প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
বিদায়ী ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার অতিরিক্ত পৌরকর (হোল্ডিং ট্যাক্স ও রেইট) আদায় করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। একই সময়ে রাজস্ব আহরণের অন্যান্য খাতেও উল্লেখযোগ্য হারে আদায় বেড়েছে। সবমিলিয়ে গত অর্থবছরে রেকর্ড ৫৫৬ কোটি ৯২ লাখ ৫ হাজার ৬১৫ টাকা রাজস্ব অর্জিত হয়েছে সংস্থাটির। এর মধ্যে শুধু পৌরকর রয়েছে ৩৮৪ কোটি ৫৪ লাখ ৯৫ হাজার ২২২ টাকা, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা বেশি।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব আয়ের মূল উৎস পৌরকর। নগরবাসীর সার্বিক সেবা প্রদান নিশ্চিতকল্পে কর্পোরেশনে নিয়োজিত কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বাৎসরিক বেতন ভাতাদি নিয়মিত পরিশোধের পাশাপাশি নগরের আবর্জনা অপসারণ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণ, সড়ক আলোকিতকরণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, খাল খনন ও নালা–নর্দমা সংস্কারপূর্বক জলাবদ্ধতা নিরসনসহ বিভিন্ন খাতে রাজস্ব তহবিল থেকে খরচ করা হয়। ফলে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
তিনি বলেন, কর্পোরেশনকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করাই আমার লক্ষ্য। তাই কর্পোরেশনের রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত মনিটরিং করেছি। সরকারি প্রতিষ্ঠানের বকেয়া পৌরকর পরিশোধের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে লিখেছি। রাজস্ব শাখার সংশ্লিষ্ট কর আদায়কারী ও কর্মকর্তাদের রাজস্ব আহরণের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দিয়েছি।
মেয়র বলেন, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাওয়ায় নগরের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও সেবার পরিধি সম্প্রসারণে আর্থিক সক্ষমতা বাড়ল চসিকের। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আমরা যে বিপুল অংকের ভর্তুকি দিই সেটা আরো বাড়াতে পারব। এতে দুটো খাত আরো সমৃদ্ধ হবে।
মোট রাজস্বের ৬৯ শতাংশ এসেছে পৌরকর থেকে : বিদায়ী অর্থবছরে চসিক ৩৮৪ কোটি ৫৪ লাখ ৯৫ হাজার ২২২ টাকা পৌরকর আদায় করে। যা মোট অর্জিত রাজস্বের ৬৯ শতাংশ। অর্থাৎ পৌরকরের উপর ভর করেই রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড করেছে চসিক।
চসিকের রাজস্ব শাখার তথ্য অনুযায়ি, বিদায়ী অর্থ বছরে পৌরকর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৩৫ কোটি ৬৪ লাখ ৯৩ হাজার ৩৯১ টাকা। পৌরকর আদায়ের হার ছিল ১১৫ শতাংশ। এর আগে কর্পোরেশনের ইতিহাসে কখনো লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ পৌরকর আদায় হয়নি। ২০২৪–২০২৫ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৭৯ শতাংশ পৌরকর আদায় হয়, যা ওই সময় পর্যন্ত সর্বোচ্চ আদায় ছিল। ২০২৪–২০২৫ অর্থবছরে পৌরকর আদায় হয় ৩০৯ কোটি ২৮ লাখ ১৯ হাজার ৬৭ টাকা। অর্থাৎ ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে পৌরকর আদায় বেড়েছে ৭৫ কোটি ২৬ লাখ ৭৬ হাজার ১৫৫ টাকা।
