প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
ইউক্রেনে রাশিয়ার প্রায় চার বছরের আগ্রাসনের পর ২৩ জানুয়ারি আবু ধাবিতে প্রথমবারের মতো ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে বসে ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে বৈঠক থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সমঝোতার আভাস পাওয়া যায়নি।
এদিকে যুদ্ধের অবসান টানতে কিয়েভ এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি কূটনৈতিক চাপের মুখে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেই ছিল ভূখণ্ড প্রশ্ন।
টেলিগ্রামে তিনি বলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাশিয়াকে এই যুদ্ধ শেষ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে—যুদ্ধটা তারাই শুরু করেছে।”
জেলেনস্কি জানান, ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। তবে দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বিষয়ে সতর্ক তিনি। “আগামীকাল আলোচনা কীভাবে এগোয় এবং ফল কী হয়—দেখা যাক,” বলেন তিনি।
প্রতিনিধি দলের প্রধান ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব রুস্তেম উমেরভ বলেন, বৈঠকে যুদ্ধ শেষ করার কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার ‘যৌক্তিক ধাপ’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এই বৈঠক শুরু হয় সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির সাক্ষাতের একদিন পর। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা গ্যারান্টি সংক্রান্ত একটি চুক্তির খসড়া প্রস্তুত রয়েছে।
জ্বালানি অবকাঠামোয় রুশ হামলা
কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় রাশিয়ার হামলা আরও তীব্র হয়েছে। কিয়েভসহ বড় শহরগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যখন তাপমাত্রা নেমেছে হিমাঙ্কের অনেক নিচে।
দেশটির শীর্ষ বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান ম্যাক্সিম টিমচেঙ্কো পরিস্থিতিকে ‘মানবিক বিপর্যয়ের’ কাছাকাছি বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধে যুদ্ধবিরতির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
ইউক্রেনের জ্বালানি মন্ত্রী জানান, ২০২২ সালের নভেম্বরে বড় ধরনের ব্ল্যাকআউটের পর এবারই সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে দেশের বিদ্যুৎ গ্রিড।
রাশিয়া বলছে, তারা কূটনৈতিক সমাধান চায়; তবে অগ্রগতি না হলে সামরিক পথেই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
দনবাস নিয়ে বড় অচলাবস্থা
মস্কোর অবস্থান স্পষ্ট—যুদ্ধ থামাতে হলে ইউক্রেনকে পূর্বাঞ্চলীয় শিল্পসমৃদ্ধ দনবাস অঞ্চল পুরোপুরি ছেড়ে দিতে হবে। দোনেৎস্ক অঞ্চলের যে ২০ শতাংশ এখনও ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেটিও ছাড়ার দাবি জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
জেলেনস্কি এ প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। চার বছরের যুদ্ধে রাশিয়া দখল করতে না পারা কোনো ভূখণ্ড ছাড়তে রাজি নন তিনি।
জনমত জরিপেও দেখা গেছে, ইউক্রেনীয়দের মধ্যে ভূখণ্ড ছাড় দেওয়ার পক্ষে সমর্থন কম। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, পুরো দনবাস ছেড়ে দেওয়া রাশিয়ার জন্য ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।’
ক্রেমলিন ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘অ্যাঙ্করেজ ফর্মুলা’ নামের একটি প্রস্তাবকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে মস্কো। এতে দনবাস পুরোপুরি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে যাবে এবং বর্তমান যুদ্ধরেখা স্থির থাকবে।
দোনেৎস্কসহ চারটি অঞ্চল ২০২২ সালে বিতর্কিত গণভোটের মাধ্যমে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেয়। কিয়েভ ও পশ্চিমা দেশগুলো এই গণভোটকে ভুয়া বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
জব্দকৃত সম্পদ নিয়েও টানাপোড়েন
রাশিয়া প্রস্তাব দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ থাকা প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের রুশ সম্পদের বড় অংশ ইউক্রেনের ভেতরে রুশ-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের পুনর্গঠনে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে জেলেনস্কি এ প্রস্তাবকে ‘অর্থহীন’ বলে উড়িয়ে দেন।
ইউরোপীয় মিত্রদের অবস্থানও একই—যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ রাশিয়াকেই দিতে হবে।
জেলেনস্কি বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম মার্কিন মধ্যস্থতায় একই টেবিলে বসেছেন দুই দেশের দূতেরা। তবে ভূখণ্ড প্রশ্নে অনড় অবস্থানের কারণে শান্তিচুক্তির পথ এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।


