প্রাইম ভিশন ডেস্ক
কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হয়েছে। সোমবারের এই বৈঠকের কয়েক দিনের মধ্যেই নয়াদিল্লিতে আবারও দুই নেতার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
মস্কো এস-৫০০ প্রোমিথিউস আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং এসইউ-৫৭ ফেলন স্টেলথ যুদ্ধবিমান নিয়ে ভারতের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে। ভারত বর্তমানে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে রুশ অস্ত্রের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে অস্ত্র কেনার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উৎসও বাড়াচ্ছে।
রাশিয়ার প্রস্তাবের অন্যতম প্রধান বিষয় এস-৫০০ প্রোমিথিউস।
এটি রাশিয়ার সর্বাধুনিক দূরপাল্লার আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ভারতে এরই মধ্যে রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ মোতায়েন রয়েছে। এস-৪০০ ব্যবহারের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রাশিয়া এস-৫০০-কে দুই দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পরবর্তী ধাপ হিসেবে তুলে ধরছে।
গত বছর অপারেশন সিন্ধুর সময় পাকিস্তানের দিক থেকে আসা বিমান হামলার হুমকি মোকাবিলায় ভারত এস-৪০০ ব্যবহার করেছিল।
রাশিয়া এখন সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চাইছে। মোদি-পুতিন বৈঠকের একদিন আগে মস্কো ভারতকে আরো পাঁচটি এস-৪০০ স্কোয়াড্রন দেওয়ার নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ভারতে থাকা বা চুক্তিবদ্ধ এস-৪০০-এর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে।
তবে এস-৫০০ কেনার বিষয়টি ভারতের জন্য সহজ নয়। কারণ ভারত একই সময়ে ‘প্রজেক্ট কুশা’ নামে নিজস্ব দীর্ঘপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।
এই প্রকল্পের লক্ষ্য ভবিষ্যতে এস-৪০০-এর মতো সক্ষমতার একটি দেশীয় ব্যবস্থা তৈরি করা।
এ ছাড়া ভারতের নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচিও উন্নত পর্যায়ে রয়েছে। ফলে এস-৫০০ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতকে দেখতে হবে, নতুন এই ব্যবস্থা সত্যিই কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি পূরণ করবে কি না। একই সঙ্গে এটি দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রকল্পগুলোর সঙ্গে সংঘাত তৈরি করবে কি না, সেটিও বিবেচনা করতে হবে। অন্যদিকে ভারতীয় বিমানবাহিনী যুদ্ধবিমানের সংখ্যা কমে যাওয়ার সমস্যায় রয়েছে। আগামী কয়েক বছরেও ভারতের নিজস্ব কোনো স্টেলথ যুদ্ধবিমান হাতে আসার সম্ভাবনা কম। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া তাদের পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান এসইউ-৫৭ কেনার জন্য ভারতকে আগ্রহী করে তুলছে।
মস্কো ইঙ্গিত দিয়েছে, ভারত এসইউ-৫৭ কিনলে এর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয়ভাবে উৎপাদন এবং উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির সুযোগ থাকতে পারে। ভারতীয় বিমানবাহিনী রাশিয়ার প্রস্তাবটি বিবেচনা করছে। তবে দেশীয় অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট (এএমসিএ) তৈরি ও সরবরাহ শুরু না হওয়া পর্যন্ত এসইউ-৫৭-কে ‘সাময়িক সমাধান’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি স্টেলথ যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিলে এটি অনেকটা স্বীকার করে নেওয়ার মতো হবে যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভারতীয় বিমানবাহিনীকে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান দিতে দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রকল্পগুলো সফল হয়নি। এদিকে এশিয়ার সামরিক পরিস্থিতিও দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
ধারণা করা হচ্ছে, চীনের কাছে এখন ৫০০টির বেশি জে-২০ ‘মাইটি ড্রাগন’ স্টেলথ যুদ্ধবিমান রয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানও আগামী কয়েক মাসের মধ্যে চীনের তৈরি জে-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান পেতে পারে। এ কারণে ভারতীয় বিমানবাহিনী কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছে। একদিকে দেশীয় এএমসিএর জন্য অপেক্ষা করলে দীর্ঘ সময় স্টেলথ যুদ্ধবিমানের ঘাটতি থাকতে পারে। অন্যদিকে এখনই এসইউ-৫৭ কিনলে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি নতুন একটি যুদ্ধবিমান বহরে যুক্ত করার অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।
ফলে ভারতের সামনে মূল প্রশ্ন এখন দুটি, দেশীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার পরও কতটা বিদেশি ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে এবং চীন-পাকিস্তান পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ব্যবহারের দিকে এগিয়ে গেলে ভারতীয় বিমানবাহিনী আর কতদিন নিজস্ব স্টেলথ যুদ্ধবিমানের অপেক্ষা করতে পারবে।
