প্রাইম ভিশন ডেস্ক
ফলে দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই পরিশোধিত আকারে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি)। এ আমদানিনির্ভরতা কমাতে এবার বেসরকারি খাতে বড় পরিসরে জ্বালানি তেল পরিশোধন ও সংরক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তুলছে দেশের অন্যতম বৃহৎ কনগ্লোমারেট টিকে গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি। এটি চালু হলে প্রতিষ্ঠানটির মোট জ্বালানি তেল পরিশোধন ও সংরক্ষণ সক্ষমতা ২২ লাখ টনে উন্নীত হবে, যা হবে দেশের সর্ববৃহৎ রিফাইনারি। অন্যদিকে চাহিদার প্রায় ৫৭ শতাংশ জ্বালানি তেল দেশেই পরিশোধনের সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন রিফাইনারি বা পরিশোধনাগারটি চট্টগ্রামের জুলদায় সুপার পেট্রোকেমিক্যালে নির্মাণ করা হচ্ছে। নতুন রিফাইনারিটির নির্মাণকাজ এরই মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি শেষ হয়েছে। আগামী বছরের মার্চে এটি উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। সুপার পেট্রোকেমিক্যালের বর্তমান রিফাইনারির বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা ৫ লাখ টন। সম্প্রসারিত রিফাইনারির সক্ষমতা ১৭ লাখ টন। সব মিলিয়ে রিফাইনারি ও স্টোরেজ সক্ষমতা দাঁড়াবে ২২ লাখ টনে।
দেশে জ্বালানি তেলের পরিশোধনে ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল) এখন সর্ববৃহৎ রিফাইনারি। আগামী বছরের মার্চে টিকে গ্রুপের প্রতিষ্ঠান সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে চাহিদার অর্ধেকের বেশি জ্বালানি তেল দেশেই পরিশোধন করা যাবে। অর্থাৎ চাহিদার ৫৬ দশমিক ৯২ শতাংশ জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে।
বর্তমানে দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ মেটাতে বিপিসিকে বিদেশ থেকে পরিশোধিত ডিজেল, অকটেনসহ বিভিন্ন ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম সাধারণত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের তুলনায় বেশি হওয়ায় এতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। বেসরকারি খাতে পরিশোধন সক্ষমতা বাড়লে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির সে ব্যয় ২০ কোটি ডলার কমে আসবে বলে দাবি করছেন সুপার পেট্রোকেমিক্যালের শীর্ষ নির্বাহীরা। সেই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থায়ও বাড়বে স্থিতিশীলতা।
সুপার পেট্রোকেমিক্যাল বর্তমানে বিপিসির জন্য বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল সরবরাহকারী চারটি প্রতিষ্ঠানের একটি। প্রতিষ্ঠানটি আমদানীকৃত ন্যাফথা ও কনডেনসেট পরিশোধন করে ডিজেল ও অকটেন উৎপাদন করছে। উৎপাদিত এসব জ্বালানি তেল বিপিসিকে সরবরাহ করা হয়। নতুন রিফাইনারি চালুর মাধ্যমে সরবরাহের পরিধি আরো বড় করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষ করে ডিজেল ও অকটেনের স্থানীয় উৎপাদন বাড়িয়ে বিপিসিকে আরো বেশি পরিমাণে পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে চায় টিকে গ্রুপের এ কোম্পানি।
বর্তমানে সুপার রিফাইনারির প্রধান পণ্য অকটেন। প্রতিষ্ঠানটি বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি এ পণ্যটি সরকারকে সরবরাহ করছে। পাশাপাশি সীমিত পরিসরে ডিজেলও উৎপাদন করছে। তবে নির্মাণাধীন নতুন রিফাইনারি চালু হলে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে বছরে বাড়তি ১৭ লাখ টন জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা যুক্ত হবে। বিদ্যমান সক্ষমতার সঙ্গে মিলিয়ে তখন সুপার পেট্রোকেমিক্যালের মোট উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়াবে ২২ লাখ টনে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলছেন, এ সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করা