প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেকারত্ব বিশেষ করে ছদ্ম বেকারত্ব মহামারি আকারে বেড়েছে, যা অর্থনীতির গতিকে কমিয়ে দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতেও ব্যাংকে বাড়ছে কোটিপতি আমানতকারীর হিসাবসংখ্যা। শুধু তাই নয়, এসব হিসাবের বিপরীতে থাকা আমানতের পরিমাণও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন প্রান্তিক শেষে ১ কোটির ওপরে হিসাবসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৩৩৬টি, যা আগের প্রান্তিক মার্চ শেষে ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৩৬২টি।
সেই হিসাবে তিন মাসে কোটিপতি আমানতকারীর হিসাবসংখ্যা বেড়েছে ৫ হাজার ৯৭৪টি। আর ছয় মাসে বেড়েছে ৫ হাজার ২৫৫টি। গত ডিসেম্বর শেষে কোটিপতির হিসাবসংখ্যা ছিল ১ লাখ ২২ হাজার ৮১টি।
এসব কোটিপতি আমানতকারীর হিসাবের বিপরীতে জুন শেষে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৮ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, যা মার্চ শেষে ছিল ৭ লাখ ৮৩ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসে এসব হিসাবে আমানত বেড়েছে ২৪ হাজার ৪২২ কোটি টাকা। আর ছয় মাসে আমানত বেড়েছে ৩৩ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এসব হিসাবে আমানত ছিল ৭ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতির অভিযোগে বেশ কিছু সাবেক এমপি, মন্ত্রী ও নেতার ব্যাংক হিসাব জব্দ ও তলব করা হয়েছে। এরপরও দেশে দুর্নীতির পরিমাণ কমছে না। আর দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত এসব টাকা তারা ব্যাংকেই রাখছেন। ফলে ব্যাংকে আগের মতোই কোটিপতি আমানতকারীর হিসাব বাড়ছে। শুধু তাই নয়, এসব হিসাবে আমানতের পরিমাণও বাড়ছে।
তাদের মতে, বর্তমানে মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষ যখন দিশেহারা তখন এক শ্রেণির মানুষের অর্থ বৃদ্ধি দেশে আয়বৈষম্য বাড়ারই বহিঃপ্রকাশ। করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এবং সাম্প্রতিক সময়ে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে আশঙ্কাজনক হারে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী মানুষের আয় বাড়েনি। এতে করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এমন অবস্থায় অর্থ জমানো দূরের কথা, অনেকে সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। এই সময় দেশের একটি শ্রেণির মানুষের আয় বেড়েছে। এরা হচ্ছে পুঁজিপতি, বিত্তবান ও বড় বড় প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। তাদের আয় আগেও বেশি ছিল, এখন আরও বেড়েছে। মূলত আয়বৈষম্যের কারণেই দেশের কোটি টাকার আমানতকারীর সংখ্যা বাড়ছে। এ ছাড়া দুর্নীতির মাধ্যমে কালোটাকা অর্জন, হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে টাকা পাচারে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা, করনীতিতে অসামঞ্জস্য, ধনীদের কাছ থেকে কম হারে কর আদায়ও দেশের আয়বৈষম্য বাড়ার অন্যতম কারণ।
এসব কারণে এক শ্রেণির মানুষের বৈধ ও অবৈধ উপায়ে আয় বাড়ছে। তবে আয় কমেছে এমন মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার যে বাজেট ঘোষণা করেছে, সেখানেও আয়বৈষম্য কমানোর কোনো দিকনির্দেশনা নেই। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোরও কোনো পদক্ষেপ নেই। এ অবস্থায় আয়বৈষম্য কমাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের অর্থনীতির গতি কমেছে। দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেকারত্ব বিশেষ করে ছদ্ম বেকারত্ব মহামারি আকারে বেড়েছে। এমন অবস্থায় কোটিপতি হিসাব বাড়ার অর্থই হচ্ছে দেশে আয়বৈষম্য বাড়ছে।
দেশে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার কারণেই এই আয়বৈষম্য বাড়ছে। তাই বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বাড়ানো না গেলে সামনে এটা আরও বাড়তেই থাকবে।’
একই বিষয়ে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাজেটে কর কাঠামোতে যে কয়েকটি স্তরের কথা বলা হয়েছে, সেখানেও বড় ধরনের বৈষম্য করা হয়েছে। অর্থাৎ নিম্নবিত্তদের বেশি ও উচ্চবিত্তদের কম কর দিতে হবে। যদিও বাজেটের মূল দর্শন হওয়া উচিত ছিল রাজস্বনীতির মাধ্যমে আয় বৈষম্য কমানো।’
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে হিসাব ও আমানতের সংখ্যা বেড়েছে। জুন শেষে মোট ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি ৯০ লাখ ২ হাজার ৬৭১টি, যা মার্চ শেষে ছিল ১৬ কোটি ৫৭ লাখ ৬৮ হাজার ৮২১টি আর তার আগে ডিসেম্বর শেষে ছিল ১৬ কোটি ৩২ লাখ ৪৭ হাজার ৫৩২টি।
একই সময়ে আমানতের পরিমাণ ১৯ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা, যা মার্চ শেষে ছিল ১৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭১১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোটিপতি হিসাব মানেই তা ব্যক্তিমালিকানাধীন নয়। এসব হিসাবের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠান, সংস্থা এবং একজন ব্যক্তির একাধিক হিসাবও রয়েছে। ফলে হিসাবের সংখ্যা বাড়া মানেই ব্যক্তি কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে- তা নির্ধারণ করা যায় না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ সালে দেশে কেবল ৫ জন কোটিপতি হিসাবধারী ছিলেন। ১৯৭৫ সালে তা বেড়ে হয় ৪৭ জন। এরপর ১৯৮০ সালে ছিল ৯৮টি, ১৯৯০ সালে ৯৪৩টি এবং ২০০৮ সালে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ১৬৩টি। ২০২০ সালের শেষে এ সংখ্যা ছিল ৯৩ হাজার ৮৯০টি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টিতে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তা হয়েছিল ১ লাখ ২২ হাজার ৮১টি, আর চলতি বছরের জুন শেষে তা আরও বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৩৩৬টি।


