মঙ্গলবার, মে ১২, ২০২৬
spot_img
Homeএই মুহুর্তেইরানের ওপর গোপনে হামলা চালাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত

ইরানের ওপর গোপনে হামলা চালাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত

প্রাইম ভিশন ডেস্ক »

ইরানের ওপর সরাসরি সামরিক হামলা চালিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা এ তথ্য জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে উপসাগরীয় এই রাজতন্ত্র চলমান যুদ্ধে এক সক্রিয় যোদ্ধা হিসেবে আবির্ভূত হলো। অথচ এতদিন এ যুদ্ধে ইরানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দেখা হচ্ছিল আরব আমিরাতকে।

আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনী পশ্চিমা প্রযুক্তির আধুনিক যুদ্ধবিমান ও শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থায় সুসজ্জিত। সাম্প্রতিক এই হামলাগুলো ইঙ্গিত দেয়, মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের অর্থনৈতিক শক্তি ও ক্রমবর্ধমান প্রভাব অক্ষুণ্ণ রাখতে দেশটি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সামরিক শক্তি প্রয়োগে আগ্রহী।

সূত্রগুলো জানায়, পারস্য উপসাগরে লাভান দ্বীপে ইরানের একটি তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে আমিরাত। দেশটি অবশ্য এ হামলার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি। গত এপ্রিলের শুরুতে এই হামলা করা হয়। সে সময় পাঁচ সপ্তাহব্যাপী বিমান হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিচ্ছিলেন। ওই হামলায় শোধনাগারটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে এবং এর উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশ কয়েক মাসের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।

ইরান সেই সময় দাবি করেছিল, শত্রুপক্ষ তাদের শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে। এর পাল্টা জবাব হিসেবে তারা আরব আমিরাত ও কুয়েতের ওপর ব্যাপক মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালায়।

একটি সূত্রমতে, আমেরিকা এই হামলার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়নি। কারণ যুদ্ধবিরতি তখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আরব আমিরাত বা অন্য কোনো উপসাগরীয় দেশের অংশগ্রহণকে ওয়াশিংটন পরোক্ষভাবে সমর্থন দিচ্ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব হামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে তারা তাদের আগের বিবৃতিগুলোর কথা উল্লেখ করেছে—যেখানে বলা হয়েছিল, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রয়োজনে সামরিক জবাব দেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।

পেন্টাগনও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। যুদ্ধে আরব আমিরাতের সম্পৃক্ততা নিয়ে হোয়াইট হাউস কোনো সরাসরি উত্তর দেয়নি; তবে তারা বলেছে, ট্রাম্পের হাতে সব ধরনের বিকল্প খোলা রয়েছে। ইরান সরকারের ওপর আমেরিকার সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা আছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উত্থান নিয়ে গবেষণামূলক বইয়ের লেখিকা দিনা এসফান্দিয়ারি বলেন, ‘উপসাগরীয় কোনো আরব দেশ সরাসরি ইরানে হামলা চালাচ্ছে, এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তেহরান এখন চেষ্টা করবে অন্য আরব দেশগুলোর সঙ্গে আরব আমিরাতের দূরত্ব বাড়িয়ে দিতে। বিশেষ করে যারা যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে, তাদের সঙ্গে আমিরাতের সম্পর্কে ফাটল ধরানোই হবে ইরানের পরবর্তী লক্ষ্য।’

যুদ্ধ শুরুর আগে উপসাগরীয় দেশগুলো বলেছিল, তারা তাদের আকাশসীমা বা সামরিক ঘাঁটি কোনো হামলার জন্য ব্যবহার করতে দেবে না। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি দুটিই ব্যবহার করছে। এর প্রতিক্রিয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো ও সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান। তেহরানের উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যয় বাড়িয়ে দিয়ে দেওয়া, যাতে আমেরিকা ও ইসরায়েলের পক্ষে আক্রমণ অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

ইরানের আক্রমণের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত। পরিসংখ্যান বলছে, ইসরায়েলের চেয়েও বেশি হামলা চালানো হয়েছে দেশটির ওপর। ২ হাজার ৮০০-র বেশি মিসাইল ও ড্রোন হামলা হয়েছে আমিরাতে।

এসব হামলায় আরব আমিরাতের বিমান চলাচল, পর্যটন ও আবাসন খাত চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দেশটিতে শুরু হয়েছে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই ও অবৈতনিক ছুটি।