রাশিয়ার এসইউ-৫৭ যুদ্ধবিমান কিনলে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বহরে আরও একটি নতুন ধরনের যুদ্ধবিমান যুক্ত হবে। বর্তমানে ভারতের কাছে রাশিয়ার এসইউ-৩০এমকেআই ও মিগ-২৯, ফ্রান্সের রাফাল ও মিরাজ ২০০০, ব্রিটিশ-ফরাসি জাগুয়ার এবং ভারতের নিজস্ব তেজাস যুদ্ধবিমান রয়েছে।
নতুন ধরনের যুদ্ধবিমান যুক্ত হলে এর জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, অস্ত্র, খুচরা যন্ত্রাংশ ও সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করতে হয়। ফলে এসইউ-৫৭ কেনা শুধু একটি নতুন যুদ্ধবিমান কেনার বিষয় নয়। এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ও অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ব্যয়ের বিষয়ও জড়িত।
এসইউ-৫৭ নিয়ে ভারতের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভারত-রাশিয়ার এফজিএফএ প্রকল্পের পুরোনো ইতিহাস। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল রাশিয়ার পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানকে ভিত্তি করে ভারতের জন্য একটি নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করা। পরে এই যুদ্ধবিমানই এসইউ-৫৭ নামে পরিচিত হয়।
তবে ভারত ও রাশিয়ার সেই যৌথ প্রকল্প শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। তাই কয়েক বছর পর একই এসইউ-৫৭ এখন ভারতের কাছে বিক্রির প্রস্তাব হিসেবে ফিরে আসায় বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাশিয়ার নতুন প্রতিরক্ষা উদ্যোগ শুধু এস-৫০০ ও এসইউ-৫৭-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মস্কো ভারতের সঙ্গে আরো বড় পরিসরে সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে। এর অংশ হিসেবে রাশিয়া ভোরোনেঝ কৌশলগত আগাম সতর্কতা রাডার ব্যবহারের পরিধি বাড়াচ্ছে। এটি একটি দীর্ঘপাল্লার রাডার ব্যবস্থা, যা অনেক দূর থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণসহ বিভিন্ন ধরনের হুমকি শনাক্ত করতে পারে।
এ ছাড়া ভারতের বড় এসইউ-৩০এমকেআই যুদ্ধবিমান বহরের আধুনিকায়ন এবং রাশিয়ার তৈরি কিলো-শ্রেণির সাবমেরিনের আধুনিকায়ন নিয়েও সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে। এসইউ-৩০এমকেআই যুদ্ধবিমান তৈরির ক্ষেত্রে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এইচএএল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা বাজারে রাশিয়া কেন নতুন করে এত সক্রিয় হচ্ছে, তারও একটি কারণ রয়েছে। গত দুই দশকে ভারত বিভিন্ন দেশ থেকে অস্ত্র কেনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে রাশিয়ার ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমছে।
এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো মার্কিন জ্যাভলিন অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র কেনার উদ্যোগ। প্রায় ১৬ বছর ধরে চলা প্রক্রিয়ার পর ভারত সম্প্রতি এই অস্ত্র কেনার দিকে এগিয়েছে। একই সময়ে ফ্রান্সের কাছ থেকে আরো ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার বড় চুক্তিও এগিয়ে চলছে।
ভারত একই সঙ্গে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পেও বড় বিনিয়োগ করছে। ফলে রাশিয়াকে এখন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা কম্পানির পাশাপাশি ভারতের নিজস্ব দ্রুত বিকাশমান সামরিক শিল্পের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।
তবে রাশিয়ার একটি বড় সুবিধা রয়েছে। কয়েক দশকের সামরিক সহযোগিতার কারণে রুশ যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, সাবমেরিন, হেলিকপ্টার, ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এসব অস্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের পাশাপাশি ভবিষ্যতে পুরোনো অস্ত্রের জায়গায় নতুন ব্যবস্থা আনার প্রয়োজনীয়তা রাশিয়ার জন্য বড় সুযোগ তৈরি করছে। নতুন কোনো সরবরাহকারীর পক্ষে এত দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও বিদ্যমান অবকাঠামোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা সহজ নয়।
বড় কোনো অস্ত্র চুক্তি সরাসরি মোদি ও পুতিন ব্যক্তিগতভাবে পরিচালনা করবেন না। তবে দুই নেতার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বড় প্রতিরক্ষা প্রকল্প এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ কারণে বিশকেকে মোদি-পুতিনের বৈঠককে শুধু দুই নেতার ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এর পেছনে আগামী দুই দশকে ভারতের সামরিক বাহিনী কীভাবে গড়ে উঠবে, তা নিয়েও বড় ধরনের প্রতিযোগিতা রয়েছে।
রাশিয়ার প্রস্তাব ভারতকে শেষ পর্যন্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখে ফেলছে। প্রথমত, নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার পথে থাকলে ভবিষ্যতে ভারতের কতটা বিদেশি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে। দ্বিতীয়ত, চীন ও পাকিস্তান যখন পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ব্যবহারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ভারতের নিজস্ব স্টেলথ যুদ্ধবিমান এএমসিএর জন্য দেশটি আর কতদিন অপেক্ষা করতে পারবে।


