প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
ছাত্র-জনতার তুমুল বিক্ষোভের জেরে পদত্যাগ করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি। পদত্যাগ করেছেন তার মন্ত্রিসভার আরো কয়েকজন সদস্য। দেশটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা রয়েছেন অজ্ঞাত স্থানে। এ পরিস্থিতিতে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়লে গতকাল রাত ১০টা থেকে দেশটির আইন-শৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রণ নেয় সেনাবাহিনী। এর আগে নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজারাম বসনেত স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘কিছু গোষ্ঠী বর্তমান সংকটকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ নাগরিক ও সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির মারাত্মক ক্ষতি করছে, লুটপাটে লিপ্ত হচ্ছে এবং অগ্নিসংযোগ ঘটাচ্ছে। যদি এ কর্মকাণ্ড বন্ধ না হয় তবে সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবে।’
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘সেনাবাহিনী জনগণের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্র রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এজন্য নাগরিকদের সেনাবাহিনীর এ প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিক্ষোভে লুট হওয়া অস্ত্রশস্ত্র ফেরত দেয়ার জন্যও সেনাবাহিনী আলটিমেটাম দিয়েছে।’ বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতাকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পাউডেল। একই আহ্বান জানিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল অশোক রাজ সিগদেলও। তবে তাতেও বিশৃঙ্খলা থামেনি, এর পরই নিয়ন্ত্রণ নেয় সেনাবাহিনী।
গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রী অলির পদত্যাগের ঘোষণার আগেই ভক্তপুরের বালকোট এলাকায় অলির ব্যক্তিগত বাসভবনে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। শুধু অলির বাড়ি নয়, এদিন একে একে হামলা হয় ক্ষমতাসীন জোটের শরিক কংগ্রেস পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ কয়েকজন মন্ত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের বাড়িতেও। আগুন দেয়া হয়েছে বিমানবন্দর, পার্লামেন্ট ভবন ও সুপ্রিম কোর্টেও। দিনভর দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা ও পর্যটনস্থলে হামলা-ভাংচুর-অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ঘটেছে কারাগার ভাংচুর ও অস্ত্র লুটপাটের ঘটনাও।
নেপালের স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, চলমান সংকট নিরসনে শিগগিরই একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হতে পারে, যার নেতৃত্বে থাকতে পারেন আন্দোলনের প্রতিনিধিরা। সে লক্ষ্যে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে শিগগিরই আলোচনায় বসতে পারেন রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান। স্থানীয় গণমাধ্যম দ্য হিমালয়ান টাইমস বলছে, সব মহলে প্রশংসিত নেপালের খ্যাতনামা প্রকৌশলী ও প্রশাসক কুলমান ঘিসিং এরই মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাব দিয়েছেন। তার মতে, এমন একটি সরকার গঠন করা উচিত, যেখানে সৎ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির মানুষ থাকবেন। সেই সঙ্গে জেনারেশন-জেড প্রজন্মের প্রতিনিধিদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ঘিসিং অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে অবিলম্বে সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের পথ তৈরি হয়।
সরকারের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে সোমবার রাজপথে নামে আন্দোলনকারীরা। বিক্ষোভকারীদের সিংহভাগই বয়সে তরুণ, যারা ‘জেনারেশন-জেড’ বা ‘জেন-জি’ প্রজন্ম হিসেবে পরিচিত। আন্দোলন চলাকালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে নিহত হয় ১৯ জন। আহত হয় আরো কয়েকশ বিক্ষোভকারী। গতকাল সকালেও নিহত হয় দুজন। পরিস্থিতি দ্রুত সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। একপর্যায়ে পতন হয় অলি সরকারের। শুধু প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি নন, মন্ত্রিসভার আরো কয়েকজন সদস্য পদত্যাগ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন কৃষি ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী রামনাথ অধিকারী এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রদীপ পাউডেল। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির ২১ জন সংসদ সদস্য এবং রাষ্ট্রীয় প্রজাতান্ত্রিক পার্টির সব সংসদ সদস্য দলগতভাবে পদত্যাগ করেছেন। ফলে কার্যত প্রশাসকবিহীন হয়ে পড়েছে নেপাল।
গতকাল সকাল থেকে বিক্ষুব্ধ জনতা সরকারি অবকাঠামো, গণমাধ্যম, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের বাসভবন লক্ষ্য করে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে। এছাড়া কেন্দ্রীয় প্রশাসনের প্রধান কার্যালয় সিংহদরবারে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। এখানে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয় এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তর অবস্থিত। এছাড়া দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত বাসভবনে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির বাড়ি (বালাকোট, ভক্তপুর), নেপালি কংগ্রেস সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবার বাসভবন (বুধানিলকান্তা ও ধরানগাঁধি), মাওবাদী কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দহলের খুমালটার বাসভবন, যোগাযোগমন্ত্রী পৃথ্বী সুব্বা গুরং, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক ও জ্বালানি মন্ত্রী দীপক খড্কার বাসভবনে হামলা ও আগুন।
