Homeমুল পাতাযে প্রযুক্তিতে বদলে যেতে পারে চট্টগ্রাম

যে প্রযুক্তিতে বদলে যেতে পারে চট্টগ্রাম

প্রাইম ভিশন ডেস্ক »

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্প, বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই মহানগর প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত। জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই নগরকে তাই শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নের মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিলেই হবে না; নাগরিকদের জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য ও সমৃদ্ধ পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।

কিন্তু জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, সড়ক ও ফুটপাতের অব্যবস্থাপনা, নাগরিক নিরাপত্তা এবং পরিকল্পিত উন্নয়নের ঘাটতি চট্টগ্রামের নগরজীবনকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এসব সমস্যা সমাধানে প্রচলিত ব্যবস্থার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিভিন্ন যন্ত্রের পারস্পরিক সংযোগব্যবস্থা, ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা, বৃহৎ তথ্যভান্ডার বিশ্লেষণ এবং স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো প্রযুক্তি নগর ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এসব প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে এমন একটি নগরে রূপান্তর করা সম্ভব, যেখানে সমস্যা তৈরি হওয়ার পর শুধু ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, বরং সমস্যা সৃষ্টির আগেই তা শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।

প্রশ্ন হলো, চট্টগ্রামের মতো জনবহুল ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নগরে এসব প্রযুক্তি কীভাবে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে?

নগর ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রতিরূপ

চট্টগ্রামের স্মার্ট নগর ব্যবস্থাপনার ভিত্তি হতে পারে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্রতিরূপ। সহজভাবে বললে, এটি হবে বাস্তব নগরের একটি হালনাগাদ ডিজিটাল সংস্করণ, যেখানে সড়ক, নালা, খাল, ভবন, ভূমির ব্যবহার, যানবাহন চলাচল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও দুর্যোগের তথ্য একই ব্যবস্থায় সংরক্ষিত থাকবে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নগরের বিভিন্ন এলাকার বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রভাব আগেই বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। যেমন কোনো এলাকায় নতুন আবাসিক প্রকল্প গড়ে উঠলে সেখানকার সড়ক, পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবার ওপর কী ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে, তা প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই মূল্যায়ন করা যাবে।

বিজ্ঞাপন

একইভাবে নতুন সড়ক নির্মাণ, সড়ক সম্প্রসারণ, উড়ালসড়ক স্থাপন কিংবা নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার আগে সম্ভাব্য সুবিধা ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। এতে অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে ভবিষ্যতে যে সমস্যা তৈরি হয়, তা অনেকাংশে এড়ানো যেতে পারে।

এ জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সড়ক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সংস্থা, পানি নিষ্কাশনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিচ্ছিন্ন তথ্যের পরিবর্তে একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরি করা গেলে নগরের সামগ্রিক পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।

জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা

চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান নাগরিক সমস্যা জলাবদ্ধতা। ভারী বৃষ্টিপাত, নালা-খালের পানি নিষ্কাশনক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, খাল দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বিভিন্ন স্থানে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় নগরের অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এ সমস্যা মোকাবিলায় শুধু পানি জমে যাওয়ার পর উদ্ধার ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিলে চলবে না; প্রয়োজন আগাম পূর্বাভাস ও প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা।

নগরের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাত পরিমাপক যন্ত্র, পানির স্তর নির্ণায়ক সেন্সর এবং পানি প্রবাহ পর্যবেক্ষণব্যবস্থা স্থাপন করা যেতে পারে। এসব যন্ত্র থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, নালা-খালের ধারণক্ষমতা, ভূমির উচ্চতা এবং পানি নিষ্কাশনের পথের তথ্য যুক্ত করলে কোন এলাকায় কখন জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে, তার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে অতীতের বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা যাবে। সম্ভাব্য জলাবদ্ধতার আশঙ্কা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থা, জরুরি উদ্ধারকারী দল এবং স্থানীয় প্রশাসনকে আগেই সতর্ক করা সম্ভব হবে। প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া যাবে।

এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল নগর প্রতিরূপ বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো নালা পরিষ্কার করা হলে, খাল পুনঃখনন করা হলে কিংবা নতুন পানি নিষ্কাশনপথ তৈরি করা হলে তার ফলে আশপাশের এলাকায় পানিপ্রবাহের কী পরিবর্তন হবে, তা আগেই বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।

তবে প্রযুক্তি কখনোই বাস্তব অবকাঠামোর বিকল্প নয়। নালা-খাল পরিষ্কার রাখা, খাল দখলমুক্ত করা, পানি নিষ্কাশনপথ সচল রাখা এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের মতো মৌলিক কাজগুলো নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি এসব কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও কার্যকারিতা যাচাইয়ে সহায়তা করবে।

বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর

চট্টগ্রামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। প্রতিদিন উৎপন্ন বর্জ্যের যথাযথ সংগ্রহ, পরিবহন, পৃথকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করা না গেলে নগরের পরিচ্ছন্নতা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এ সমস্যা মোকাবিলায় বর্জ্যকে শুধু অপসারণযোগ্য আবর্জনা হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বৃত্তাকার অর্থনীতির ধারণা কার্যকর হতে পারে। এই ব্যবস্থায় বর্জ্য থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান সংগ্রহ করে আবার উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়।

বর্জ্যের পাত্রে সেন্সর স্থাপন করে সেগুলোর ধারণক্ষমতা ও পূর্ণ হওয়ার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অবস্থান শনাক্তকরণ প্রযুক্তির সহায়তায় বর্জ্য সংগ্রহের গাড়ির উপযুক্ত পথ ও সময় নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। এতে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত, জ্বালানি ব্যয় ও পরিবহন সময় কমানো যাবে।

একই সঙ্গে নগরের বিভিন্ন এলাকায় বর্জ্য থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান পৃথক করার কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। এসব কেন্দ্রে প্লাস্টিক, কাগজ, ধাতু, কাচ ও অন্যান্য উপাদান আলাদা করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে। এতে বর্জ্যের পরিমাণ কমার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার ও জৈব গ্যাস উৎপাদনের ব্যবস্থাও গড়ে তোলা যেতে পারে। উপযুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করে জৈব বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করলে একদিকে কৃষির জন্য সার পাওয়া যাবে, অন্যদিকে জৈব গ্যাস থেকে তাপ ও শক্তি উৎপাদন সম্ভব হবে।

তবে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের কোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে বর্জ্যের ধরন, আর্দ্রতা, জ্বালানিমূল্য, নির্গমন এবং পরিবেশগত নিরাপত্তা যাচাই করতে হবে। যথাযথ মানদণ্ড ও পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত না করে এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত নয়।

নগরবাসীর অংশগ্রহণও এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য। পরিবার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় বর্জ্য পৃথকীকরণে উৎসাহিত করতে হবে। পাশাপাশি পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্যের বাজার ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে ধীরে ধীরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে একটি টেকসই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।

যানজট নিয়ন্ত্রণে তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত

চট্টগ্রামের যানজট শুধু মানুষের যাতায়াতের সময় বাড়ায় না; ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান, পণ্য পরিবহন ও পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ সমস্যা মোকাবিলায় সড়কের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান সড়ক ও যানবাহন চলাচল ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন।

নগরের গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ক্যামেরা এবং যানবাহন শনাক্তকারী সেন্সর স্থাপন করা যেতে পারে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে যানবাহনের সংখ্যা, গতি, সড়কে অপেক্ষার সময় এবং যানজটের তীব্রতা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে।

এই তথ্য বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন মোড়ে যানবাহনের চাপ অনুযায়ী সংকেতবাতির সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় করা যেতে পারে। কোনো সড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে গেলে বিকল্প পথের তথ্যও চালকদের জানানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে জরুরি রোগী পরিবহনের গাড়ি, অগ্নিনির্বাপণ বাহিনী ও অন্যান্য জরুরি সেবার যানবাহনের চলাচল সহজ করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল নগর প্রতিরূপের মাধ্যমে নতুন সড়ক, উড়ালসড়ক, মোড়ের নকশা কিংবা যানবাহন চলাচলের নতুন নিয়ম বাস্তবায়নের আগেই তার সম্ভাব্য প্রভাব যাচাই করা সম্ভব হবে। এতে ব্যয়বহুল প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্য সুফল, সীমাবদ্ধতা ও বিকল্প ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।

