প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
বছরের পর বছর ধরে প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য ফেলার কারণে চট্টগ্রামের খালগুলো ক্রমেই ভরাট হয়ে পড়ছে। এতে জলাবদ্ধতা ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। এ অবস্থা নিরসনে বন্দরনগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে একাধিক প্রকল্প চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে সিটি কর্পোরেশন।
৬০ লাখের বেশি মানুষের বাসস্থান চট্টগ্রাম শহরে বিভিন্ন সময় নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রতিবছরই ভিন্ন মাত্রায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এর মধ্যে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্পও রয়েছে।
একসময় নগরের পানি নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা জামালখান খালসহ বিভিন্ন খালে বছরের পর বছর ধরে অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলার কারণে সেগুলো এখন প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত জামালখান খালটি কাজীর দেওড়ি এলাকা থেকে উৎপন্ন হয়ে জামালখান, হেম সেন লেন, রহমানগঞ্জ ও দেওয়ান বাজার হয়ে চাকতাই খালে গিয়ে মিশেছে। দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলার কারণে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত ও পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব এবং বাসিন্দাদের অসচেতনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
হেম সেন লেন এলাকার মো. মহিউদ্দিন বলেন, “নালা বন্ধ থাকায় আমার বাড়ির নিচতলায় দীর্ঘদিন পানি জমে থাকে।”
সুমন দাশ বলেন, “অল্প বৃষ্টিতেই এলাকায় পানি উঠে যায়, অনেক সময় নৌকা দিয়ে চলাচল করতে হয়।”
মাছ ব্যবসায়ী আবুল খায়ের বলেন, “খননের সময় তোলা মাটি খালের মধ্যেই ফেলে রাখা হয়েছিল। এতে প্লাস্টিক ও পলিথিন জমে খাল প্রায় ভরাট হয়ে গেছে।”
স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলছেন, কবে আবার সব খাল দিয়ে স্বাভাবিকভাবে পানি প্রবাহিত হবে।
নগর বিএনপির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, “খাল খনন কর্মসূচিতে আমরা পানি নিষ্কাশনের পাশাপাশি সেচের বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়েছি। তবে চট্টগ্রাম শহরে সে সুযোগ সীমিত। বিদ্যমান খালগুলোর সংস্কার ও পুনর্গঠনে সিডিএ ও সিটি কর্পোরেশন একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।”
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, “৩৬টি খালের সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে, যা চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যে শেষ হবে। এছাড়া আরও ২৯টি খাল দখলমুক্ত ও পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কাজ শেষ হলে জলাবদ্ধতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জীববৈচিত্র্য হ্রাসের আশঙ্কা কমবে।”
নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া মেগা প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ২০১৭ সালে অনুমোদিত এ প্রকল্পের অগ্রগতি ইতোমধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খাল খনন ও সংস্কার, ১৬৩ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ, ১১৫টি সেতু ও কালভার্ট, ২৭টি সিল্ট ট্র্যাপ, ছয়টি রেগুলেটর এবং নতুন ড্রেনেজ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, একসময় নগরীতে ছোট-বড় মিলিয়ে ৫৭টি খাল ছিল, যার মধ্যে ১৬টি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া ৩১টি খাল কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে মিশেছে, যার মধ্যে ১৭টি সরাসরি যুক্ত। বাকি ১০টি খাল হালদা নদীতে গিয়ে পড়েছে।
এসব খালের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার। তবে ইতিহাস অনুযায়ী, একসময় নগরীতে ১১৮টি খাল ছিল, যার অধিকাংশই এখন বিলুপ্ত।
নগরীর গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোর মধ্যে রয়েছে শীতল ঝর্ণা, মরিয়ম বিবি, হিজড়া, মনোহর, নাসির, চশমা, জামালখান, গুপ্তছড়া, দেব পাহাড় ও গুলজার খালসহ আরও কয়েকটি খাল। নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবিদরা মনে করেন, দখল হয়ে যাওয়া ২১টি খাল উদ্ধার করে চলমান প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রধান মো. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “জামালখান খালের বর্তমান অবস্থা নগরের দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন। উৎসস্থলে বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে খনন করেও স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। খাল দখলমুক্ত করা, পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং প্লাস্টিক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ জরুরি।”
তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রে ব্যর্থতা সরাসরি জলাবদ্ধতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জীববৈচিত্র্য হ্রাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৩,২০০ মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার মধ্যে প্রায় ২,৫০০ মেট্রিক টন সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। বাকি বর্জ্য নালা-নর্দমা ও খালে জমে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং খাল সংরক্ষণ নিশ্চিত না হলে চট্টগ্রামকে স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতামুক্ত ও স্বাস্থ্যসুরক্ষিত নগর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে না।
তবে প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। প্রকল্প শেষে খাল ও স্লুইস গেটসহ অবকাঠামোর দায়িত্ব নেবে সিটি কর্পোরেশন, কিন্তু এ খাতে পর্যাপ্ত বাজেট ও জনবল সংকট রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।


