Homeসংবাদকাজে গতি আনতে প্রায় ৫.২ লাখ শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার

কাজে গতি আনতে প্রায় ৫.২ লাখ শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার

প্রাইম ভিশন ডেস্ক »

সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ৫.২ লাখ শূন্য পদ দ্রুত পূরণে সরাসরি উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কোন দপ্তরে কত পদ খালি, কোন পদে নিয়োগের অনুমোদন রয়েছে, কোথায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছে এবং কোন নিয়োগ প্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে রয়েছে—এসব বিষয়ে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ইতোমধ্যে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এসব তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের কাজ শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে শূন্য পদের তালিকা, অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম এবং চলমান নিয়োগ কার্যক্রমের হালনাগাদ তথ্য জরুরি ভিত্তিতে পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ (এমআরএ) ও হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়সহ (সিএজি) একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের চিঠিপত্র ও নথি পর্যালোচনা করে এ উদ্যোগের কথা জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো শূন্য পদ ও চলমান নিয়োগের তথ্য প্রস্তুত করে অর্থ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রক্রিয়াও শুরু করেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারের এ উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু শূন্য পদ পূরণ নয়; দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুততর করা এবং সরকারি চাকরিতে নিয়োগের কাঠামোয় পরিবর্তন আনাও এর উদ্দেশ্য।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে দ্রুত এসব নিয়োগ শেষ করতে চাইলেও পুরো প্রক্রিয়ায় তিন থেকে চার বছর সময় লাগতে পারে। কারণ প্রতিটি নিয়োগ কার্যক্রমই সময়সাপেক্ষ।

তিনি বলেন, “কতটি পদে কতজন নিয়োগ দেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে শুরু করে নিয়োগের অনুমোদন, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, আবেদন গ্রহণ ও যাচাই-বাছাই, এমসিকিউ, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা, ফল প্রকাশ, পুলিশ ভেরিফিকেশন, নিয়োগপত্র জারি ও যোগদান—প্রতিটি ধাপেই নির্দিষ্ট সময় লাগে।”

বর্তমানে একটি বিসিএসের নিয়োগ পরীক্ষা শেষ করতে দেড় বছর বা তারও বেশি সময় লাগছে। অন্যান্য সরকারি দপ্তরের নিজস্ব নিয়োগ পরীক্ষায়ও প্রায় একই ধরনের সময় লাগে। ফলে বিপুলসংখ্যক শূন্য পদে নিয়োগ সম্পন্ন করতে সময় লাগবে। এ জন্য প্রয়োজন হবে অর্থায়নেরও।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে কর্মসংস্থান বাড়ানোর যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার অংশ হিসেবেই সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ৩০ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ‘সরকারি কর্মচারীদের পরিসংখ্যান-২০২৫’ প্রকাশ করে। এতে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক প্রক্রিয়ায় প্রায় পাঁচ লাখ শূন্য পদে সরকারি কর্মচারী নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বেকার ২৬ লাখের বেশি

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখের বেশি।

এর বাইরে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকা, কম কর্মঘণ্টা বা কম আয়ের কাজে যুক্ত থাকা এবং চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের বড় একটি অংশ শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

এ অবস্থায় সরকারি চাকরির প্রায় ৫ লাখ শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সরকারি চাকরি দিয়ে দেশের সামগ্রিক কর্মসংস্থান সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

কারণ, প্রতিবছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করা বিপুলসংখ্যক তরুণের তুলনায় সরকারি চাকরির সুযোগ সীমিত। তাই সরকারি নিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও জরুরি।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন টিবিএসকে বলেন, “এক ধরনের বৈপরীত্য সবসময় দেখা যায়—দেশে শিক্ষিত বেকার রয়েছেন, আবার সরকারি দপ্তরগুলোতে শূন্য পদও রয়েছে। ফলে বেকাররা যেমন কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না, তেমনি সরকারি দপ্তরগুলোও জনবল সংকটের কারণে তাদের নির্ধারিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারছে না। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের নিয়োগ উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক।”

তিনি বলেন, “তবে যোগ্যতম ব্যক্তি যাতে নিয়োগ পান, সে জন্য নিয়োগের সব প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে।”

ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, “নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরকার বা প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক নিয়োগ দিতে গেলে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এ জন্য ধাপে ধাপে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যেতে পারে। এতে আর্থিক চাপ কমার পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়াও সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, শূন্য পদ পূরণের এ উদ্যোগ কার্যকর করতে শুধু দ্রুত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলেই হবে না। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে যোগদান পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করতে হবে। এ জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

তাদের মতে, একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে নিয়োগ শেষ করার মতো বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের একই ধরনের পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সমন্বিত বা গুচ্ছ পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ বাড়ানো দরকার।

এতে চাকরিপ্রার্থীদের বারবার আবেদন ও পরীক্ষার জন্য অর্থ ও সময় ব্যয়ের চাপ কমবে। একই সঙ্গে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও প্রশাসনিক চাপ কমতে পারে।

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রশ্নফাঁস, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি ঠেকাতে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

কোথায়, কত শূন্য পদ

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২। এর মধ্যে ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০টি পদে কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। ফলে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ৫ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি পদ শূন্য রয়েছে।

গ্রেডভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ৮২ হাজার ২১৬টি পদ শূন্য রয়েছে ২০তম গ্রেডে। এরপর ১৬তম গ্রেডে ৭৯ হাজার ৮৬৮টি, দশম গ্রেডে ৬৮ হাজার ৪১৩টি, ১১তম গ্রেডে ৫২ হাজার ৬২৪টি এবং নবম গ্রেডে ৪৯ হাজার ৯৮৪টি পদ শূন্য রয়েছে। নবম গ্রেডে বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ হয়ে থাকে।

এ ছাড়া ১৩তম গ্রেডে ৪২ হাজার ৩৫টি, ১৪তম গ্রেডে ৩০ হাজার ৫০৫টি, ১৫তম গ্রেডে ২৭ হাজার ১৩৪টি, ১৯তম গ্রেডে ২৩ হাজার ৮৭৯টি এবং ১৭তম গ্রেডে ২০ হাজার ৯৬৮টি পদ শূন্য রয়েছে।

এসব শূন্য পদের বেশির ভাগই সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও অধিদপ্তরে। এসব প্রতিষ্ঠানে শূন্য পদের সংখ্যা ৩ লাখ ১ হাজার ১৫২। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনগুলোতে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৩৮৪টি, মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ৬ হাজার ৮০৮টি এবং বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ১৪ হাজার ৫৭৮টি পদ শূন্য রয়েছে।

অনুমোদনের অবস্থা, সাংগঠনিক কাঠামো, নিয়োগবিধি এবং চলমান নিয়োগ কার্যক্রমের অগ্রগতি বিবেচনায় নিয়ে কোন শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করা সম্ভব, তা এখন পুনর্মূল্যায়ন করছে সরকার।

নিয়োগ পরীক্ষাতেও পরিবর্তন

শূন্য পদ পূরণের পাশাপাশি সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা ও নম্বর বণ্টন পদ্ধতিতেও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের সরাসরি নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বণ্টন পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সমান ৫০ নম্বর করে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে প্রার্থীর বাস্তব দক্ষতা ও যোগ্যতা যাচাইয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা আরও স্বচ্ছ, দ্রুত ও কার্যকর করতে নতুন পরীক্ষা বিধিমালা বা নম্বর বণ্টন পদ্ধতি চালুর বিষয়েও কাজ চলছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনও (পিএসসি) বিসিএসসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার সিলেবাস ও মূল্যায়ন পদ্ধতি যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

তিনভাবে হয় সরকারি নিয়োগ

বর্তমানে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের প্রধান পথগুলো হলো পিএসসি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের নিয়োগ কমিটি এবং বিভিন্ন প্রকল্পে চুক্তিভিত্তিক বা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ।

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা নিয়োগে পিএসসি বিসিএস ও নন-ক্যাডার পরীক্ষার আয়োজন করে। অন্যদিকে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের অনেক পদে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর, বিভাগ বা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে নিয়োগ দিয়ে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি। এ ছাড়া প্রকল্প বা বিশেষায়িত কাজের জন্য চুক্তিভিত্তিক ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ করা হয়।

সরকারের বর্তমান উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু একটি নিয়োগকারী সংস্থা নয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সব শূন্য পদের চিত্র এক জায়গায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়