উপসাগরীয় কর্মকর্তারা বলেন, এই পরিস্থিতি দেশটির কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। এরপর থেকেই আরব আমিরাত উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ইরানের সবচেয়ে প্রকাশ্য প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং পুরো যুদ্ধজুড়ে আমেরিকার সঙ্গে জোরালো সামরিক সহযোগিতা বজায় রেখেছে।

লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো এইচ এ হেলিয়ার বলেন, আমিরাত সরাসরি হামলার কথা স্বীকার না করলেও, যুদ্ধের শুরু থেকেই মনে করা হচ্ছিল যে পরিস্থিতি জটিল হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়া কেবল সময়ের ব্যাপার।

মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকেই যুদ্ধে আরব আমিরাতের সম্পৃক্ততা নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয়। সে সময় ইরানের আকাশে এমন একটি যুদ্ধবিমানের ভিডিও পাওয়া যায়, যা ইসরায়েল বা আমেরিকা কারও নয়।

উন্মুক্ত তথ্য ও ছবি নিয়ে কাজ করা গবেষকরা কিছু ছবির কথা উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, ছবিতে আসা ইরানে হামলা করা সেই বিমানগুলো আসলে ফরাসি মিরেজ যুদ্ধবিমান এবং ড্রোনগুলো চীনের তৈরি উইং লুং। এগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে।

সামরিক শক্তির বিচারে আমেরিকার তুলনায় আরব আমিরাত অনেক ছোট। তবে তাদের রয়েছে অত্যন্ত প্রশিক্ষিত ও দক্ষ বিমান বাহিনী। মিরেজ যুদ্ধবিমান ছাড়াও তাদের বহরে আধুনিক এফ-১৬ যুদ্ধবিমান আছে; সেগুলো সহায়তার জন্য রয়েছে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, আকাশপথে কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল এয়ারক্রাফট ও নজরদারি ড্রোন।

মার্কিন বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডেভ ডেপটুলা মনে করেন, এই বিশেষ সক্ষমতা আমিরাতকে ওই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় রণকৌশলে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘সঠিক লক্ষ্যে নিখুঁত হামলা (প্রিসিশন স্ট্রাইক), আকাশ প্রতিরক্ষা, আকাশপথে নজরদারি, জ্বালানি সরবরাহ ও রসদ ব্যবস্থাপনায় আমিরাত অত্যন্ত দক্ষ।’

উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুদ্ধে টেনে আনার যে কৌশল তেহরান নিয়েছিল, তা আরব রাজতন্ত্রগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বিভেদ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে দেশগুলো এখন তাদের নিরাপত্তার জন্য নতুন টেকসই ব্যবস্থার সন্ধানে তৎপর হয়ে উঠেছে।

নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং তাদের রক্ষক হিসেবে আমেরিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে যখন সব উপসাগরীয় রাষ্ট্রই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে, তখন আমিরাত উল্টো আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করছে। এপ্রিলে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এমনটাই জানান সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ।

সামরিক হামলার পাশাপাশি আরব আমিরাত জাতিসংঘে একটি প্রস্তাবের খসড়াকে সমর্থন করেছে। ওই প্রস্তাবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একচেটিয়া আধিপত্য ও অবরোধ ভাঙতে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের অনুমতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া ইরানের আর্থিক স্বার্থের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছে আমিরাত। তারা দুবাইয়ে তেহরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্কুল ও ক্লাবগুলো বন্ধ করে দিয়েছে; পাশাপাশি ইরানি নাগরিকদের ভিসা ও ট্রানজিট সুবিধা দেওয়া বন্ধ করেছে।

অন্যদিকে ইরান বারবার অভিযোগ করে আসছে যে, আমেরিকা ও ইসরায়েলের এই অভিযানে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরাসরি অংশ নিয়েছে।

মার্কিন বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটির অপারেশনাল কমান্ডার অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল জন জে ভি ভেনাবল বলেন, আমেরিকা ও ইসরায়েল তেহরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়ার পর ইরানের আকাশে সামরিক অভিযান চালানোর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

ভেনাবল বলেন, ‘আপনি যদি মিত্র দেশ হিসেবে যুদ্ধে যোগ দিতে চান, তবে এটিই উপযুক্ত সময়; কারণ এখন ঝুঁকি অনেক কম।’

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়