তবে যানজট ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি গণপরিবহনের মান উন্নয়ন, পথচারীদের নিরাপদ চলাচল, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং সড়কের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করবে সঠিক তথ্য, দক্ষ পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর।

ডিজিটাল নজরদারিতে সুশৃঙ্খল নগর ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা

নগর ব্যবস্থাপনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফুটপাত, সড়ক ও জনপরিসরের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। ফুটপাত দখল, অনুমোদনহীন স্থাপনা, অপরিকল্পিত ব্যবসা এবং অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং পথচারীদের চলাচল ও নাগরিক নিরাপত্তাকে ব্যাহত করে।

এ ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের একটি হালনাগাদ ডিজিটাল নিবন্ধনব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান, ধরন, মালিকানা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন, নবায়নের সময় এবং প্রযোজ্য কর বা ফি-সংক্রান্ত তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হলে তদারকি সহজ হবে।

বিশেষ করে ফুটপাতের ব্যবসা ব্যবস্থাপনায় নির্ধারিত স্থান, ব্যবসার ধরন, পথচারীদের চলাচলের জায়গা এবং নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করে পরিকল্পিতভাবে স্থান বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। এতে একদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা সম্ভব হবে, অন্যদিকে পথচারীদের অধিকার ও নগরের শৃঙ্খলাও বজায় থাকবে।

রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সিটি কর্পোরেশনের কর, ফি, ইজারা, পার্কিং ফি এবং অন্যান্য অনুমোদিত রাজস্ব আদায়ে ডিজিটাল পরিশোধব্যবস্থা চালু করা গেলে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমবে। প্রতিটি লেনদেনের বিপরীতে ডিজিটাল রসিদ তৈরি হলে হিসাব সংরক্ষণ, আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং বকেয়া শনাক্ত করা সহজ হবে।

বাংলা কিউআর কোডসহ অনুমোদিত ডিজিটাল পরিশোধব্যবস্থা ব্যবহার করে নাগরিকদের জন্য কর ও ফি পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ করা যেতে পারে। তবে এ ব্যবস্থা কার্যকর করতে তথ্যের নিরাপত্তা, লেনদেনের নির্ভরযোগ্যতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে অসুবিধায় থাকা নাগরিকদের সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে সঠিক জরিপ ও নিবন্ধনের মাধ্যমে করের আওতার বাইরে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সম্পদ শনাক্ত করা গেলে রাজস্বের ভিত্তি সম্প্রসারিত হতে পারে। এর ফলে সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি নাগরিক সেবায় অর্থায়নের সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।

খাল, নালা ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার সমন্বিত মানচিত্র

জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল, নালা ও পানি নিষ্কাশনপথের সঠিক তথ্য থাকা অত্যন্ত জরুরি। কোথায় নালার ধারণক্ষমতা কম, কোথায় পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, কোথায় অবৈধ স্থাপনা তৈরি হয়েছে এবং কোন এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে থাকার আশঙ্কা বেশি-এসব তথ্য একত্র করা প্রয়োজন।

ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থার সাহায্যে চট্টগ্রামের খাল, নালা, সড়ক, ভূমির উচ্চতা ও পানি নিষ্কাশনপথের একটি বিস্তারিত ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করা যেতে পারে। এর সঙ্গে বৃষ্টিপাত, পানির স্তর ও প্রবাহ পরিমাপের তথ্য যুক্ত করলে কোন এলাকায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, তা আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

নিয়মিত মাঠপর্যায়ের জরিপ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ডিজিটাল মানচিত্র হালনাগাদ রাখতে হবে। কোনো এলাকায় নালা সংস্কার বা খাল পুনঃখনন করা হলে তার তথ্য ব্যবস্থায় যুক্ত করতে হবে। একইভাবে কোনো নতুন স্থাপনা বা অবকাঠামো পানি নিষ্কাশনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তা মূল্যায়নের ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।

