প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে সম্প্রতি মারা যান চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য ডা. আফছারুল আমীন। তার মৃত্যুতে নগরীর ডবলমুরিং, পাহাড়তলী ও হালিশহর থানা এলাকায় সিটি করপোরেশনের আটটি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে এই আসনে উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। আগামী ৩০ জুলাই এই আসনে উপনির্বাচনের দিন ধার্য করা হয়েছে।
এদিকে একাদশ সংসদের মেয়াদ শেষ হতে বাকি আছে সাত মাসের কিছু বেশি। তা ছাড়া মেয়াদের শেষ তিন মাসে সংসদ নির্বাচনের বিধান রয়েছে। সেই হিসাবে চট্টগ্রাম-১০ আসনে দ্বিতীয় দফায় যিনি সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হবেন, এমপি হিসেবে আড়াই থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ মাস সময় পাবেন তিনি।
এই আড়াই মাসের এমপি হতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের অন্তত ডজনখানেক নেতা। তাদের মধ্যে আলোচনায় আছেন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন, সাবেক সিটি প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন, সাবেক মেয়র মনজুর আলম, যুবলীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ মাহমুদুল হক, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু, যুগ্ম আহ্বায়ক ফরিদ মাহমুদ, প্রয়াত আফছারুল আমীনের ভাই এরশাদুল আমীন, ছেলে ফয়সাল আমীন ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা এমদাদুল ইসলাম।
তবে আলোচনায় থাকলেও খুব একটা দৌড়ঝাঁপ দেখা যাচ্ছে না নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের। আলোচনায় থাকলেও তিনি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করবেন না বলে ধারণা নগর আওয়ামী লীগের একাংশের। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মূলত নির্বাচন ও মনোনয়নপত্র সংগ্রহের প্রশ্নে মুখে কুলুপ এঁটেছেন তিনি।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজনও আলোচনায় ছিলেন চট্টগ্রাম-৮ আসনে তৃতীয় দফায় উপনির্বাচনের আগে। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেননি। উপনির্বাচন ঘিরে আলোচনায় থাকলেও তিনিও অনেকটা চুপচাপ আছেন এখনো।
সাবেক মেয়র মনজুর আলম নগরীর দক্ষিণ কাট্টলী এলাকায় দীর্ঘদিন কাউন্সিলর ছিলেন। ২০১০ সালে বিএনপিতে যোগ দিয়ে টানা তিনবারের মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১৫ সালেও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি থেকে আ জ ম নাছির উদ্দীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। তবে ওই নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে নির্বাচন বর্জন করেন। এর পরই অনেকটা বলে-কয়ে রাজনীতি থেকে অবসরে যান। বছর ঘুরতেই ফের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন মনজুর আলম। তিনি বলেন, ‘আমি এখনো চিন্তা করিনি, মনোনয়ন ফরম দেয়া শুরু হলে তখন দেখা যাবে। তা ছাড়া মনোনয়ন দেয়ার মালিক, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।’
এই তিন বড় নেতার বাইরে মনোনয়নের দৌড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন যুবলীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ মাহমুদুল হক। ১৯৭৫ সালে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র থাকা অবস্থায় কলেজ ছাত্রলীগের পক্ষে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় মামলায় জড়ান তিনি। ওই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে চার বছর জেলও খাটেন। এই আসনে গত নির্বাচনেও মনোনয়ন চেয়েছিলেন মাহমুদুল। তবে এবার নিজেকে মাঠের ত্যাগী রাজনীতিবিদ দাবি করে মনোনয়নের বিষয়ে আশাবাদী তিনি। বলেন, ‘আফছার ভাই মারা গেছেন, আমরা এখনো শোক কাটিয়ে উঠতে পারিনি। আমি এখন মনোনয়নের বিষয়ে বলতে চাচ্ছি না। তবু তৃণমূলের কর্মী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী যদি মনোনয়ন দেন, তাহলে আমি বৃহৎ পরিসরে কাজের সুযোগ পাব।’
মনোনয়ন দৌড়ে আলোচনায় আছেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চুও। দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এ আসন থেকে মনোনয়ন চেয়ে পাননি তিনি। যুবলীগের রাজনীতি ছেড়ে এখন আওয়ামী লীগে সক্রিয়। মনোনয়ন দৌড়ে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবেই ধরা হচ্ছে তাকে। নির্বাচনে নিজের আগ্রহের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই আসনে আমার সাংগঠনিক বিচরণ ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। ইউনিট-ওয়ার্ড-মহানগর ছাত্রলীগে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকালে রাজনৈতিক কঠিন সংগ্রামগুলোতে আমি এই আসনেই সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব পালন করেছি। এলাকার সাধারণ মানুষও আমাকে তাদের লোক মনে করে। এটাই আমার শক্তি, আমি মনোনয়ন চাইব, মনোনয়ন দেয়ার মালিক আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা, তার সিদ্ধান্তই আমাদের কাছে শিরোধার্য।’
যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ফরিদ মাহমুদও সক্রিয় হচ্ছেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। নগর আওয়ামী লীগের পরবর্তী সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ পদপ্রত্যাশী তিনি। চট্টগ্রাম-১০ আসনের উপনির্বাচনে আলোচনায় আছেন তিনিও। ফরিদ মাহমুদ বলেন, ‘সাংগঠনিক কর্মী হিসেবে প্রত্যেকের মনোনয়ন চাওয়ার অধিকার আছে, আমিও চাইব। আমি মনোনয়ন পেলে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি বৃদ্ধির জন্য কাজ করব।’
প্রয়াত সংসদ সদস্য আফছারুল আমীনের ভাই এরশাদুল আমীনকেও মনোনয়নের দৌড়ে যোগ্য মনে করছেন অনেকে। ১৯৯১ সালের বন্যায় বড় ভাই আফছারুল আমীনের সঙ্গে কাজ করেছেন বলে দাবি তার। তিনি বলেন, ‘আমার বড় ভাইয়ের পাশাপাশি আমিও রাজনীতি ও জনসেবায় সক্রিয় ছিলাম। বড় ভাইয়ের সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের জন্য কাজ করেছি। আমার বড় ভাই অনেক অসমাপ্ত কাজ রেখে মনে বড় দুঃখ-কষ্ট নিয়ে চলে গেছেন। তার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার জন্য আমরা পরিবার থেকে একজন মনোনয়ন চাইব।’
এ ছাড়া মনোনয়নের বিষয়ে আলোচনায় আছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা এমদাদুল ইসলাম। তবে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার অনেকটা শূন্য। তবু আওয়ামী লীগ থেকে তিনি মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে জোর গুঞ্জন রয়েছে।
মনোনয়ন দৌড়ে আছেন প্রয়াত সংসদ সদস্য আফছারুল আমীনের ছেলে ফয়সাল আমীনও। তবে আফছারুল আমীনের পরিবার থেকে যেকোনো একজন মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়ে পারিবারিক সিদ্ধান্ত হওয়ায় ওই পরিবার থেকে এরশাদুল আমীনকেই এগিয়ে রাখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা চারটি নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১০ আসনে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী। সে জন্য এই আসনকে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবেই দেখেন অনেকে। তবে এই উপনির্বাচনে এখন পর্যন্ত বিএনপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের কারও কোনো তৎপরতা লক্ষ করা যায়নি।