বিক্ষোভকারীদের তোপের মুখে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি সেনাপ্রধানের কাছে সহায়তা চান। জবাবে সেনাপ্রধান তাকে পদত্যাগের পরামর্শ দেন। এর পরই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন অলি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মন্ত্রীদের হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেয়া হয়। উচ্চপদস্থ মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের বিশেষ নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে সেনা ব্যারাকে। তবে দেশটির সদ্য পদচ্যুত প্রধানমন্ত্রীসহ অন্য মন্ত্রীদের সঠিক অবস্থান জানা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে আজ-কালের মধ্যে দেশটির পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়া হতে পারে।
অলির পদত্যাগের পর শান্তিপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধান করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাউডেল। গতকাল একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির পদত্যাগ এরই মধ্যে গৃহীত হয়েছে। তাই এখন দেশের মূল কাজ, অতিরিক্ত রক্তপাত বা ক্ষতি এড়িয়ে সংকট সমাধান করা।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি সব পক্ষকে শান্ত থেকে ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো ও আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানাচ্ছি। গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকদের দাবিগুলো সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব।’
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সেনাপ্রধানও। দ্য হিমালয়ান টাইমস জানায়, জেনারেল অশোক রাজ সিগদেল এক বিবৃতিতে বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকার এবং সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানান। এতে তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত সহিংসতা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড দেশকে আরো অস্থিতিশীল করবে, যা সংকট সমাধানের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।’
চলমান পরিস্থিতিতে দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় এগিয়ে এসেছেন কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র শাহ। স্বতন্ত্র মেয়র হিসেবে ২০২২ সালে নির্বাচিত ৩৫ বছর বয়সী এ রাজনীতিবিদ সহিংসতা বন্ধ ও জনসম্পদ রক্ষার অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের হাতে দেশের নেতৃত্ব দেয়ার সময় এসেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের হত্যাকারী পদত্যাগ করেছে। এখন দেশের সম্পদের ক্ষতি মানে আমাদের সবার ক্ষতি—তাই জনসম্পদ ধ্বংস করবেন না। এখন প্রজন্মের দায়িত্ব দেশকে নেতৃত্ব দেয়া এবং সেজন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’ পাশাপাশি সেনাপ্রধানের সঙ্গে আলোচনার জন্যও প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান মেয়র শাহ।
এদিকে গতকাল দুপুর থেকে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বিমানবন্দরের ওয়েবসাইটের আগমন ও প্রস্থান বোর্ডে এখন আর কোনো দেশীয় বা আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সময়সূচি দেখা যাচ্ছে না। সেখানে শুধু লেখা রয়েছে—এয়ারপোর্ট ক্লোজড। এর আগে জানানো হয়েছিল, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে দেশীয় ফ্লাইটগুলো বাতিল করা হয়েছে।
সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ভারত-নেপাল সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করেছে ভারত। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং প্রবেশপথে কড়া তল্লাশি চালানো হচ্ছে, যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
হিমালয়ঘেরা ভারত-চীনবেষ্টিত নেপালে জেন-জি আন্দোলন দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ। ২০০৬ সালের গণ-আন্দোলনের চেয়েও সহিংস হয়ে ওঠে জেন-জি বিক্ষোভ। সে সময় গণ-আন্দোলনে নিহত হয়েছিল ১৮ জন। যা রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পতনের পথ প্রশস্ত করেছিল। সে ঘটনার মাত্র দুই বছর পর ২০০৮ সালে রাজতন্ত্র বিলোপ করে নেপালকে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করে দেশটির পার্লামেন্ট। কিন্তু প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রায় দেড় দশক পরও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসেনি। বরং ২০০৮ সালের পর থেকে নেপাল এরই মধ্যেই ১৩টি সরকার দেখেছে।
জেন-জি আন্দোলনের নেপথ্যে ছিলেন তরুণ সমাজকর্মী সুদান গুরুং। তার নেতৃত্বে ‘জেনারেশন-জেড’-এর আন্দোলন কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সুশাসনের অভাবের বিরুদ্ধে এক সর্বজনীন বিক্ষোভে পরিণত হয়। ৩৬ বছর বয়সী সুদানের আন্দোলন সংগঠনে প্রথম ধাপ ছিল ডিজিটাল নেটওয়ার্ক গঠন। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তিনি বিকল্প মেসেজিং অ্যাপ, ভিপিএন এবং মুখে মুখে প্রচারের মাধ্যমে বার্তা ছড়ান। হামি নেপালের স্বেচ্ছাসেবীরা রাতভর ফোন কল, হ্যান্ডবিল ও পোস্টারের মাধ্যমে বিক্ষোভের সময়, স্থান ও নিরাপত্তা নির্দেশনা জানিয়ে দেন। দ্বিতীয় ধাপে তিনি তরুণদের স্কুল ইউনিফর্ম পরে, হাতে বই নিয়ে রাস্তায় নামতে আহ্বান জানান। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও এ চিত্র ভাইরাল হয়, যা আন্দোলনের প্রতি বিশ্বজনমতের সহানুভূতি তৈরি করে। তৃতীয় ধাপ ছিল ক্ষেত্র সমন্বয়। সুদান প্রতিটি শহরে স্থানীয় সমন্বয়ক নিয়োগ দেন, যারা ভিড় পরিচালনা, মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ এবং পুলিশি বাধা সামলানোর পরিকল্পনা করতেন। হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থাও আন্দোলনের অংশ হিসেবে রাখা হয়, যাতে আহতরা দ্রুত সহায়তা পান। চতুর্থ ধাপে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুনরায় চালুর দাবির পাশাপাশি সরাসরি সরকারের পদত্যাগের আহ্বান জানান।
সরকার পতনের পর সুদান গুরুং আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে এক বার্তায় বলেন, ‘এটি শুধু একটি দাবির জয় নয়, বরং নেপালের জন্য নতুন এক সূচনা।’ তিনি সবাইকে শান্ত থাকতে, সহিংসতা এড়াতে এবং অর্জিত সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনে রূপ দেয়ার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, ‘এখনই সময় দেশকে দুর্নীতি ও অকার্যকারিতার পথ থেকে সরিয়ে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন ব্যবস্থার পথে নিয়ে যাওয়ার।’


