Homeএই মুহুর্তেপাইলটের গাঁজা সেবন, হঠাৎ ৩০০ ফুট নিচে নামল এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট, আহত...

পাইলটের গাঁজা সেবন, হঠাৎ ৩০০ ফুট নিচে নামল এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট, আহত অনেকে

প্রাইম ভিশন ডেস্ক

মাঝ আকাশে উড়োজাহাজে তীব্র ঝাঁকুনি। কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে উড়োজাহাজ। সিটবেল্ট বাঁধতে বলার ঘোষণা দেওয়ার সুযোগও পাননি ককপিটে থাকা দুই পাইলট। এমনই এক আকস্মিক ঘটনা ঘটে গেছে এয়ার ইন্ডিয়ার ফুকেট-দিল্লি ফ্লাইটে। আর এতে আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন যাত্রী ও চার ক্রু। এরপরই প্রশ্ন উঠতে থাকে কী ঘটেছিল ককপিটে, যার কারণে এমন দুর্ঘটনা। তদন্তে উঠে আসে অদ্ভুত এক তথ্য। জানা যায়, গাঁজা সেবন করেছিলেন ক্যাপ্টেন!

উড়োজাহাজে যে কোনো গুরুতর ঘটনার পর স্ট্যান্ডার্ড প্রসিডিউর অনুযায়ী, উভয় পাইলটকেই পোস্ট-ফ্লাইট ড্রাগ স্ক্রিনিং টেস্ট করাতে হয়। সূত্র জানিয়েছে, ফার্স্ট অফিসারের ফল নেগেটিভ এলেও, ক্যাপ্টেন দুটি টেস্টেই অকৃতকার্য হয়েছেন। বিশেষভাবে, দ্বিতীয় টেস্টটি নিশ্চিত করে যে তিনি গাঁজা সেবন করেছিলেন।

এনডিটিভির প্রতিবেদনে জানা যায়, উভয় পাইলটকেই দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি (অফ-রোস্টার) দেওয়া হয়েছে।

১৩৭ জন যাত্রী ও ৮ জন ক্রু নিয়ে এআই-২৩৭৯ ফ্লাইটটি গত ৪ আগস্ট ফুকেট থেকে দিল্লির উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। মাঝ আকাশে হঠাৎ উড়োজাহাজটি ৩০০ ফুট নিচে নেমে যায়। এনডিটিভি এয়ার ইন্ডিয়ার অভ্যন্তরীণ ‘ফ্লাইট সেফটি’ প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে ফুকেট-দিল্লি ফ্লাইটের বিস্তারিত তুলে ধরেছে। এতে বলা হয়েছে, এয়ারবাস এ৩২০-এর নিয়ন্ত্রণে থাকা সহকারী পাইলট (ফার্স্ট অফিসার) বিমানের গতি দ্রুত বাড়াতে এবং নিশ্চিত দুর্ঘটনা (স্টল বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে নিচে পড়ে যাওয়া) এড়াতে বিমানটির সামনের দিকটি (নোজ) খাড়া নিচের দিকে নামিয়ে দিতে বাধ্য হন।

এর ফলে উড়োজাহাজে তীব্র নেতিবাচক ‘জি-ফোর্স’ (negative-g) তৈরি হয়। এত দ্রুত উড়োজাহাজের নাক নিচের দিকে নেমে যায়, কিছুক্ষণের জন্য এটি শুধু মহাকর্ষের কারণে যতটা নিচে নামার কথা, তার চেয়েও দ্রুত নিচে নামতে থাকে। সিটবেল্ট পরা না থাকায় সবাই শূন্য ভাসতে শুরু করেন।

সেই মুহূর্তে সিটে না থাকা ক্যাপ্টেন বর্ণনা করেছেন, কীভাবে তিনি নিজে শূন্যে আছাড় খাওয়ার পাশাপাশি ফার্স্ট অফিসার এবং ককপিটের প্রতিটি খোলা জিনিসকে শূন্যে ভাসতে দেখেন। পরে ইঞ্জিনের ওয়ার্নিং ডিসপ্লেতে ভেসে ওঠা একটি হলুদ সতর্কতা বার্তা নিশ্চিত করে যে, ঘটনাটি ঘটার সময় বিমানটি তার সহনশীলতার সর্বনিম্ন সীমা অতিক্রম (-1g structural limit) করেছিল।

