অশোক সাজ্জানহার
ভারত ২০২২-এর ১ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার কাছ থেকে ২০২৩-এর জন্য জি২০-এর (১৯টি বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ২০টি দেশের গ্রুপ) সভাপতিত্ব গ্রহণ করেছে? এই দায়িত্ব গ্রহণকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ভারতের জি২০ প্রেসিডেন্সি হবে ‘সর্বব্যাপী, আশাব্যঞ্জক, সিদ্ধান্তমূলক ও কর্মমুখী’।
জি২০-এর সভাপতিত্ব গ্রহণ করে ভারত বিশ্বমঞ্চে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে তার উত্থানের সিদ্ধান্তমূলক সংকেত দিয়েছে। যদিও বিশ্বের বেশির ভাগ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের কাছেই কভিড-১৯ অতিমারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্বের কারণে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জগুলো কার্যকরভাবে সামলানোকে দুরূহ বলে মনে হয়েছে, ভারত তার সাহসী নেতৃত্ব ও বিচক্ষণ নীতির মাধ্যমে বিগত তিন বছরে সম্মুখীন হওয়া সব ঝাপ্টা সফলভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছে।
জি২০ কী : জি২০ হলো একটি আন্তর্জাতিক ফোরাম, যা শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় প্রকৃতির দেশকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। এর মূল দায়িত্ব হলো বিশ্ব অর্থনীতি, উন্নয়নসংক্রান্ত সমস্যা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেমন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন, টেকসই উন্নয়ন ইত্যাদির সঙ্গে সম্পর্কিত প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা। যেহেতু জি২০ একটি ফোরাম, এর চুক্তিগুলো পালন করা বা সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন ঘটানো আইনত বাধ্যতামূলক নয়। তবে সেগুলো এই রাষ্ট্রগুলোর নীতি ও বৈশ্বিক সহযোগিতাকে প্রভাবিত করে।
বিন্যাস : ২০২২ সালের নভেম্বরে বালিতে জি২০ শীর্ষ সম্মেলন আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির একটি অত্যন্ত কঠিন ও অনিশ্চিত মুহূর্তে অনুষ্ঠিত হয়। অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি কভিড-১৯ অতিমারির কারণে বিগত তিন বছরে বিশ্ব বড় ধরনের স্থিতিহীনতা ও অস্থিরতার শিকার হয়েছে। চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্ব উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খাদ্য ঘাটতি, সার ও জ্বালানির ঘাটতি, অস্থিতিশীল ঋণ, সাপ্লাই চেইনে ব্যাঘাত এবং আরো অনেক কিছুর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলেছে। এমন পরিস্থিতিতেই ভারতকে জি২০-এর কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।
শীর্ষ সম্মেলন : বালি শীর্ষ সম্মেলনে ভারত ‘নেতা, সমাধানকারী ও ঐকমত্য নির্মাতা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের ছায়া শীর্ষ সম্মেলনের আলোচনায়ও বড় স্থান দখল করে রেখেছিল। শীর্ষ সম্মেলনের আগে জি২০-এর কয়েকটি সভায় সংঘর্ষের বিষয়ে পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ভারত এই ইস্যুতে বিরোধী পক্ষগুলোর মধ্যে সংযোগ সেতু হিসেবে কাজ করতে সক্ষম হয়েছে। সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে সমরখন্দে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে প্রধানমন্ত্রী মোদির বক্তব্য ‘এখন যুদ্ধের সময় নয়’-এর পুনরাবৃত্তি এবং ‘সংলাপ ও কূটনীতি’র মাধ্যমে সংঘাতের সমাধান করার দাবি থেকে একটি সমঝোতাভিত্তিক সমাধান অর্জিত হয়েছে।
জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রথম অধিবেশনে তাঁর বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী মোদি স্পষ্টভাবে বলেন যে জাতিসংঘ বিশ্বকে পীড়নকারী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছে। বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর ব্যর্থতার কারণেই জি২০-এর গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যেমন একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল, আবারও তেমনটা করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী মোদি। ডিজিটাল কানেক্টিভিটিকে সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে কথা বলার সময় প্রধানমন্ত্রী মোদি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন, ‘ডিজিটাল রূপান্তর আমাদের সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। ডিজিটাল প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে কয়েক দশক ধরে চলমান বিশ্বব্যাপী লড়াইকে বহুগুণে শক্তিশালী করে তুলতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল সমাধানগুলো সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে?’ প্রধানমন্ত্রী মোদি ঘোষণা করেন, ভারতের প্রেসিডেন্সির পূর্ণাঙ্গ মূল সুর ‘এক পৃথিবী, এক পরিবার, এক ভবিষ্যৎ’-এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হবে ‘উন্নয়নের জন্য ডাটা (তথ্য-উপাত্ত)’ নীতি। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেছেন, LIFE (লাইফ) অর্থাৎ ‘লাইফস্টাইল ফর এনভায়রনমেন্ট (পরিবেশের জন্য জীবনধারা)’ প্রচারাভিযান এতে বিশাল অবদান রাখতে পারে। তিনি টেকসই জীবনধারাকে একটি গণ-আন্দোলনে পরিণত করার জন্য বিশ্বসম্প্রদায়কে উৎসাহিত করেন।
ভারতের প্রেসিডেন্সি : জি২০ সভাপতিত্ব গ্রহণ করে ভারত মাঠে নেমেছে। দায়িত্ব নেওয়ার আগেও ২০২২ সালের ২৬ নভেম্বর আন্দামান ও নিকোবার দ্বীপপুঞ্জে জি২০ প্রতিনিধিগণ ও আমন্ত্রিত রাষ্ট্রগুলো এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দূতদের জন্য একটি বিশেষ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে ভারত। ৪ ডিসেম্বর ২০২২ থেকে উদয়পুরে প্রথম চার দিনের শেরপা বৈঠকের মাধ্যমে সূচনা ঘটিয়ে ভারত এরই মধ্যে বেঙ্গালুরুতে প্রথম ফিন্যান্স ও সেন্ট্রাল ব্যাংকের ডেপুটি সভাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সভার আয়োজন করেছে, যার মধ্যে রয়েছে মুম্বাইয়ে জি২০ ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম বৈঠক, কলকাতায় ফিন্যানশিয়াল ইনক্লুশনের জন্য প্রথম গ্লোবাল পার্টনারশিপ ইত্যাদি।
ভারত বিশ্বব্যাপী দক্ষিণ দেশগুলোর জন্য একটি শক্তিশালী ও স্পষ্ট কণ্ঠস্বর হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে। বেশ কিছু ছোট দেশের মধ্যে একটি অটল ধারণা রয়েছে যে তাদের উদ্বেগ ও সমস্যাগুলো প্রাপ্য মনোযোগ লাভ করে না। উল্লেখযোগ্য একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে ভারত ১২-১৩ জানুয়ারি, ২০২৩-এ ‘ভয়েস অব দ্য গ্লোবাল সাউথ ফর হিউম্যান-সেন্ট্রিক ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক ভার্চুয়াল সম্মেলনের আয়োজন করে। এই শীর্ষ সম্মেলনের মূল সুর ছিল ‘ইউনিটি অব ভয়েস, ইউনিটি অব পারপাস’। এই শীর্ষ সম্মেলনটি বিশ্বব্যাপী দক্ষিণের ১২৫টি দেশকে তাদের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রাধিকারগুলো বিনিময় করার লক্ষ্যে একটি সাধারণ প্ল্যাটফরমে একত্র করে। এই উদ্যোগটি প্রধানমন্ত্রী মোদির ‘সাবকা সাথ, সাবকা বিকাশ, সাবকা বিশ্বাস, সাবকা প্রয়াস (সবার সমর্থন, সবার উন্নয়ন, সবার বিশ্বাস, সবার প্রচেষ্টা)’ দৃষ্টিভঙ্গি কর্তৃক অনুপ্রাণিত, যাকে আরো জোরালো করে তুলেছে ভারতের বসুধৈব কুটুম্বকম (বিশ্ব একটি পরিবার) দর্শন।