এ জন্য সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পানি নিষ্কাশনসংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। তথ্যের আদান-প্রদান ও যৌথ পরিকল্পনা নিশ্চিত করা গেলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সামগ্রিকভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনের কার্যকর কৌশল গ্রহণ করা সম্ভব হবে।

নাগরিক নিরাপত্তায় সমন্বিত প্রযুক্তি

আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় নাগরিক নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, জরুরি চিকিৎসা, জনসমাগমের চাপ এবং অন্যান্য আকস্মিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

চট্টগ্রামে একটি সমন্বিত নগর নিরাপত্তা ও জরুরি সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এর আওতায় বিদ্যমান নিরাপত্তা ক্যামেরা, যানবাহন পর্যবেক্ষণব্যবস্থা, জরুরি যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন সেবা সংস্থার তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে।

কোনো এলাকায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা বা অস্বাভাবিক জনসমাগমের পরিস্থিতি তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত তথ্য পেতে পারে। ডিজিটাল মানচিত্রের সাহায্যে নিকটবর্তী অগ্নিনির্বাপণ কেন্দ্র, হাসপাতাল, উদ্ধারকারী দল এবং বিকল্প সড়কের অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে জরুরি সেবার উপযুক্ত পথ নির্ধারণ করা যাবে।

এতে সেবা পৌঁছানোর সময় কমানো এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। নাগরিকদের অভিযোগ ও জরুরি তথ্য গ্রহণের জন্যও সহজ যোগাযোগব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।

তবে নিরাপত্তার নামে নির্বিচার নজরদারি গ্রহণযোগ্য নয়। নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, তথ্যের নিরাপত্তা, তথ্য ব্যবহারের সীমা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে আইনসম্মত, প্রয়োজনভিত্তিক ও স্বচ্ছ নীতিমালার অধীনে।

দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতি

চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান ও নগর কাঠামোর কারণে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, পাহাড়ধস, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ। দুর্যোগের পর উদ্ধার তৎপরতা চালানোর পাশাপাশি আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা, মানুষকে সতর্ক করা এবং নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন।

এ জন্য একটি ডিজিটাল দুর্যোগ প্রস্তুতি ও পরিস্থিতি অনুকরণব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগের সম্ভাব্য পরিস্থিতি তৈরি করে আগেই পরীক্ষা করা যাবে—কোন সড়ক বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কোথায় পানি জমতে পারে, কোন এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেশি এবং কোন পথে মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, পানির স্তর, ভূমির উচ্চতা ও জনবসতির তথ্য একত্র করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্র, হাসপাতাল, অগ্নিনির্বাপণ কেন্দ্র ও উদ্ধারকারী দলের অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প উদ্ধারপথ নির্ধারণ করা যাবে।

এ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সিটি কর্পোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতাল, পুলিশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান ও যৌথ মহড়ার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

এর ফলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শুধু ঘটনার পর প্রতিক্রিয়াভিত্তিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আগাম প্রস্তুতি, ঝুঁকি হ্রাস এবং দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব বাড়বে।

নাগরিক সেবায় জবাবদিহি ও অংশগ্রহণ

প্রযুক্তিনির্ভর নগর ব্যবস্থাপনার সাফল্য নির্ভর করবে নাগরিক সেবার মান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর। নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণ, সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো এবং সমাধানের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল সেবা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা যেতে পারে।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিকেরা সড়কের গর্ত, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য অপসারণ, সড়কবাতি নষ্ট থাকা কিংবা অন্যান্য নাগরিক সমস্যা সম্পর্কে অভিযোগ জানাতে পারবেন। অভিযোগের সঙ্গে ছবি, অবস্থান ও প্রয়োজনীয় তথ্য যুক্ত করার সুযোগ থাকলে সমস্যা শনাক্ত করা আরও সহজ হবে।

অভিযোগ পাওয়ার পর তা সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নির্ধারণ এবং সমাধানের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। নাগরিকেরা জানতে পারবেন তাদের অভিযোগ কোন বিভাগে রয়েছে, কার দায়িত্বে আছে এবং কতটা অগ্রগতি হয়েছে।