গেলে দেশের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত এ রিফাইনারির মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হবে। বর্তমানে কোম্পানিটির উৎপাদনে অকটেনের আধিপত্য থাকলেও নতুন রিফাইনারি চালু হওয়ার পর প্রধান পণ্যে পরিণত হবে ডিজেল। সেই সঙ্গে প্রায় সাড়ে চার লাখ টন ফার্নেস অয়েল উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া মেরিন ফুয়েলসহ জাহাজ ও শিল্প খাতে ব্যবহৃত অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যও উৎপাদন করা হবে বলে জানিয়েছেন কোম্পানিটির কর্মকর্তারা।
সুপার পেট্রোকেমিক্যাল ও বিপিসির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ন্যাফথা প্রসেসিং সক্ষমতা দৈনিক ১৬ হাজার ৭০০ ব্যারেল। এছাড়া তাদের দুটি কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেটিং প্লান্ট রয়েছে। জ্বালানি তেল মজুদের জন্য প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যমান ট্যাংক টার্মিনাল স্টোরেজ সক্ষমতা ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৫০ টন। এর সঙ্গে আরো অন্তত ১ লাখ ৮৪ হাজার টন জ্বালানি তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা নির্মাণাধীন রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পগুলো শেষ হলে প্রতিষ্ঠানটির মোট স্টোরেজ সক্ষমতা প্রায় ৩ লাখ টনে উন্নীত হবে। তবে নতুন সক্ষমতায় দৈনিক ৩৫ হাজার ব্যারেল বাড়তি পরিশোধনক্ষমতা যুক্ত হবে। তখন সব মিলিয়ে পরিশোধন সক্ষমতা দাঁড়াবে ৫১ হাজার ৭০০ ব্যারেলে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত সরকার ২০২১ সালে সিআরইউ-ভিত্তিক ফ্র্যাকশনেশন প্লান্ট ও বেসরকারি রিফাইনারিগুলোকে কনডেনসেট (লাইন ক্রুড) আমদানির অনুমতি দেয়। এতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের রিফাইনারি স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য যোগ্যতার বিষয়ে বিভিন্ন শর্ত নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে বেসরকারি রিফাইনারিতে উৎপাদিত জ্বালানি তেল বাজারজাত ও সরকারের কাছে সরবরাহের ক্ষেত্রেও একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। মূলত সরকারের দেয়া এ সুযোগের আলোকেই রিফাইনারি গড়ার পরিকল্পনা নেয়া হয় বলে জানান তারা।
টিকে গ্রুপের গ্রুপ ডিরেক্টর ও সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ মুস্তফা হায়দার বলেন, ‘২০২১ সালে সিআরইউভিত্তিক ফ্র্যাকশনেশন প্লান্ট ও বেসরকারি রিফাইনারিগুলোকে ক্রুড আমদানির অনুমতি দেয় সরকার। মূলত সরকারের দেয়া সে অনুমতির ভিত্তিতেই আমরা (টিকে গ্রুপ) রিফাইনারি ও স্টোরেজ ক্যাপাসিটি গড়ে তুলতে বিনিয়োগ শুরু করি। আমাদের চলমান রিফাইনারি প্রকল্পটি আগামী বছরের মার্চে উৎপাদনে যাবে। এটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে দেশে বেসরকারি খাতে ক্রুড অয়েল আমদানি বৃদ্ধির পাশাপাশি বিপিসির পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিও বড় অংশে কমে যাবে। এতে দেশীয় কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে বিপিসির বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।’
দেশে বিপিসি যে জ্বালানি তেল সরবরাহ করে তার মধ্যে ১৪ লাখ টনের কিছু বেশি আসে স্থানীয় সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে। যার মধ্যে ডিজেল ৭ লাখ ৬৭ হাজার টন (মোট সরবরাহের ১৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ), অকটেন ২ লাখ ৫৮ হাজার টন (৬২ শতাংশ) ও পেট্রল ৩ লাখ ৮০ হাজার টন (৮২ শতাংশ)।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি ৫০ হাজার ১৯৫ কোটি টাকার জ্বালানি তেল আমদানি করেছে। এর মধ্যে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় করেছে ৩৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। দেশে রিফাইনারি সক্ষমতা না থাকায় বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে সরকারের। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ইআরএল নির্মাণের প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও দেশে রিফাইনারি সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে না পারা দেশের জ্বালানি খাতে বড় ব্যর্থতা বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এমনকি আওয়ামী লীগ সরকার দেড় দশক ক্ষমতায় থাকার পরও রিফাইনারি নির্মাণের উদ্যোগ বারবার বিফলে গেছে। তবে সরকারি উদ্যোগের বাইরে গিয়ে বেসরকারি খাতে রিফাইনারি নির্মাণ ও জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলা দেশের জ্বালানি খাতে নিঃসন্দেহে বড় সফলতা বলে মনে করেন জ্বালানিসংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করেন, যদি বেসরকারি খাত দেশে রিফাইনারি গড়ে তুলে বিপিসিকে পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ করতে পারে এটাতে ব্যয় কমে যাবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘বেসরকারি খাতে রিফাইনারি ও স্টোরেজ সক্ষমতা যদি কেউ বাড়িয়ে থাকে এবং ক্রুড অয়েল প্রসেস করে তা বিপিসিকে দেয় নিশ্চয়ই সেটার প্রাইস কম হবে। আমদানি দামের চেয়ে স্থানীয় বাজার থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কম হলে তা অবশ্যই ইতিবাচক। বিশেষ করে ডিজেলের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। কারণ আমাদের ডিজেলের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এটা দেশে পরিশোধন করা গেলে বাণিজ্যিকভাবে বিপিসি লাভবান হবে।’
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, ইআরএল আমদানি করা ক্রুড অয়েল প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রেডের পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম উৎপাদনের ক্ষেত্রে উৎপাদিত ন্যাফথা দেশের চারটি বেসরকারি পেট্রোকেমিক্যাল প্লান্টে জ্বালানি তেল ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে সরবরাহ করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম চট্টগ্রামের সুপার পেট্রোকেমিক্যাল (প্রা.) লিমিটেড, নরসিংদীর অ্যাকোয়া রিফাইনারি লিমিটেড, চট্টগ্রামের পারটেক্স পেট্রো লিমিটেড (পিপিএল) এবং পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি লিমিটেড (পিআরএল)।
দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণের জন্য পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ফ্র্যাকশনেশন প্লান্ট থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে বিপিসি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি ৭ লাখ টন বিভিন্ন গ্রেডের পেট্রোলিয়াম পণ্য গ্রহণ করেছে। যার মূল্য ৮ হাজার ১১৭ কোটি টাকা।
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের বিভিন্ন গ্যাস ক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত বিশেষত সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল) আওতাধীন গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে কনডেনসেট সংগ্রহ করে বেসরকারি রিফাইনারিগুলো। বিপিসির ভাষ্য অনুযায়ী, ৬০ শতাংশ কনডেনসেট সরকারি সিআরইউ প্লান্ট গ্রহণ করার পর বাকি ৪০ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরবরাহ করা হয়। তবে এ কনডেনসেট দিয়ে প্লান্টগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারে না। যে কারণে বেসরকারি উদ্যোক্তারা বিদেশ থেকে ন্যাফথা ও কনডেনসেট আমদানি করে। তারা সেগুলো পরিশোধন করে বিপিসির কাছে ডিজেল-অকটেন ও পেট্রল তৈরি করে বিক্রি করে। এর বাইরে তারা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় কিছু ক্রুড অয়েল আমদানি করে পরিশোধনও করে। সেগুলোও বিপিসি কিনে নেয়।