উদ্বোধনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মোদি ঘোষণা করেন, বিশ্বব্যাপী দক্ষিণ দেশগুলোর কণ্ঠস্বরই হবে ভারতের কণ্ঠস্বর এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অগ্রাধিকারই হবে ভারতের অগ্রাধিকার। উন্নয়নশীল বিশ্বের বিভিন্ন অগ্রাধিকারের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী মোদি চারটি R-এর আহ্বান জানিয়েছেন—‘Respond (সাড়া প্রদান), Recognize (স্বীকৃতি দান), Respect (সম্মান প্রদান) ও Reform (সংস্কার)’। ভারতের বেশ কিছু নতুন উদ্যোগের কথাও ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রেসিডেন্সি গ্রহণ করার সময় প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, ভারতের জি২০ অগ্রাধিকারগুলো শুধু জি২০ অংশীদারদের সঙ্গেই নয়, বরং বিশ্বব্যাপী দক্ষিণ দেশগুলোর মধ্যে আমাদের সেসব সহযাত্রীদের সঙ্গেও আলোচনা করে নির্ধারণ করা হবে, যাদের কণ্ঠস্বর প্রায়ই অশ্রুত রয়ে যায়। বাংলাদেশ, মিসর, মরিশাস, নাইজেরিয়া, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বেশ কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশকেও এ বছর সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য জি২০ শীর্ষ সম্মেলনে ভারত ‘অতিথি রাষ্ট্র’ হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
উপসংহার : জি২০ প্রেসিডেন্সি গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী মোদি ঘোষণা করেন, ভারত সারা দেশে ৩৫টি ভিন্ন ভিন্ন মূল সুরে ৫৫টি পৃথক শহরে ২০০টিরও বেশি জি২০ সভা আয়োজন করবে। আগত দর্শনার্থীরা ভারতের অপরূপ বৈচিত্র্য, সর্বজনীন প্রথা ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির পূর্ণ অভিজ্ঞতা পাবেন।
এই সংকটময় মুহূর্তে জি২০-এর দায়িত্ব গ্রহণ করা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। এটি একটি দুর্দান্ত সুযোগও বটে। বিশ্ব প্রত্যাশা ও প্রতীক্ষা নিয়ে ভারতের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ভারত উত্তর ও দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমের সব দেশের উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী মোদি বালি জি২০ শীর্ষ সম্মেলনে বলেছেন, ‘আগামী বছর যখন বুদ্ধ ও গান্ধীর পবিত্র ভূমিতে জি২০-এর আগমন ঘটবে, আমরা সবাই মিলে বিশ্বকে শান্তির একটি বলিষ্ঠ বার্তা প্রদান করতে একমত হব।’ ভারত ২০২৩ সালের নভেম্বরের শেষে ব্রাজিলের হাতে ব্যাটন হস্তান্তর করবে। এই প্রথমবারের মতো জি২০-এর বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্সি নিয়ে সৃষ্ট ত্রয়ী তিনটি প্রধান উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশের সমন্বয়ে গঠিত হবে। এটি বিশ্বের শান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য ইন্দোনেশিয়া ও ব্রাজিলের সমর্থনে ভারতকে একটি অনন্য সুযোগ প্রদান করে। ভারত দৃঢ়সংকল্প ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তার জি২০-এর প্রেসিডেন্সি কার্যক্রমের প্রতীক্ষায় রয়েছে।
লেখক : কাজাখস্তান, সুইডেন ও লাটভিয়ায়
ভারতীয় সাবেক রাষ্ট্রদূত