ক্যাপ্টেনের বিবরণ অনুযায়ী, ককপিটে নিজেও ছিটকে পড়ার মধ্যে তিনি মাঝআকাশে থাকা ফার্স্ট অফিসারকে স্থির রাখার চেষ্টা করেন। এরপর তির্যকভাবে নিজের আসনের দিকে এগিয়ে গিয়ে সিটবেল্টের সংকেত চালু করেন। আসনে বসে সিটবেল্ট বাঁধার পর তিনি বলেন, ‘আই হ্যাভ কন্ট্রোলস’ এবং উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নেন। তখনো উড়োজাহাজটি নিচের দিকে নামছিল। গতি ও উচ্চতা কমে যাওয়া ঠেকাতে পাইলট থ্রটল সর্বোচ্চ ধারাবাহিক থ্রাস্টে নিয়ে যান। উড়োজাহাজটির সর্বোচ্চ ৩০০ ফুট উচ্চতা কমে যাওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

উড়োজাহাজটি স্থিতিশীল হওয়ার পর দুই পাইলট একে অপরের খোঁজ নেন এবং ককপিটের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন। কলকাতা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে বিষয়টি জানানো হয়। তবে শেষ পর্যন্ত পাইলটরা এ৩২০ উড়োজাহাজটি নয়াদিল্লিতে অবতরণের সিদ্ধান্ত নেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসিএএমে ‘ডোর আর্ম ফরওয়ার্ড ইমার্জেন্সি’ সতর্কবার্তা দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে আরও দুবার তা ভেসে ওঠে। প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নির্দেশিকা অনুযায়ী ক্রুরা চেকলিস্ট পরীক্ষা করেন, সিস্টেম প্রেসার পেজগুলো ক্রস-চেক করেন এবং সমস্ত প্যারামিটার স্বাভাবিক দেখতে পান। ফলে তাঁরা এই সতর্কতা সংকেতগুলোকে সাময়িক যান্ত্রিক ত্রুটি বা মিথ্যা (স্পুরিয়াস) হিসেবে ধরে নেন। এ ছাড়া ‘ট্রানজিয়েন্ট হাইড্রোলিক কশন’ সতর্কবার্তাটিও উড়োজাহাজের নির্ধারিত রিসেট পদ্ধতির মাধ্যমে সমাধান করা হয়। ক্রু সদস্যরা জানান, সক পদক্ষেপ স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) এবং ককপিটের স্বাভাবিক নিয়ম মেনে সম্পন্ন করা হয়েছিল।

তবে প্রকৌশলীদের রেকর্ডে আরও গুরুতর একটি পরিস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একই মিনিটের মধ্যে উড়োজাহাজটি প্রথমে গ্রিন হাইড্রোলিক সিস্টেমে, এরপর একসঙ্গে ব্লু ও ইয়েলো সিস্টেমে এবং সবশেষে তিনটি সিস্টেমেই নিম্নচাপের সংকেত দেয়। তবে তিনটি সিস্টেমে একই সময়ে চাপ কমেছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়। হাইড্রোলিক সিস্টেম বিমানের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ, ল্যান্ডিং গিয়ার, ব্রেক এবং অন্যান্য ভারী যান্ত্রিক অংশ পরিচালনার জন্য চাপের তরল ব্যবহার করে থাকে।

এর পাশাপাশি অটোপাইলট বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং বাম ও ডান এলিভেটরে ত্রুটির সংকেত দেখা যায়। এতে ধারণা করা হচ্ছে, উড়োজাহাজটির পিচ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সত্যিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। এ কারণেই হঠাৎ উড়োজাহাজের নাক ওপরে উঠে যাওয়ার পেছনে এই ত্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। পিচ নিয়ন্ত্রণ বলতে পাইলটের উড়োজাহাজের নাক ওপরে বা নিচে তোলার সক্ষমতাকে বোঝায়। এর ওপরই নির্ভর করে উড়োজাহাজটি ওপরে উঠবে, নিচে নামবে নাকি সমতলে উড়বে।

