্ব। ২০২৫ সালে গড় ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ ছিল ৭৫ দশমিক ২৯ শতাংশ। যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ২০ শতাংশ ঝুঁকিসীমার প্রায় চার গুণ বেশি। কিছু এলাকায় এ হার পৌঁছেছে ১৩৪ দশমিক ৬২ শতাংশে। অথচ ২০২৪ সালের জরিপে সর্বোচ্চ ‘ব্রæটো ইনডেক্স’ ছিল ৮০ শতাংশের নিচে। যা ওই বছর মোট জরিপে ছিল মাত্র ৩৬ শতাংশ। হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে ‘ব্রæটো ইনডেক্স’ বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি।

অন্যদিকে, চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই মাসেই সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গতকাল পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ৩৬৬ জন রোগী। গত বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১৯৮ জন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যু হলেও, চলতি বছরের জুলাইয়ে মারা গেছেন ছয়জন।

এর পাশাপাশি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণও। বেসরকারি ল্যাবগুলোর তথ্য বলছে, রোগ শনাক্তের মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি রোগীই চিকুনগুনিয়া পজিটিভ। যদিও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যে জানানো হয়েছে- গতকাল পর্যন্ত আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৭৬৪ জন। আক্রান্ত হচ্ছেন একই পরিবারের একাধিক সদস্য।

দুই জরিপেই এডিস মশার লার্ভার উৎস হিসেবে উঠে এসেছে একই চিত্র। প্লাস্টিক ড্রাম, বাস্কেট, টায়ার, মাটির পাত্র, ফুলের টব, ভবনের লিফটের নিচে জমা পানি, খোলা জায়গার জমানো পানিতে মিলেছে মশার প্রজননস্থল। বারবার এসব জায়গা চিহ্নিত হলেও কার্যকর ও নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রমের ঘাটতির কারণে পুরোনো ফাঁদেই নতুন লার্ভা জন্ম নিচ্ছে বলে মত সংশিষ্টদের।

আইইডিসিআর জরিপের সময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি দলও উপস্থিত ছিল। প্রতিষ্ঠানটির মশক ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা শরফুল ইসলাম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ইতোমধ্যে অভিযান শুরু হয়েছে। ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জনবলও বাড়ানো হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আইইডিসিআর যে সুপারিশগুলো দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে সিটি কর্পোরেশনের সাথে সমন্বয় করে কাজ চলছে। তবে এক্ষেত্রে সবার আগে সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে।

পরিবেশের পরিবর্তন, মশার পরিবর্তন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়নই এডিস মশার বিস্তার বাড়িয়েছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী যেখানে উপকারী মশাগুলোর ঘনত্ব কমেছে, সেখানেই ডেঙ্গু বা জিকা ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়েছে।

ঢাকা এই বৈশ্বিক প্যাটার্নের একটি বাস্তব ও ভয়াবহ উদাহরণ। এখানে প্রতিদিনের জীবন এখন এক অনিশ্চয়তা, যেখানে একটি মশার কামড়ই হতে পারে মৃত্যুর কারণ।

এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনসেক্ট রিয়ারিং অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশন (ওজঊঝ)-এর গবেষকরা ইতোমধ্যে উপকারী মশার একটি স্থায়ী প্রজনন কলোনি তৈরির জন্য কাজ করছেন। গবেষণাটি সফল হলে এটি পরিবেশদূষণহীন ও টেকসই এক রোগনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পথ খুলে দেবে। এই প্রজাতির মশা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। অনেকেই এর বড় আকৃতি ও উজ্জ্বল রং দেখে আতঙ্কিত হতে পারেন। কিন্তু জানা দরকার, এই মশাটি মানুষের জন্য সম্পূর্ণ নিরীহ এবং উপকারী। এ ধরনের মশা দেখা গেলে ভয় না পেয়ে তাকে রক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

ঢাকার মানুষ এখন শুধু ট্রাফিক বা দূষণ নয়, মশার ভয় নিয়েই দিন কাটায়। অথচ এক সময় প্রকৃতিতেই ছিল প্রতিকার, উপকারী মশাই ছিল আমাদের প্রথম প্রহরী। তাদের হারিয়ে নিজেদের অসহায় করে তুলেছি আমরা। এখন সময় প্রকৃতির সেই হারিয়ে যাওয়া সৈনিকদের ফিরিয়ে আনার, আর শহরকে সত্যিকারের বাসযোগ্য করে তোলার, বলেন পরিবেশ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়