চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কর্ণফুলী শিশুপার্ক চালু এবং পার্কসংলগ্ন আবদ্ধ জায়গাকে শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠে রূপান্তরের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ডা. শাহাদাত হোসেন, তা বাস্তবায়িত হয়েছে। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর পার্কটি পরিদর্শন করে এ ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। প্রায় দুই বছর পর শনিবার (৭ নভেম্বর) ৯২ দশমিক ৫ কাঠা জমিতে নির্মিত আগ্রাবাদ জাম্বুরি খেলার মাঠের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন।
২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর আগ্রাবাদের কর্ণফুলী শিশুপার্ক পরিদর্শনে গিয়ে পার্কটি বন্ধ দেখতে পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন তৎকালীন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এ সময় তিনি পার্কটি দ্রুত চালুর জন্য প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি পার্কসংলগ্ন আবদ্ধ একটি জায়গাকে শিশু-কিশোরদের জন্য উন্মুক্ত খেলার মাঠে রূপান্তরের ঘোষণা দেন। তাঁর উদ্যোগে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কর্ণফুলী শিশুপার্ক সংস্কার ও আধুনিকায়নের পর ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর ‘ওয়ান্ডারল্যান্ড অ্যামিউজমেন্ট পার্ক’ নামে পুনরায় চালু করা হয়। এবার পার্কসংলগ্ন জায়গাটিও আধুনিক খেলার মাঠে রূপান্তরের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হলো তাঁর আরেকটি ঘোষণা।
শনিবার (৭ নভেম্বর) নগরীর আগ্রাবাদ জাম্বুরি মাঠ এবং কয়েকটি সড়ক উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মাঠটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন।
প্রায় ৯২ দশমিক ৫ কাঠা জমির ওপর নির্মিত মাঠটির উন্নয়নকাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর। ডা. শাহাদাত হোসেনের অনুরোধে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির অর্থায়ন করেছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) । মাঠে খেলাধুলার প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর পাশাপাশি গ্যালারি, ড্রেসিং রুম, ওয়াশরুম ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ফ্লাডলাইট ও ফেন্সিংয়ের ব্যবস্থাও করা হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডে ৪১টি খেলার মাঠ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে ১১টি খেলার মাঠ প্রস্তুত হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও মাঠ গড়ে তুলে এই সংখ্যা ৮২টিতে উন্নীত করতে চাই। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে প্রতিটি এলাকার শিশু-কিশোর ও তরুণদের জন্য খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিত করা।
আগ্রাবাদ জাম্বুরি মাঠের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “এই জায়গাটির বাজারমূল্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। এখানে চাইলে বহুতল ভবন কিংবা প্লট তৈরি করে বিপুল অর্থ আয় করা সম্ভব ছিল। কিন্তু আমরা সেই পথে যাইনি। কারণ নগরবাসীর জন্য খেলার মাঠ, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান তৈরি করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের খেলাধুলা এবং মানুষের সুস্থ বিনোদনের জন্য এই জায়গাটি সংরক্ষণ করেছি।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের নভেম্বরে এখানে এসে দেখেছিলাম শিশুপার্কটি বন্ধ, পাশের জায়গাটিও আবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, পার্কটি চালু করব এবং পাশের জায়গাটিকে খেলার মাঠে রূপান্তর করব। আজ সেই মাঠ উদ্বোধন করতে পেরে আমি আনন্দিত। নগরবাসীর কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের এই ধারা অব্যাহত রাখতে চাই।”
মাঠটি বাস্তবায়নে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চেয়ারম্যান শরীফ জহীর এবং ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামদুদুর রশীদের আন্তরিক সহযোগিতা ও উদ্যোগের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রশাসক। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় সংগঠক, কর্মকর্তা এবং এলাকাবাসীর অবদানের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
নগরীর তরুণ প্রজন্মকে সামাজিক অপরাধ থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলার পরিবেশ সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “আমরা মাদক চাই না, সন্ত্রাস চাই না, চাঁদাবাজি চাই না, কিশোর গ্যাং চাই না। শুধু মুখে এসবের বিরুদ্ধে কথা বললে হবে না। তরুণদের জন্য খেলাধুলার উপকরণ এবং বিনোদনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। তাদের মাঠ দিতে হবে, খেলার সুযোগ দিতে হবে। তাহলেই তারা অপরাধের পথ ছেড়ে সুস্থ ও সুন্দর জীবনের দিকে এগিয়ে আসবে।”
তিনি বলেন, খেলাধুলা কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার অন্যতম উপায়। নিয়মিত খেলাধুলা মানুষের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, মানসিক চাপ কমানো এবং সামাজিক সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিশু-কিশোরদের খেলাধুলায় সম্পৃক্ত রাখতে পারলে তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে।
প্রশাসক বলেন, “আমি নিজে একজন চিকিৎসক। তাই সুস্থ জীবন গঠনে খেলাধুলার গুরুত্ব সম্পর্কে ভালোভাবেই জানি। আমরা চাই, আমাদের সন্তানরা মোবাইল ফোন ও অনলাইননির্ভর জীবনযাপনের বাইরে এসে মাঠে খেলুক। তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে বেড়ে উঠুক। একটি সুস্থ প্রজন্মই আগামী দিনের সুন্দর সমাজ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় খেলার মাঠ উন্নয়নের অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি জানান, ইতোমধ্যে হালিশহর এইচ ব্লক ও ফিরোজশাহসহ বিভিন্ন এলাকায় খেলার মাঠ প্রস্তুত করা হয়েছে। পাশাপাশি মাদারবাড়ি বালির মাঠ, বাকলিয়া স্টেডিয়াম, বাকলিয়া স্কুল মাঠ, পাহাড়তলী খেলার মাঠ, মহসিন কলেজ মাঠ, প্যারেড মাঠ, আমবাগান মাঠ ও পাহাড়তলী কলেজ মাঠসহ বিভিন্ন স্থানে মাঠ উন্নয়নের কাজ চলমান রয়েছে। এসব মাঠ পর্যায়ক্রমে উদ্বোধন করা হবে।
তিনি আরও জানান, প্রচলিত খেলার মাঠের পাশাপাশি ফুটসালসহ আধুনিক ক্রীড়া অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতায় নগরীর তরুণ প্রজন্মের জন্য আরও বেশি খেলাধুলার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
নবনির্মিত জাম্বুরি মাঠের যথাযথ ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রশাসক বলেন, শুধু মাঠ তৈরি করে দিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। মাঠটিকে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ রাখতে হবে। এখানে যাতে মাদকাসক্ত কিংবা অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিরা আড্ডা জমাতে না পারে, সেদিকে এলাকাবাসী, ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে নজর রাখতে হবে। এই মাঠ শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলার জন্য তৈরি করা হয়েছে। সেই উদ্দেশ্য যেন ব্যাহত না হয়, তা সবাইকে নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি বলেন, একটি সুন্দর নগরী গড়ে তুলতে সড়ক, ড্রেন ও অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি নাগরিকদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। নগরীতে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান না থাকলে শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তাই চট্টগ্রামকে একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ, স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনায় খেলার মাঠ ও বিনোদনকেন্দ্র উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, আমরা সবাই মিলে একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। এজন্য সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি মাদকমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, মানবিক ও সমৃদ্ধ চট্টগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের স্লোগান—করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।”
এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন, প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার জাহান প্রমুখ।