জানা গেছে, চসিকে নগরে সরকারি ও বেসরকারি হোল্ডিংয়ের বিপরীতে চসিক পৌরকর আদায় করে। বর্তমানে নগরে সরকারি–বেসরকারি হোল্ডিং আছে ২ লক্ষ ২৫ হাজার ৯৬টি। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৮৩টি সরকারি এবং ২ লক্ষ ২৩ হাজার ৭১৩টি বেসরকারি হোল্ডিং রয়েছে। বিদ্যমান সরকারি হোল্ডিংগুলোর বিপরীতে বকেয়া ও হাল দাবিসহ ১৭৪ কোটি ৩৯ লাখ ৫৭ হাজার ৮৫৮ টাকা পৌরকর নির্ধারণ করা হয়। এ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ২৫২ কোটি ৫৪ লাখ ৩০ হাজার ৪৮৮ টাকা।
জানা গেছে, বিদায়ী অর্থবছরে সরকারি প্রতিষ্ঠানের হোল্ডিংগুলোর বিপরীতে চসিকের পৌরকর আদায় বৃদ্ধির নেপথ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। গত ২৯ জুন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ চসিককে ১৯৮ কোটি ২৬ লাখ ৯৪ হাজার ৬৫১ টাকা পরিশোধ করে। এ বিষয়ে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, বন্দর থেকে বিপুল অংকের রাজস্ব পেয়েছি, অতীতে কোনো মেয়রই বন্দরের দিকে মনোযোগ দেয়নি। এর কারণ হতে পারে তারা বন্দরকে ভয় পেত অথবা বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা করত। কিন্তু বন্দরকে আমি বলেছি, বৈধ যে ট্যাঙ সেটা দিতে হবে। অনেক কাহিনি করার পর শেষ পর্যন্ত তারা ১৯৮ কোটি ২৬ লাখ দিয়েছে। এখনো ৬৪ কোটি টাকা পাব, সেটারও ম্যঙ্মিাম আদায় করতে ট্রাই করব।
এদিকে নগরে বিদ্যমান বেসরকারি হোল্ডিংগুলোর বিপরীতে বকেয়া ও হাল দাবিসহ ১৬১ কোটি ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ৫৩৩ টাকা পৗরকর নির্ধারণ করা হয় গত অর্থবছরে। এ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ১৩২ কোটি ৬৪ হাজার ৭৩৪ টাকা। যা লক্ষ্যমাত্রার ৮২ শতাংশ। এ হার বেসরকারি কর আদায় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মেয়র ডা. শাহাদাত বলেন, সাবেক মেয়রের সময় অনেক বেশি ট্যাঙ নির্ধারণ করেছিল। তারা আপিল করলে আমি আবাসিক হোল্ডিং ট্যাঙ কমিয়ে দিয়েছি। ফলে তারা দ্রুত ট্যাঙ পরিশোধ করেছে। চেষ্টা করেছি তারা যেন খুশিমনে ট্যাঙটা দেয়।
উল্লেখ্য, সিটি কর্পোরেশন অ্যাক্ট ২০০৯ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন মোট ১৭ শতাংশ পৌরকর আদায় করে থাকে। তার মধ্যে ৭ শতাংশ হোল্ডিং ট্যাঙ (গৃহকর), ৩ শতাংশ বিদ্যুতায়ন রেইট এবং ৭ শতাংশ আর্বজনা অপসারণ রেইট রয়েছে। অবশ্য ২০১৬ সালের ৩১ জানুয়ারি জারিকৃত সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ৭ শতাংশ গৃহকরের পাশাপাশি ৭ শতাংশ আর্বজনা রেইট, ৫ শতাংশ বিদ্যুতায়ন বা সড়কবাতি রেইট এবং ৮ শতাংশ স্বাস্থ্য রেইট আদায়ের ক্ষমতা আছে চসিকের।
রাজস্ব আদায় বেড়েছে ১০০ কোটি টাকা : ২০২৪–২০২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয় ৪৫৬ কোটি ৬৮ লাখ ১৪ হাজার টাকা। বিদায়ী ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৫৫৬ কোটি ৯২ লাখ ৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ রাজস্ব আদায় আদায় বেড়েছে ১০০ কোটি ২৩ লাখ টাকা। পৌরকর ছাড়াও কয়েকটি খাতে কর আদায় করে চসিকের রাজস্ব বিভাগ। খাতগুলোর মধ্যে আছে ট্রেড লাইসেন্স ফি, ভূমি হস্তান্তর কর, বিজ্ঞাপন কর, সপসাইন ফি, প্রমোদকর ফি, যান্ত্রিক যানবাহন ও অযান্ত্রিক ফি। এর বাইরে রাজস্ব বিভাগের আওতাধীন এস্টেট শাখাও রাজস্ব আদায় করে। বিদায়ী অর্থবছরে ৩০ কোটি ৬৭ লাখা টাকা ট্রেড লাইসেন্স ফি, ৯৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ভূমি হস্তান্তর ফি ও ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিজ্ঞাপন কর আদায় হয়। এছাড়া এস্টেট শাখা আদায় করে ৩৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।


