প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
আওয়ামী লীগ আগেই আভাস দিয়েছিল– এবার বিতর্কিতদের রাখা হচ্ছে না, কিছু নতুন মুখ দেখা যাবে। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে দলের মনোনীত প্রার্থী তালিকায় সেটাই দেখা গেল। বাদ পড়েছেন এমপি থাকাকালীন নানা কারণে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ানো নেতারা। তাদের বাদ দিয়েই জাতীয় নির্বাচনের ভোটের মাঠের লড়াইয়ে নামছে আওয়ামী লীগ।
দ্বাদশ সংসদে যাওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য নৌকার টিকিট পাননি এমন এমপিদের মধ্যে আছেন– ফরিদপুর-৩ আসনে খন্দকার মোশাররফ হোসেন, জামালপুর-৪ আসনে সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান, কুড়িগ্রাম-৪ আসনে গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন, চাঁদপুর-১ আসনে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, বরিশাল-৪ আসনে স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দীয় সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ নাথ, ঢাকা-৭ আসনে হাজী মোহাম্মদ সেলিম, ঢাকা-১১ আসনে একেএম রহমত উল্লাহ, ঢাকা ১৩ আসনে সাদেক খান, যশোর-৪ আসনে রণজিৎ কুমার রায়, বরগুনা-২ আসনে শওকত হাচানুর রহমানের রিমন, মাগুরা-১ আসনে সাইফুজ্জামান শিখর প্রমুখ।
নানা কারণে আলোচনায় ছিলেন ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের পরপর দুই মেয়াদে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তার আসনে এবার মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামীম হক।
অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার পর ব্যাপক সমালোচনার মধ্যে পড়েন মুরাদ হাসান। এরপর তিনি মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েন, হারান আওয়ামী লীগের পদও। এবার হারালেন দলীয় মনোনয়ন। তার বদলে জামালপুর-৪ আসনে এবার মনোনয়ন পেয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের মৎস্য ও প্রাণিবিষয়ক সম্পাদক মো. মাহবুবুর রহমান।
বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে সমালোচিত হন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন। তার নির্বাচনী এলাকা কুড়িগ্রাম-৪ আসনে এবার মনোনয়ন পেয়েছেন আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক উপকমিটির সদস্য মো. বিপ্লব হাসান। যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বিপ্লব ছাত্রলীগের সোহাগ-নাজমুল কমিটির উপ–আইনবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদের সদস্য মহীউদ্দীন খান আলমগীরও এবার দলীয় মনোনয়ন পাননি। কচুয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁদপুর-১ আসনে এবার মনোনয়ন পেয়েছেন আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদ।
হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত বরিশাল-৪ আসনে পরপর দুবার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ নাথ। দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বিরোধে বিতর্কিত হন তিনি। এখানে প্রথমবারের মতো প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়েছেন আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ।
টানা দুইবার ঢাকা-৭ আসনের প্রতিনিধিত্ব করছেন হাজী মোহাম্মদ সেলিম। পুরান ঢাকার এই পরিচিত মুখের একাদশ জাতীয় সংসদ চলাকালে নতুন করে সামনে আসে পুরোনো ঘটনা। আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের দুদকের এক মামলায় তার বিরুদ্ধে রায় হয় ২০২০ সালে। এ মামলায় জেল খাটতে হয়েছে তাকে। এবার এই আসন থেকে তার পরিবারের তিনজন মনোনয়ন ফরম কেনেন। প্রার্থী হিসেবে হাজী সেলিমের ছেলে সোলাইমান সেলিমকে বেছে নিয়েছে আওয়ামী লীগ।
তিনবারের সংসদ সদস্য একেএম রহমত উল্লাহ। ঢাকা-১১ আসনের এই সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের একজন প্রবীণ রাজনীতিক। তাকে ঘিরে বিতর্ক চামড়া ব্যবসা কেন্দ্র করে। রহমত উল্লাহ আগেই জানিয়েছেন এবারে নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হচ্ছেন না। নিজের স্থলাভিষিক্ত করতে চেয়েছেন ছেলেকে। তার দুই ছেলে মনোনয়ন ফরম কিনলেও প্রার্থী হয়েছেন মোহাম্মদ ওয়াকিল উদ্দিন।
নগর আওয়ামী লীগের নেতা থেকে সংসদে উঠে এসেছিলেন সাদেক খান। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পেয়ে ঢাকা-১৩ আসন থেকে নির্বাচিত হন তিনি। তবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই বিতর্ক যেন তার পিছু ছাড়ছে না। তার জায়গায় এবার নিয়ে আসা হয়েছে এই আসনের নবম ও দশম সংসদের সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানককে।
পরপর তিনবার যশোর-৪ আসন থেকে নৌকাকে বিজয়ী করেছিলেন রণজিৎ কুমার রায়। তবে গত পাঁচ বছরে নিজেকে জড়িয়েছেন নানা বিতর্কে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তৃণমূল নেতাকর্মীরা তাকে মনোনয়ন না দিতে সংবাদ সম্মেলন করেছিল। তবুও দল তাকে মনোনয়ন দিয়েছিল। জনসম্পৃক্ততা ও দলের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে তিনি এবার মনোনয়ন থেকে ছিটকে পড়েছেন। এই আসনে এবার মনোনয়ন পেয়েছেন অভয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এনামুল হক বাবুল।
স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বরগুনা-২ আসনের শওকত হাচানুর রহমানের রিমনকে নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। এবার তাকে সরিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সুলতানা নাদিরাকে।
মাগুরা-১ আসন থেকে বর্তমানে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন সাইফুজ্জামান শিখর। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাবেক সহকারী একান্ত সচিব। এবার সেখানে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক সাকিব আল হাসান।
এবার অনেক নতুন মুখ আসছে, পুরোনো বাদ পড়ছে– আগেই এই আভাস আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড থেকে পাওয়া যায়। গত শুক্রবার দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছিলেন, নতুন অনেকে এসেছেন, কিছু বাদও পড়েছেন। তবে উইন্যাবল (বিজয়ী হতে সমর্থ) প্রার্থী বাদ দেওয়া হয়নি। যারা উইন্যাবল-ইলেক্ট্যাবল নন, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছেন; তারা বাদ পড়েছেন। নারী-পুরুষ সব প্রার্থীর ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য হয়েছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা সবার সঙ্গে মতবিনিময় সভা করবেন দলটির সভাপতি ও সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সভাপতি শেখ হাসিনা। রবিবার সকাল ১০টায় তার সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত সভা শেষ হওয়ার পর আওয়ামী লীগের দপ্তর থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ২৯৮ আসনে নৌকার প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করা হয়।
তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৭ জানুয়ারি নির্বাচন। নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ৩০ নভেম্বর; বাছাই ১ থেকে ৪ ডিসেম্বর। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কমিশনে আপিল দায়ের ও নিষ্পত্তির তারিখ ৬ থেকে ১৫ ডিসেম্বর এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৭ ডিসেম্বর।


