প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। মরুর নীরব বাতাসে ধীরে ধীরে ভেসে উঠছে এক আবেগময় ধ্বনি— ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক…’। সাদা ইহরামে মোড়া লাখো মানুষের হৃদয় যেন একসঙ্গে সাড়া দিচ্ছে মহান আল্লাহর ডাকে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মুসলমানদের এই মহামিলনমেলা আজ আরাফাতের ময়দানে পরিণত হয়েছে আত্মসমর্পণ, প্রার্থনা আর অশ্রুসিক্ত ভালোবাসার এক অপার্থিব দৃশ্যে।
সৌদি আরবের স্থানীয় সময় আজ মঙ্গলবার ৯ জিলহজ। পবিত্র হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে গতকাল সোমবার থেকেই। আল্লাহর মেহমানরা পবিত্র মক্কা নগরী ছেড়ে ধীরে ধীরে সমবেত হয়েছেন মিনার তাঁবুনগরীতে। ‘ইয়াওমুত তারবিয়া’ পালনের মধ্য দিয়ে তারা কাটিয়েছেন ইবাদত-বন্দেগিতে ভরা এক রাত।
সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গতকাল সোমবার থেকেই হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। হাজিদের তাঁবুনগরী হিসেবে পরিচিত মিনায় নিয়ে যেতে সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হজ পালনের উদ্দেশ্যে গতকাল ‘ইয়াওমুত তারবিয়া’ (তারবিয়ার দিন) পালনের জন্য হজযাত্রীরা মক্কার নিজ নিজ বাসস্থান থেকে মিনায় যেতে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছেন।
এদিকে ফজরের নামাজ শেষে আজ সূর্য ওঠার আগেই মিনার সাদা তাঁবুগুলো থেকে লাখো হাজি রওনা হয়েছেন আরাফাতের ময়দানের দিকে। চারদিকে শুধু একটাই ধ্বনি— ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক…’। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব ভাষা, সব জাতি আর সব সীমান্ত যেন মিলেমিশে গেছে এক বিশ্বাসে, এক ডাকে।
আরাফাত— মক্কা থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরের সেই ঐতিহাসিক প্রান্তর, যেখানে দাঁড়িয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। সেখানেই রয়েছে জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড়। ইসলামের ইতিহাসে যার গুরুত্ব অপরিসীম। হজের তিনটি ফরজের অন্যতম এই আরাফাতে অবস্থান। তাই তো রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আরাফাতে অবস্থানই হলো হজ।’
সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত হাজিরা সেখানে থাকবেন দোয়া, জিকির আর কান্নাভেজা মোনাজাতে। জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে আদায় করবেন তারা। আল্লাহর রহমত আর ক্ষমা লাভের আশায় লাখো মানুষ আজ হাত তুলেছেন একই প্রার্থনায়।
এ বছর আরাফাতের ময়দানে ঐতিহাসিক হজের খুতবা দেবেন মসজিদে নববির প্রধান ইমাম ও খতিব শায়েখ আলি বিন আবদুল রহমান আল-হুদাইফি। তার খুতবা শুনতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসল্লিরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
সূর্য ডুবে গেলে হাজিরা রওনা হবেন মুজদালিফার পথে। সেখানে খোলা আকাশের নিচে কাটবে রাত। এরপর ১০ জিলহজ মিনায় ফিরে বড় জামরায় পাথর নিক্ষেপ, পশু কোরবানি ও মাথা মুণ্ডনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা।
চলতি বছর বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশের প্রায় ১৬ থেকে ১৮ লাখ মুসলমান হজ পালন করছেন। বাংলাদেশ থেকেও গেছেন প্রায় সাড়ে ৭৮ হাজার হজযাত্রী। তাদের সবার চোখেমুখে একটাই আকাঙ্ক্ষা— মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং জীবনের সব গুনাহ থেকে মুক্তিলাভ।
পবিত্র হজকে নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করতে সৌদি আরব প্রশাসন নিয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। নিরাপত্তা বাহিনী, স্বাস্থ্যসেবা ও বিভিন্ন সেবামূলক সংস্থা একযোগে কাজ করছে আল্লাহর মেহমানদের সেবায়।
দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থা এসপিএ জানিয়েছে, বিশেষ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল মনসুর বিন নাসের আল-ফায়েজ পবিত্র স্থানগুলোয় নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনীর প্রস্তুতি ও কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শন শেষে তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আল্লাহর মেহমানদের নিরাপত্তা এবং নির্বিঘ্নে ইবাদত নিশ্চিত করতে সব বাহিনী পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছে। বিভিন্ন নিরাপত্তা ও সেবামূলক সংস্থার মধ্যে চমৎকার সমন্বয় থাকার কারণে এবারের হজ আরও সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।