তদন্তকারীরা পরে নিশ্চিত করেছেন, এটি তিনটি হাইড্রোলিক সিস্টেমেই ত্রুটির সংকেত পাওয়ার ঘটনা ছিল। এটি গুরুতর এবং সম্ভবত নজিরবিহীন একটি সমন্বয়। কারণ, এ৩২০-এর তিনটি স্বাধীন হাইড্রোলিক সিস্টেম এমনভাবে নকশা করা যে, একটি সিস্টেমে সমস্যা হলে অন্যগুলো তা সামাল দিতে পারে। দিল্লিতে পৌঁছানোর পর রক্ষণাবেক্ষণকারী দল উড়োজাহাজটির প্রকৌশলগত পরীক্ষা ও মেরামতের কাজ করে।

কেবিন ক্রুদের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি জানার পর ক্যাপ্টেন নিজেই ককপিট থেকে বেরিয়ে কেবিন পরিদর্শন করেন। তাঁকে জানানো হয়, বেশ কয়েকজন যাত্রী ও দুই কেবিন ক্রু গুরুতর আহত হয়েছেন এবং কেবিনের কিছু সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসাকর্মী ও অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের ব্যবস্থা করতে বলা হয়। পাশাপাশি দ্রুত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য রানওয়ের বহির্গমনপথের সবচেয়ে কাছের পার্কিং বে বরাদ্দ দেওয়ার অনুরোধ করা হয়।

উড়োজাহাজটি নিরাপদে দিল্লিতে অবতরণ করে। তবে শেষ পর্যন্ত যে পার্কিং বে বরাদ্দ দেওয়া হয়, সেটি রানওয়ে থেকে অনুরোধ করা জায়গার চেয়ে দূরে ছিল।

ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল অধিদপ্তর (ডিজিসিএ) ঘটনাটিকে ‘সিরিয়াস ইনসিডেন্ট’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) অ্যানেক্স ১৩-এর কাঠামোর আওতায় এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (এএআইবি) ঘটনাটি তদন্ত করছে। তদন্তে এয়ারবাস এবং ফ্রান্সের বিইএ প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।

এক বিবৃতিতে ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (এএআইবি) ঘটনাটির তদন্ত শুরু করেছে।

মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘এএআইবি বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সব প্রযুক্তিগত, পরিচালনাগত, চিকিৎসা ও মানবিক বিষয়সংক্রান্ত তথ্য পদ্ধতিগতভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরীক্ষা করছে। এর মধ্যে রয়েছে উড়োজাহাজ ও এর বিভিন্ন সিস্টেম পরীক্ষা, রেকর্ড করা ফ্লাইটের তথ্য, সংশ্লিষ্ট পরিচালনাগত ও রক্ষণাবেক্ষণ নথি, চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার। কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সব প্রাসঙ্গিক তথ্য ও প্রমাণ সামগ্রিকভাবে পরীক্ষা করা হবে।’

এয়ার ইন্ডিয়ার বিদায়ী প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যাম্পবেল উইলসন মঙ্গলবার ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

অন্যদিকে মন্ত্রী রাম মোহন নাইডু জানান, ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এয়ার ইন্ডিয়ার কাছ থেকেও ঘটনাটি সম্পর্কে সরাসরি হালনাগাদ তথ্য নিতে চেয়েছি এবং তারা বিষয়টি কীভাবে দেখছে, সেটিও জানতে চেয়েছি। আমি বারবার বলেছি, বিমান চলাচলে নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, এয়ারলাইন বা অন্য কারও পক্ষ থেকেই কোনো ধরনের আপস করা উচিত নয়। মন্ত্রণালয়ও বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।’

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়