এতে শুধু অভিযোগ গ্রহণের সংখ্যা বাড়বে না; বরং কোন এলাকায় কোন ধরনের সমস্যা বারবার দেখা দিচ্ছে, কোন সেবায় বেশি ঘাটতি রয়েছে এবং কোথায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন—এসব বিষয়ও বিশ্লেষণ করা যাবে।

তবে ডিজিটাল ব্যবস্থার পাশাপাশি সরাসরি অভিযোগ জানানোর সুযোগও রাখতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারে অদক্ষ, ইন্টারনেট সুবিধাবঞ্চিত কিংবা বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে—এমন নাগরিকদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ স্মার্ট নগর মানে শুধু প্রযুক্তির বিস্তার নয়; বরং সবার জন্য সহজলভ্য ও কার্যকর নাগরিক সেবা।

সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র হতে পারে মূল চালিকাশক্তি

উল্লিখিত উদ্যোগগুলো কার্যকর করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নেতৃত্বে একটি সমন্বিত নগর পর্যবেক্ষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। এর মাধ্যমে যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়কবাতি, নাগরিক অভিযোগ, নিরাপত্তা এবং জরুরি সেবাসংশ্লিষ্ট তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।

কেন্দ্রটি শুধু তথ্য দেখার জায়গা হলে চলবে না। তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে কোন সমস্যা অগ্রাধিকার পাবে, কোন সংস্থা ব্যবস্থা নেবে, কত সময়ের মধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন এবং কাজের অগ্রগতি কীভাবে যাচাই করা হবে—এসব বিষয়ও নির্ধারিত থাকতে হবে।

এ ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সংস্থা, পানি নিষ্কাশনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য।

একটি সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র গড়ে তোলার আগে বিদ্যমান প্রযুক্তি, জনবল, তথ্যব্যবস্থা ও অবকাঠামোর সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। নতুন ব্যবস্থা যেন বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে অসামঞ্জস্য তৈরি না করে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন সুশাসন

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তি চট্টগ্রামের নগর ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি, ক্যামেরা, সেন্সর কিংবা সফটওয়্যার স্থাপন করলেই স্মার্ট নগর গড়ে উঠবে না। প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য, দক্ষ জনবল, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং দায়িত্বশীল প্রশাসনিক ব্যবস্থা।

প্রযুক্তি কেনা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি এর দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়, তথ্যের নিরাপত্তা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং কার্যকারিতা মূল্যায়নের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। প্রতিটি প্রকল্পের জন্য সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও পরিমাপযোগ্য ফল নির্ধারণ করা জরুরি। এতে বিনিয়োগের সুফল যাচাই করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থার উন্নয়ন করা সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, প্রযুক্তিগত ত্রুটি মোকাবিলা এবং তথ্যের অপব্যবহার প্রতিরোধের জন্য কার্যকর নীতিমালা থাকতে হবে। প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি না করে জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থা সচল রাখার প্রস্তুতিও প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নগর ব্যবস্থাপনার প্রতিটি স্তরে নাগরিকের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া। যে প্রযুক্তি মানুষের যাতায়াত সহজ করে, জলাবদ্ধতার ক্ষতি কমায়, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করে, জরুরি সেবা দ্রুত পৌঁছে দেয় এবং সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা বাড়ায়-সেই প্রযুক্তিই হবে কার্যকর স্মার্ট নগর ব্যবস্থাপনার ভিত্তি।

চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এ নগরের উন্নয়ন তাই শুধু স্থানীয় নাগরিকদের জীবনমানের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; জাতীয় অর্থনীতির গতিশীলতার সঙ্গেও যুক্ত। পরিকল্পিত নগরায়ণ, আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগ, কার্যকর আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে চট্টগ্রামকে আরও নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য ও সমৃদ্ধ নগরে রূপান্তর করা সম্ভব।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রকৃত সুফল তখনই পাওয়া যাবে, যখন প্রযুক্তি শুধু সমস্যার তথ্য তুলে ধরবে না, বরং সেই তথ্যের ভিত্তিতে সময়মতো কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। চট্টগ্রামের সামনে এখন সেই সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, ধারাবাহিক উদ্যোগ এবং জবাবদিহিমূলক নগর ব্যবস্থাপনা।

মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন : সচিব, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়