Thursday, July 2, 2026
spot_img
Homeসংবাদধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলেমিশে থাকাই বাংলাদেশের আবহমান কালের মূল্যবোধ: প্রধানমন্ত্রী

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলেমিশে থাকাই বাংলাদেশের আবহমান কালের মূল্যবোধ: প্রধানমন্ত্রী

প্রাইম ভিশন ডেস্ক »

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, অপশক্তি নিজেদের হীন দলীয় স্বার্থে মানুষের মধ্যে বিভেদ-বিরোধ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালালেও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলেমিশে থাকাই বাংলাদেশের মানুষের আবহমান কালের মূল্যবোধ। বর্তমান সরকার এমন একটি রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণে কাজ করছে, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে বসবাস করবে। শুধু মানুষের নিরাপত্তাই নয়, কোনো প্রাণীও যেন মানুষের হিংস্রতার শিকার না হয়, সরকার সেটিও নিশ্চিত করতে চায়।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সারা দেশে একযোগে ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’ উদ্‌যাপন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

আজ সকালে সচিবালয় থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’ উদ্‌যাপন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। তিন দিনব্যাপী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’-এর লোগো ও স্মারক ডাকটিকিটও উন্মোচন করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ না করলেও তার হৃদয়জুড়ে ছিল বাংলাদেশ, আর বাংলাদেশও তাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে। কিশোর বয়সে ১৯১৪ সালে তিনি প্রথমবারের মতো ময়মনসিংহের ত্রিশালে এসেছিলেন। কবির স্মৃতিবিজড়িত সেই ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ ঘোষণার সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকার ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সময়কে ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করেছে।

তিনি বলেন, বিদ্রোহ, প্রেম, বিরহ, তারুণ্য ও বাংলাদেশের ঐতিহ্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় নাম। পরাধীন, পর্যুদস্ত ও পরাভূত জাতির ভাগ্যাকাশে তার আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতো। পরাধীনতা, জুলুম, নির্যাতন, শোষণ, অসাম্য, বৈষম্য, কুসংস্কার, তথা যা কিছু অন্যায়, অবিচার ও অসুন্দর, তার বিরুদ্ধে কবির কলম ছিল শাণিত অস্ত্র। বিপ্লব, বিদ্রোহ কিংবা রণসংগীত; ইসলামী মূল্যবোধের গান অথবা ভজন-কীর্তন কিংবা শ্যামাসংগীত; প্রেম, প্রকৃতি কিংবা মানবিক মূল্যবোধ; কৈশোরের আনন্দ কিংবা যৌবনের উম্মাদনা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নজরুল আমাদের শুদ্ধ প্রকাশ।

তারেক রহমান বলেন, মাতৃভূমিকে ভালোবাসার ক্ষেত্রেও নজরুল আমাদের অন্যতম প্রধান দিশারী। আমাদের জীবন, আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, সংগ্রাম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য তার রচনায় মহিমাময় হয়ে উঠেছে। কবি নজরুলের সৃষ্টিশীলতার মধ্যে আতিথ্য রয়েছে সব কালের, সব মানুষের। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তিনি আমাদের অনুপ্রেরণা। তার প্রাসঙ্গিকতা এবং প্রয়োজন ফুরানোর নয়।

তিনি বলেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার কবিতা ও গান যেমন ছিল অনুপ্রেরণার প্রবল উৎস, তেমনই আমাদের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে তার সৃষ্টিশীলতাই হয়ে ওঠে প্রতিবাদ, প্রতিরোধের মূল ভাষা। তিনি আমাদের যাপিত জীবনের অনিবার্য অংশ। শুধু অতীত ইতিহাস নয়, আজকের প্রজন্মের জন্য, এমনকি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও নজরুল আমাদের জীবনে প্রাসঙ্গিক। এ কারণেই আমাদের জাতীয় কবির, জীবন ও কর্মের সঙ্গে, গণমানুষ বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্মের সম্পর্ক আরো গভীর ও নিবিড় করার লক্ষ্যে নানা আয়োজনে ‘নজরুল বর্ষ’ শুরু হয়েছে।

অনুষ্ঠানের আয়োজন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নজরুল বর্ষ’ নিয়ে অনুষ্ঠান শুধু সরকারি দপ্তরের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নজরুল গবেষক, শিল্পী ও অনুরাগীদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, এ ধরনের আয়োজনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কবির সাহিত্য, জীবনবোধ ও দর্শনকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া।

তিনি বলেন, তথ্য প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার সীমাহীন ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব আমাদের নতুন প্রজন্মের সামনে একদিকে যেমন জ্ঞানের দ্বার উম্মোচন করে দিয়েছে, অপরদিকে মূল্যবোধ হারিয়ে বিপথগামী হওয়ার পথও উন্মুক্ত। এমন জটিল বাস্তবতায় নজরুলের নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধসমৃদ্ধ কবিতা ও ছড়া নতুন প্রজন্মের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে পারে।

সরকারপ্রধান বলেন, কবি নজরুলের জীবন ও কর্ম, চিন্তা ও দর্শন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে। সাহিত্য সম্মেলন, গবেষণা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক উৎসব, নজরুলসংগীতের আসর, প্রকাশনা, নাট্যোৎসব ও চিত্রপ্রদর্শনীসহ বছরব্যাপী নানা আয়োজনের মাধ্যমে জাতীয় কবির সৃষ্টিকে জনপরিসরে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে তার সাহিত্য ও সংগীত সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রচারের নতুন সম্ভাবনাও সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘নজরুল বর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটি’র মাধ্যমে দেশের সব জেলা, উপজেলা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নজরুল বিশেষজ্ঞ, গবেষক, শিল্পী এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বছরব্যাপী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা জরুরি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষাভাষী মানুষ ও আন্তর্জাতিক গবেষকদের কাছে নজরুলের সাহিত্য ও বিশ্বজনীন মানবিক বার্তা আরও বিস্তৃতভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার কাছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলেন ‘বাংলাদেশের মন’। তিনি নজরুলের ‘গাহি সাম্যের গান’ কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, সাম্য, সম্প্রীতি ও মানবিকতার যে চেতনা নজরুল ধারণ করেছিলেন, সেটিই বাংলাদেশের সমাজ নির্মাণের অন্যতম ভিত্তি হওয়া উচিত।

বক্তব্যের শেষে জাতীয় কবির জীবন, কর্ম, সাহিত্য, সংগীত, দর্শন ও মানবিক চেতনাবোধের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’-এর বছরব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন ঘোষণা করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ আয়োজনের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে জাতীয় কবির সৃষ্টিকর্ম নতুনভাবে মূল্যায়িত হবে এবং তার মানবিক ও বিশ্বজনীন বার্তা আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে।

Previous article
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়