প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় চলমান ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধসে পড়া ভবনের নিচে চাপা পড়েছেন কমপক্ষে এক হাজার মানুষ। তবে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধার করার কোনো ব্যবস্থাই বিধ্বস্ত গাজায় নেই।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাপা পড়া মানুষ বাদেই অবরুদ্ধ উপত্যকায় নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ৭০০ ছাড়িয়েছে।
এ ছাড়া ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত গাজার মোট ৬৪ হাজার ২৮৩ বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে ৫ হাজার ৫৪০টি। এ ছাড়া ক্ষতি হয়েছে ৯০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন। মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৯টি, এর মধ্যে পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে ১১টি।
গাজার ১৯টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখনো পুরোপুরি সচল নয়। ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়েছে ২০টি অ্যাম্বুলেন্স। অবরুদ্ধ এ উপত্যকার চলমান পানিসংকটের মধ্যেই ইসরায়েলি বাহিনী ধ্বংস করেছে ১১টি পানি শোধনাগার। যদিও দক্ষিণ গাজায় পানি সরবরাহ চালু হয়েছে।
এদিকে গাজার হাসপাতালগুলো চালাতে জ্বালানি প্রায় শেষের দিকে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তাবিষয়ক সমন্বয় দপ্তর ওসিএইচএ গত রবিবার বলেছে, ব্যাকআপ জেনারেটরগুলো যদি জ্বালানির অভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে হাজারও রোগীর জীবন হুমকিতে পড়বে।
বিবিসি জানিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে জ্বালানি, পানিসহ জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে গাজায় প্রবেশের সুযোগ চেয়ে আসছে বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থা। এ ছাড়া সীমিত আকারে মিসর থেকে জ্বালানি গাজায় প্রবেশ করেছে।
জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলা হয়েছে, তাদের পরিচালিত স্কুল ও ভবনগুলোতে চার লাখের বেশি ফিলিস্তিনি আশ্রয় নিয়েছেন। এর মধ্যে শিশু, বয়স্ক ও গর্ভবতী নারীরাও রয়েছেন।
এ ছাড়া ইসরায়েলি হামলায় তাদের ১৪ জন কর্মী নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিবিসি টুডে প্রোগ্রামকে গাজায় কর্মরত চিকিৎসক ঘাসান আবু সিত্তাহ জানিয়েছেন, হাসপাতালগুলোতে আহত যারা আসছেন তাদের প্রায় অর্ধেকই শিশু।
ঘাসান একজন শল্য চিকিৎসক। তিনি যুক্তরাজ্যেই কাজ করেন। গত সোমবার তিনি উত্তর গাজায় এসেছেন গাজাবাসীর জন্য কাজ করতে। এমন পরিস্থিতিতেও দক্ষিণ গাজায় বিদেশিদের সরাতে যুদ্ধবিরতিসংক্রান্ত একটি সংবাদ প্রকাশ করেছিল বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তবে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি হয়নি। হামাসও জানিয়েছে, এমন কিছু তারা শোনেনি।
আরব লিগের মহাসচিব আহমেদ আবুল ঘেইত সামরিক অভিযান বন্ধ করে গাজায় মানবিক করিডর স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন। সিসিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে জরুরি মানবিক সহায়তা প্রদান করছে চীন।
এদিকে লেবাননের হিজবুল্লাহ বাহিনীর সঙ্গেও সীমান্ত সংঘাতে জড়িয়েছে ইসরায়েলি সেনারা। শঙ্কা রয়েছে দুই পক্ষের বড় ধরনের সংঘাত শুরুর। রবিবার সীমান্তে হিজবুল্লাহর হামলায় একজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন। তেল আবিব কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে লেবানন সীমান্তসংলগ্ন ২৮টি গ্রামের বাসিন্দাকে সরিয়ে আনার কাজ শুরু করেছে। প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকা খালি করা হয়ে গেছে। সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলি ট্যাংকের আনাগোনাও দেখা যাচ্ছে।
ইসরায়েল অভিযোগ করে বলেছে, ইরানের নির্দেশনায় উসকানি দিচ্ছে হিজবুল্লাহ।
এদিকে হামাসের হাতে আটক জিম্মিদের সংখ্যার বিষয়ে নতুন তথ্য দিয়েছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। হামাসের হামলায় নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে। তারা দাবি করেছে, মোট ১৯৯ জনকে জিম্মি করেছে হামাস। জিম্মিদের মধ্যে ১৩ জন শিশু, ৮ জনের বয়স ৬০ বছরের বেশি এবং ২ জনের বয়স ৮০ বছরের বেশি। জিম্মিদের মধ্যে মোট ১৭ দেশের নাগরিক রয়েছেন। এর আগে তারা জানিয়েছিল সংখ্যাটি ১৫৫ জন।
গাজায় ডক্টরস উইদাউট বর্ডারসের ব্রিটিশ-ফিলিস্তিনি সার্জন গাসান আবু সিত্তা সতর্ক করেছিলেন, তার হাসপাতালে রোগীদের সহায়তা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত রসদ নেই। তিনি বিবিসিকে বলেন, সাধারণ সময়ে তাদের এক বা দেড় মাসে যে পরিমাণ ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম লাগত, এখন যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে প্রতিদিনই সে পরিমাণ দরকার হচ্ছে।
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী হামাস যোদ্ধারা গত ৭ অক্টোবর সীমান্ত পেরিয়ে তিন দিক থেকে ইসরায়েলের দক্ষিণ অংশে ঢুকে পড়েন। তাদের হামলায় অন্তত ১ হাজার ৩০০ ইসরায়েলি নিহত হন। হামাস যোদ্ধারা ধরে নিয়ে গিয়ে জিম্মি করেন আরও ১৫০ জনকে।
পাল্টা জবাবে ইসরায়েল গাজায় হামাসের সামরিক শাখা এবং অবকাঠামোতে জোর বিমান হামলা শুরু করে, শুরু হয় সর্বাত্মক অবরোধ। গত আট দিনে ইসরায়েলের হামলায় প্রায় আড়াই হাজার ফিলিস্তিনির প্রাণ গেছে।
ইসরায়েল ঘোষণা দিয়েছে, গাজায় খাদ্য বা জ্বালানি কিছুই প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। এ পরিস্থিতিতে গত ১১ অক্টোবর গাজা ভূখণ্ডের একমাত্র বিদ্যুৎকেন্দ্রটি জ্বালানির অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। অন্ধকারে ডুবে যায় হামাস-নিয়ন্ত্রিত এলাকা।
গাজায় ইসরায়েলের এই সর্বাত্মক অবরোধকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন আখ্যায়িত করেছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভল্কার তুর্ক এক বিবৃতিতে বলেছেন, গাজার পরিস্থিতি এমনিতেই খারাপ ছিল। এর মধ্যে সর্বাত্মক অবরোধ পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটাচ্ছে। সূত্র: বিবিসি/সিএনএন


